আবদুল্লাহর ইচ্ছা হইতেছিল যে, একবার সেই চিঠিখানার কথা তুলিয়া আবদুল মালেককে একটু ভর্ৎসনা করিয়া দেয়; কিন্তু আবার ভাবিল, তাহাতে কোনো লাভ হইবে না। চিঠি খোলার যে কী দোষ, তাহা তো উহার ন্যায় কুশিক্ষিত কুসংস্কারসম্পন্ন লোককে বুঝানো যাইবেই না, বরং এই কথা লইয়া হয়তো একটা মন কষাকষির সূত্রপাত হইতে পারে। সুতরাং সে কথা মনে মনে চাপিয়া গিয়া আবদুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিল, কর্তা কি আজকাল বাইরে আসেন?
আবদুল মালেক কহিল, হ্যাঁ, আজ কদিন থেকে আসছেন একবার করে।
কখন?
এই সকালেই। বাইরেই এসে নাশতা করেন। কেন, কোনো কথা আছে নাকি?
আছে কিছু কথা।
ঔৎসুক্যের ঝোঁকে বেশ একটুখানি চঞ্চলতা দেখাইয়া আবদুল মালেক জিজ্ঞাসা করিল, কী কথা, এ্যাঁ? কী কথা?
এমন কিছু না; এই কী করব না-করব তারই পরামর্শের জন্যে।
ওঃ, তারই জন্যে! বলিয়া আবদুল মালেক একটুখানি সোয়াস্তির নিশ্বাস ফেলিয়া আবার সজোরে তামাক টানিতে লাগিল। দুই-চারি টান দিয়াই সে আবার কহিল, তা তোমাদের জাত-ব্যবসায় ধর না কেন?
কথাটির ভিতরে আবদুল্লাহ্ বেশ একটুখানি শ্লেষের ইঙ্গিত অনুভব করিলেও সে মনোভাব চাপিয়া রাখিয়া কহিল, নাঃ, ওটা আমার করবার ইচ্ছে নেই।
তবে কী করবে?
এ প্রসঙ্গ লইয়া আর নাড়াচাড়া করিবার ইচ্ছা আবদুল্লাহর আদৌ ছিল না; তাই সে কহিল, দেখি আমার শ্বশুর সাহেবের কী মত হয়।
আবদুল মালেক একটা বলিয়া পুনরায় পেচোয়ানে মনোনিবেশ করিল এবং খুব জোরের সহিত টান দিতে লাগিল। অবশেষে একটি সুদীর্ঘ সুখটান দিয়া গাল-ভরা ধোয়া ছাড়িতে ছাড়িতে কহিল, এইবারে উঠি, মুখ-হাত ধুয়ে নিই। কী জানি ধরগে’ তোমার আব্বা যদি বৈঠকখানায় এসে পড়েন, তবে এক্ষুনি নাশতার ডাক পড়বে।
নলটি বিছানার উপরে ফেলিয়া দিয়া আবদুল মালেক নামিয়া পড়িল। আবদুল্লাহ্ও তাহার সঙ্গে উঠিয়া বাহিরে আসিল এবং বৈঠকখানার দিকে চলিয়া গেল।
১১-১৫. বৈঠকখানার এক প্রান্তে
বৈঠকখানার এক প্রান্তে তখন এ বাটীর পারিবারিক মক্তব বসিয়া গিয়াছে। একখানি বড় অনতিউচ্চ চৌকির উপর ফরুশ পাতা; তাহারই উপর বসিয়া পূর্বাঞ্চল-নিবাসী বৃদ্ধ মৌলবী সাহেব আরবি, ফারসি এবং উর্দু সবকের রাশিতে ছোট ছোট ছেলেদের মাথা ভরাট করিয়া দিতেছেন। বাটীর ছোট ও মাঝারি পাঁচ-ছয়টি, প্রতিবেশীদিগের মাঝারি ও বড় আট দশটি ছেলে সুরে-বেসুরে সবক ইয়াদ করিতে লাগিয়া গিয়াছে। বাড়ির ছেলেগুলি মৌলবী সাহেবের সহিত একাসনে বসিয়াছে, কিন্তু অপর সকলকে ফশের সম্মুখে মেঝের উপর মাদুর পাতিয়া বসিতে হইয়াছে।
মৌলবী সাহেব প্রত্যহ এখানে বসিয়া এই ক্ষুদ্র মক্তবটি চালাইয়া থাকেন। এতদ্ভিন্ন। তাহাকে বৈকালে আরো একটি ক্ষুদ্র বালিকা-মক্তব চালাইতে হয়। যে ঘরটিতে আবদুল মালেক আজকাল অধিষ্ঠিত হইয়া আছেন, সেটি একটু নিরালা জায়গায় বলিয়া বাড়ির খুব ছোট ছোট মেয়েরা সেইখানে বসিয়া মৌলবী সাহেবের নিকট সবক গ্রহণ করে। এইজন্য বহির্বাটীর অপর কোনো পুরুষের সেখানে গতিবিধি একেবারে নিষিদ্ধ। মৌলবী সাহেব একে বৃদ্ধ, তাহাতে বহুকাল যাবৎ বাটীর লোকের মধ্যেই গণ্য হইয়া উঠিয়াছেন বলিয়া আট বৎসরের অধিক বয়স্কা বালিকাদিগকে সবক দিবার অধিকারটুকু প্রাপ্ত হইয়াছেন। পরম দীনদার লোক বলিয়া সকলেই এমনকি খোদ্ সৈয়দ সাহেব পর্যন্ত তাহার খাতির করেন।
আবদুল্লাহ্ বৈঠকখানায় প্রবেশ করিয়া আসোলামু আলায়কুম বলিয়া মৌলবী সাহেবকে সম্ভাষণ করিল। মৌলবী সাহেব তাড়াতাড়ি উঠিয়া ওয়ালায়কুম সালাম বলিয়া প্রতিসম্ভাষণ করিলেন, সঙ্গে সঙ্গে বালকেরাও দাঁড়াইয়া উঠিয়া সমস্বরে ওস্তাদজীর অনুকরণে অভ্যাগতের সংবর্ধনা করিল। অতঃপর মৌলবী সাহেব আবদুল্লাহর সহিত মোসাফা করিতে করিতে জিজ্ঞাসা করিলেন।
কবে আসলেন দুলহা মিঞা? তবিয়ত বালো তো?
এই কাল সন্ধ্যাবেলায় এসেছি। ভালোই আছি। আপনি কেমন আছেন মৌলবী সাহেব?
বালোই! হলাম আপনার ওয়ালেদ সাহেব এন্তেকাল ফর্মাইছেন?
জি হাঁ।
আচানক? খি বেমারী আসর খছিল তানিরে?
এই জ্বর আর কি?
মৌলবী সাহেব তাঁহার সুদীর্ঘ শ্বেত শ্মশ্রুরাশির মধ্যে অঙ্গুলি চালনা করিতে করিতে গভীর দুঃখ ও সহানুভূতির সুরে কহিলেন, আহা, বরো নেক বান্দা আছিলেন তিনি। আমারে বরো বালা জানাতেন। এ বারি আইলেই আমার লগে এক বেলা বইস্যা আলাপ না কইর্যা যাইতেন না!
এদিকে বালকগুলি দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া হাঁ করিয়া ইহাদের আলাপ শুনিতেছিল। হঠাৎ সেদিকে মৌলবী সাহেবের মনোযোগ আকৃষ্ট হওয়ায় তিনি ধমক দিয়া কহিলেন, বহ, বহ্, তরা সবক পর। বইঅ্যান, দুলহা মিঞা, খারাইয়া রইল্যান?
আবদুল্লাহ্ ফরশের উপর উঠিয়া বসিল, মৌলবী সাহেবও তাহার পার্শ্বে বসিলেন। ওদিকে বালকের দল আরবি, ফারসি এবং উর্দুর যুগপৎ আবৃত্তির অদ্ভুত সম্মিলিত কলরবে বৈঠকখানাটি মুখরিত করিয়া তুলিল।
আবদুল্লাহ্ কিছুক্ষণ মনোযোগের সহিত উহাদের পাঠ শ্রবণ করিল। পরে কে কী কেতাব পড়ে, কোন ছেলেটি কেমন, ইত্যাদি বিষয় মৌলবী সাহেবকে জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল। বাড়ির ছেলেগুলি বয়সে ছোট হইলেও, অপর ছেলেদের অপেক্ষা অনেক বেশি পড়িয়া ফেলিয়াছে দেখিয়া আবদুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিল, ও বেচারারা এত পিছনে পড়ে আছে। কেন, মৌলবী সাহেব?
