হ্যাঁ, এস হালিমা।
হালিমা ভিতরে আসিয়া কহিল, এই একটু আগেই একবার ডেকে গিইছি, তখন আপনার কোনো সাড়া পাই নি।
আজ উঠতে বড্ড বেলা হয়ে গেছে। তোমার ভাবী কোন্ সকালে উঠে গেছে, তা আমাকে তুলে দিয়ে যায় নি…
অনেক রাত্রে শুয়েছিলেন, তাই বোধহয় তিনি আপনার ঘুম ভাঙান নি…
সে গেল কোথায়?
বোধহয় আমার ঘরে গিয়ে ঘুমুচ্ছেন…
আর আমি এখানে একলা একলা বসে ফ্যা ফ্যা কচ্চি! একটু বাইরে যাব, তা একটা লোক পাচ্ছি নে যে আমাকে নিয়ে যায়…
কেন, বেলা ছুঁড়িটা কোথায় গেল?
কেমন করে বলব কোথায় গেল! ওই যে তার মাদুর পড়ে আছে, কিন্তু তার দেখা নেই!
এ বাটীর দস্তুর এই যে বিবি স্বয়ং উপস্থিত না থাকিলে কোনো বাঁদীকে স্বামীর ঘরে থাকিতে দেওয়া হয় না। এই কথা মনে করিয়া হালিমা কহিল, ওঃ, তাকে তবে ভাবী সাহেবা উঠিয়ে নিয়ে গেছেন। আচ্ছা, আমিই আপনাকে পার করে দিচ্ছি, চলুন। এখনো কেউ ওঠেন নি, খবর দেওয়ার দরকার হবে না।
এই বলিয়া হালিমা ভ্রাতাকে সঙ্গে লইয়া বাহিরে আসিল এবং এদিক-ওদিক চাহিয়া কহিল, যান। আবদুল্লাহ বাহিরে চলিয়া গেল।
বহির্বাটী তখনো নিস্তব্ধ; কেবল খোদা নেওয়াজ কুয়ার নিকটে বসিয়া কর্তার কাটি মাজিতেছিল। আবদুল্লাহ কুয়ার দিকে অগ্রসর হইয়া কহিল, আদাব, ভাই সাহেব!
আবদুল্লাহর অভিবাদনে খোদা নেওয়াজ যেন একটু ব্যস্ত হইয়া উঠিয়া কহিল, আদাব, আদাব! আসুন দুলা মিঞা। পানি তুলে দেব কি?
আবদুল্লাহ্ কহিল, না, না, ভাই সাহেব, আপনি কষ্ট করবেন না, চাকরদের কাউকে ডেকে দিন?
বাঁদী-পুত্র বলিয়া খোদা নেওয়াজকে সকলেই প্রায় বাড়ির চাকরের মতোই দেখিত; কেহ তাহাকে আপনি বলিয়া কথা কহিত না, অথবা ব্যবহারেও কোনো প্রকার সম্ভ্রমের ভাব দেখাইত না। কিন্তু তাহার সহিত আবদুল্লাহর ব্যবহার স্বতন্ত্ররূপ ছিল; বড় সম্বন্ধী বলিয়া তাহাকে যথারীতি সম্মান করিতে ক্রটি করিত না। ইহাতে খোদা নেওয়াজ যেমন একটু সঙ্কোচ বোধ করিত, তেমনই আবদুল্লাহর প্রতি শ্রদ্ধায় তাহার চিত্ত ভরিয়া উঠিত। সে তাড়াতাড়ি হুঁকাটি ধুইতে ধুইতে কহিল, না না, কষ্ট কিসের! আপনার জন্যে একটু পানি তুলে দেব, তাতে আবার কষ্ট!
এই বলিয়া খোদা নেওয়াজ কাটি রাখিয়া পানি উঠাইবার জন্য বালতির দড়ি গুছাইতে লাগিল।
আচ্ছা, আপনি পানি তুলুন, আমি বদনাটা নিয়ে আসি। এই বলিয়া আবদুল্লাহ্ বৈঠকখানার দিকে অগ্রসর হইল। খোদা নেওয়াজ উচ্চৈঃস্বরে বলিয়া উঠিল, না না, দুলা মিঞা আপনি দাঁড়ান, আমিই বদনা এনে দিচ্ছি।
চাকরদিগের ঘরে তখন দুই-এক জন উঠিয়া বসিয়া ধূমপান প্রভৃতির সাহায্যে আলস্য দূর করিতেছিল। খোদা নেওয়াজের কথা শুনিতে পাইয়া তাহারা বাহিরে আসিল, এবং একজন দৌড়িয়া গিয়া বদনা আনিয়া দিল। বদনায় পানি ভরিয়া দিয়া খোদা নেওয়াজ তাহাকে কহিল, যা তো কালু, বদনাটা পায়খানায় দিয়ে আয়।
আরে না, না; নবাবির কাজ নেই–আমিই বদনা নিয়ে যাচ্চি।–এই বলিয়া আবদুল্লাহ্ বদনা লইতে গেল, কিন্তু কালু চট করিয়া বদনাটা তুলিয়া লইয়া পায়খানার দিকে অগ্রসর হইল।
মুখ হাত ধুইয়া আবদুল্লাহ্ খোদা নেওয়াজকে জিজ্ঞাসা করিল, বড় মিঞা সাহেব এখনো ওঠেন নি?
খোদা নেওয়াজ কহিল, বোধ করি এতক্ষণ উঠেছেন; এমনি সময়ই তো ওঠেন।
তিনি থাকেন কোন ঘরে?
খোদা নেওয়াজ একটুখানি হাসিয়া কহিল, তার নতুন মহলে। সেই পাছ-দুয়ারের ঘরখানায় যেখানে মেয়েরা বসে পড়ে…।
ও! আচ্ছা তাঁর কাছে একবার যাই আর আমাদের নতুন ভাবী সাহেবার সঙ্গে আলাপ করে আসি…
যান, কিন্তু সে দেখা দিলে হয়…
কেন, কেন?
সে যে এখন বিবি হয়েছে!…
আবদুল্লাহ্ সকৌতুকে কহিল, বটে নাকি?
দেখতেই পাবেন এখন।
বাটীর পশ্চাৎ দিকের বাগানের ভিতর দিয়া আবদুল্লাহ্ বড় মিঞার মহলে আসিয়া উপস্থিত হইল। ঘরের দরজা খোলাই ছিল। আবদুল মালেক জাগিয়াছে, কিন্তু এখনো শয্যা ত্যাগ করে নাই। পেচোয়ানের অগ্রভাগ হাতে ধরিয়া, মুখনলটি ঠোঁটের উপর রাখিয়া সে আসন্ন ধূমপানের গৌরচন্দ্রিকা ভাজিতেছিল। তাঁহার সদ্য-নিকায়িতা সহধর্মিণী গোলাপী খাটের পার্শ্বে দাঁড়াইয়া কলিকায় ফুঁ দিতেছিল; বারান্দায় কাহার পদশব্দ শুনিয়া ঘাড় ফিরাইতেই আবদুল্লাহর সহিত তাহার চোখাচোখি হইয়া গেল। অমনি পুরা দেড় হাত ঘোমটা টানিয়া তাড়াতাড়ি কলিকাটি হুঁকার মাথায় দিয়া ঘরের কোণে গিয়া পিছন ফিরিয়া দাঁড়াইল।
আবদুল মালেক একটু ব্যস্ত হইয়া, কে? কে? বলিতে বলিতে বিছানায় উঠিয়া বসিল। আবদুল্লাহ্ দরজার কাছে দাঁড়াইয়া জিজ্ঞাসা করিল, আসতে পারি, ভাই সাহেব?
আরে তুমি দুলা মিঞা? তুমি আসবে, তা ধরগে’ তোমার আসতে পারিটারি আবার কেন?
কী জানি, নতুন ভাবী সাহেবা পাছে কিছু মনে করেন–বলিতে বলিতে আবদুল্লাহ্ ঘরের ভিতর উঠিয়া আসিল।
না, না, ও ধরগে’ তোমার কী মনে করবে–বরাবর তো ধরগে’ তোমার দেখা দিয়ে এসেছে…।
এদিকে দরজা খোলসা দেখিয়া গোলাপী এক দৌড়ে পলাইয়া গেল। আবদুল্লাহ কহিল, ঐ দেখুন ভাই সাহেব, যা বলেছিলাম!
আবদুল মালেক এক গাল হাসিয়া কহিল, হেঁ, হেঁ, তা এখন ধরগে’ তোমার একটু লজ্জা করবে বৈকি? তোমার বড় ভাবী যখন তোমাকে দেখা দেন না, তখন ধরগে’ তোমার…।
তা তো বটেই, তা তো বটেই! বলিতে বলিতে আবদুল্লাহ্ শয্যাপ্রান্তে বসিয়া পড়িল। আবদুল মালেক সজোরে তামাক টানিতে লাগিল।
