মৌলবী সাহেব নিতান্ত অবজ্ঞাভরে কহিলেন, অঃ, অরা? অরা আর খি খম্ ফারে? অরূগো কি জেহেন আছে দুলহা মিঞা সাব! বচ্ছর বচ্ছর খায়দা বোগদাদী আর আম্ফারা লইয়া গঁাগোর গ্যাগোর খরুতে আছে। সবক এয়াদই খতাম্ ফারে না…।
আচ্ছা দেখি বলিয়া আবদুল্লাহ উহাদের নিকটে গিয়া দুই একটি বালককে পরীক্ষা করিতে আরম্ভ করিল। দেখিল উহারা যে সবকটুকু পাইয়াছে, সেটুকু মন্দ শিখে নাই। নানারূপ জিজ্ঞাসাবাদ করিয়া আবদুল্লাহ্ বুঝিতে পারিল যে, ইহারা বহুদিন অন্তর নূতন সবক পাইয়া থাকে; তাও যেটুকু পায়, সে অতি সামান্য। এই হতভাগ্য বালকগুলি ওস্তাদজীর চেষ্টাকৃত অবহেলায় মারা যাইতেছে দেখিয়া আবদুল্লাহ্ উঠিয়া আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ওদের বুঝি রীতিমতো সবক দেন না, মৌলবী সাহেব?
মৌলবী সাহেব চট করিয়া বলিয়া উঠিলেন, দিমু না কিয়েল্লাই? ইয়াদ খরতাম্ ফারে না তো!
আবদুল্লাহ্ প্রতিবাদ করিল, কেন পারবে না, মৌলবী সাহেব, আমি তো যে কয়টাকে দেখলাম, তারা তো কয়েকটা সুরা বেশ শিখেছে!
বৃদ্ধ একটু চঞ্চল হইয়া কহিলেন, হে, যে ইয়াদ খরতাম্ ফারে, হে ফারে! আর হগ্গোলে ফারে চীখার ফারবার। আয় তো দেহি কলিমুদ্দীন তর সবক লইয়া।
কলিমুদ্দীন নামক একটি দশ কি এগার বৎসরের বালক আম্পারা ও পান্দেনামা হাতে লইয়া মাদুরাসন হইতে উঠিয়া আসিল। মৌলবী সাহেব তাহাকে আদেশ করিলেন, ক তো দেহি, খয় সুরা ইয়াদ খছস?
বালকটি গড়গড় করিয়া অনেকগুলি সুরা মুখস্থ বলিয়া গেল। পরে আবদুল্লাহর নির্দেশক্রমে পান্দেনামা হইতেও কয়েকটি বয়েত আবৃত্তি করিল। ছেলেটি মেধাবী বলিয়া মৌলবী সাহেব যে তাহাকে ঠেকাইয়া রাখিতে পারেন নাই, তাহা বেশ বুঝা গেল।
আবদুল্লাহ জিজ্ঞাসা করিল, এরা এসবের মানেটানে কিছু বোঝে?
মৌলবী সাহেব দারুণ তাচ্ছিল্যের সহিত কহিলেন, হঃ, মানি বুজবো! হেজেমতনই খরুতে মুণ্ডু গুইর্যা যায়, তা আবার মানি বুজবো! খি বা খন্ দুলহা মিঞা! ইয়ার মইদ্দে আরো খতা আছে দুলহা মিঞা, বোজলেন? খতা আছে! বলিয়া মৌলবী সাহেব গূঢ়ার্থসূচক ভঙ্গিসহকারে মস্তক সঞ্চালন করিলেন।
আবদুল্লাহ্ কৌতূহলী হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, কী কথা, মৌলবী সাহেব?
কলিমুদ্দীন তাহাদের সম্মুখে এতক্ষণ দাঁড়াইয়া ছিল। মৌলবী সাহেব তাহাকে এক ধমক দিয়া কহিলেন, যা-যাঃ–সবক ইয়া কর্ গিয়া।…
তাড়া খাইয়া বেচারা গিয়া স্বস্থানে বসিয়া আবার অপরাপর বালকগণের কলরবে যোগদান করিল।
মৌলবী সাহেব আবদুল্লাহর আরো কাছে ঘেঁষিয়া আসিয়া ফিসফিস করিয়া কহিতে লাগিল, খতাড়া খি, বোজুলেননি, দুলহা মিঞা? অরা অইলো গিয়া আাফগোর ফোলাফান, অরা এইসব মিয়াগোরের হমান হমান চলতাম্ ফারে? অবৃগো জিয়াদা সবক দেওয়া মানা আছে, বোজুলেননি?
কার মানা?
খোদ্ সাবের! তিনি আইস্যা দহলিজে বইস্যা বইস্যা হুনেন, খারে খি সবক দি না দি।
এতক্ষণে আবদুল্লাহ্ এই পাঠদান-কৃপণতার মর্ম হৃদয়ঙ্গম করিতে সমর্থ হইল। পাছে প্রতিবেশী সাধারণ লোকের ছেলেরা নিজের ছেলেদের অপেক্ষা বেশি বিদ্যা উপার্জন করিয়া বসে, সেই ভয়ে তাহার শ্বশুর এইরূপ বিধান করিয়াছেন। সে আবার জিজ্ঞাসা করিল, তা ওদের পড়তে আসতে দেন কেন? একেবারেই যদি ওদের না পড়ানো হয়, সেই ভালো নয় কি?
এই কথায় মৌলবী সাহেবের হৃদয়ে করুণা উথলিয়া উঠিল। তিনি কহিলেন, অহহঃ, হেডা কাম বালা অয় না, দুলহা মিঞা! গরিব তাবেলম হিক্রবার চায়, এক্কেকালে নৈরাশ করলে খোদার কাছে কী জবাব দিমু? গোম্রারে এলেম দেওনে বহুত সওয়াব আছে কেতাবে ল্যাহে।
মৌলবী সাহেবের কেতাবের জ্ঞানের বহর এবং তাহার প্রয়োগের প্রণালী দেখিয়া আবদুল্লাহ্ মনে মনে যথেষ্ট কৌতুক অনুভব করিতেছিল, এমন সময় কর্তা সৈয়দ আবদুল কুদ্দস সাহেব ধীরে ধীরে লাঠি ভর করিয়া বৈঠকখানায় প্রবেশ করিলেন।
.
১২.
সৈয়দ সাহেবকে আসিতে দেখিয়া সকলে উঠিয়া দাঁড়াইল। আবদুল্লাহ্ একটুখানি মাথা নোয়াইয়া আদাব করিল, কিন্তু মৌলবী সাহেব পরম সম্ভ্রমে আভূমি অবনত হইয়া তাহাকে আদাব করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, হুজুরের তবিয়ত বালা তো?
সৈয়দ সাহেব উভয়ের আদাব গ্রহণ করিয়া, বৈঠকখানার অপর প্রান্তস্থ প্রশস্ত ফশের উপর উঠিয়া বসিতে বসিতে একটু ক্ষীণস্বরে কহিলেন, হ্যাঁ, একরকম ভালোই, তবে কমজোরীটা যাচ্ছে না…
মৌলবী সাহেব সহানুভূতির ভঙ্গিতে ঘাড় নাড়িয়া কহিলেন, –অহঃ, হুজুর যে বেমারী কাটাইয়া উঠছেন, তাই খোদার কাছে শোকর করন লাগে। খুজুরী অইবই! তা অডা যাইব গিয়া খাইতে লইতে।
সৈয়দ সাহেব জামাতার দিকে চাহিয়া কহিলেন, –এস বাবা, বস।
আবদুল্লাহ্ বড় ফশের উপর উঠিয়া বসিল। মৌলবী সাহেব তাহার ছাত্রদিগের নিকট ফিরিয়া গেলেন, এবং ছাত্রেরা দ্বিগুণ উৎসাহের সহিত দুলিয়া দুলিয়া সবক ইয়াদ করিতে লাগিল।
শ্বশুরকে একাকী পাইয়া আবদুল্লাহ্ তাহার পড়াশুনার কথা বলিবার জন্য উৎসুক হইয়া উঠিল। কী বলিয়া কথাটি তুলিবে, মনে মনে তাহারই আলোচনা করিতেছিল, এমন সময় তাহার শ্বশুর জিজ্ঞাসা করিলেন, –তা, এখন কী করবেটরবে কিছু ঠিক করেছ, বাবা?
শ্বশুর আপনা হইতেই কথাটি পাড়িবার পথ করিয়া দিলেন দেখিয়া সোৎসাহে আবদুল্লাহ্ কহিলেন, জি, এখনো কিছু ঠিক করতে পারি নি; তবে পরীক্ষেটার আর ক মাস মাত্র আছে, এ কটা মাস পড়তে পাল্লে বোধহয় পাস করতে পারতাম…
