আলো জ্বালা হইলে মীর সাহেব আলতাফকে সঙ্গে লইয়া ভিতরে গিয়া বসিলেন এবং জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাদের কলেজ খোলে নি?
আলতাফ কহিলেন, জি না, এই সোমবারে খুলবে। মীর সাহেব কহিলেন, তবু ভালো! আমার এবার বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে গেল, তাই ভাবছিলাম বুঝি এদ্দিন কলেজ খুলে গেছে। যা হোক বেশি দেরিও তো আর নেই। আজ হল গিয়ে বিষবার, মধ্যে আর তিন দিন আছে। কবে রওয়ানা হবে?
আমার তো ইচ্ছে কাল বাদজুমা রওয়ানা হই; কিন্তু বাপজানের যে মত হয় না।
কেন?
তিনি আমাকে তো আর পড়তেই দিতে চান না। বলেন, এনট্রেন্স পাস করেছিস ঐ ঢের হয়েছে, এখন একটা দারোগাগিরি-টিরির চেষ্টা দেখ।
তা তুমি কী ঠিক করেছ?
আমার তো ইচ্ছে এফ.এ টা পাস করি। এঞ্জামিনের তো আর বেশি দেরি নেই, এই কটা মাস…
মীর সাহেব বাধা দিয়া কহিলেন, এফ.এ টা যদি পাস কত্তে পার তবে কী করবে?
আলতাফ একটু আমতা আমতা করিয়া কহিল, বি. এ. পড়তে পাল্লে তো ভালোই হত, তবে…
তবে আবার কী, তুমি যদি পড়তে চাও, তবে আমি যদ্দিন বেঁচে আছি, তোমাকে যেমন খরচ দিচ্ছি, তেমনই দেব। সেজন্যে কিছু ভেবো না।
বাপজান যে বড় গোলমাল করেন। ঐ তারাপদ বাবুর ছেলে সুরেন দারোগা হয়েছে কিনা, আর উপায়ও কচ্ছে খুব, তাই দেখে তিনি আমাকেও ঐ কাজে ঢুকবার জন্যে কেবলই জেদ কচ্ছেন।
আচ্ছা বাদশা মিঞাকে আমি ভালো করে বুঝিয়ে দেবখন। খরচপত্রের জন্যে তো আর এখন আটকাচ্ছে না, কেন মিছেমিছি পড়া বন্ধ করে ভবিষ্যৎ মাটি করা! আর দারোগগিরি ফারোগিরি ও-সব কাজে যেয়ো না–ওতে গেলে মানুষ একেবারে মাটি হয়ে যায়।
জি না, আমার তো ইচ্ছে না, কেবল বাপজানই জেদ করেন কিনা, তাই বলছিলাম।
আচ্ছা আমি তাঁকে কালই বলব। আমার আবার একটু পীরগঞ্জে যাবার ইচ্ছে ছিল। মনে করেছিলাম, কালই রওয়ানা হব। থাক একটা দিন পরে গেলেও ক্ষেতি হবে না। তা। তুমি এক কাজ কর না কেন, পরশু আমার নৌকাতেই চল তোমাকে বরিহাটীতে নামিয়ে দিয়ে যাব।
আলতাফ তাতেই সম্মত হইয়া কহিল, জি আচ্ছা, পরশু আপনার সঙ্গেই যাব।
মীর সাহেব একটু চিন্তা করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, আহমদ আলি-টালি ওদের কোনো খবর পেয়েছ?
জি না, আহ্মদ আলির কোনো খবর পাই নি, তবে আবদুল বারীর পত্র পেয়েছি। সেও আজ-কাল রওয়ানা হবে।
দু মাস থেকে ওদের কারুর টাকা দেওয়া হয় নি। তা কলকেতায় গেলে পরে পাঠিয়ে দিলে চলবে না?
তা চলতে পারে। কিন্তু আমার পথ-খরচের টাকা নেই–বাপজান বললেন, তাঁর হাত বড় টানাটানি…
ওঃ, আচ্ছা আমি গোটা পাঁচেক টাকা দেব–পরশুই দেব–একসঙ্গেই তো যাওয়া হবে। আর তোমরা কলকেতায় গিয়ে এই হপ্তাখানেকের মধ্যেই টাকা পাবে। ওদেরও বলে দিও।
জি আচ্ছা। তবে এখন উঠি, রাত হল…
আচ্ছা এস।
আলতাফ কিঞ্চিৎ মাথা নোয়াইয়া আদাব করিয়া বিদায় লইল।
.
১০.
প্রাতে ঘুম ভাঙিলে আবদুল্লাহ্ দেখিল খোলা জানালার ভিতর দিয়া ঘরে রৌদ্র আসিয়া পড়িয়াছে। না জানি কত বেলা হইয়া গিয়াছে মনে করিয়া আবদুল্লাহ্ ধড়মড় করিয়া উঠিয়া বসিল; কিন্তু পার্শ্বে সালেহাকে দেখিতে না পাইয়া মনে মনে কহিল, দেখ তো, কী অন্যায়! কখন উঠে গেছে অথচ আমাকে ডেকে দিয়ে গেল না।
প্রতিদিন ভোরে ওঠা যাহাদের অভ্যাস, হঠাৎ একদিন উঠিতে বিলম্ব হইয়া গেলে সে নিজের ওপর তো চটেই পরন্তু যে লোক ইচ্ছা করিলে তাহাকে সময়মতো তুলিয়া দিতে পারিত, অথচ দেয় নাই, তাহারও উপর চটিয়া যায়। তাই, সালেহাকে বেশ একটু বকিয়া দিতে হইবে এইরূপ সঙ্কল্প করিতে করিতে আবদুল্লাহ্ পরদা সরাইয়া খাট হইতে নামিয়া আসিল। সালেহার বাঁদী বেলা রাত্রে সেই ঘরে শুইত; আবদুল্লাহ্ তাহাকে ডাকিতে গিয়া দেখিল, সেও ঘরে নাই! মনে মনে ভারি বিরক্ত হইয়া আবদুল্লাহ্ আপনাআপনি বলিয়া উঠিল, কী মুশকিল, আমি এখন বাইরে যাই কী করে!
একটু ভাবিয়া আবদুল্লাহ্ দরজার নিকট আসিল এবং কপাট দুটি সামান্য একটু ফাঁক করিয়া উঁকি মারিয়া দেখিতে চেষ্টা করিল, কেহ কোথাও আছে কি না। ভালো করিয়া দরজার বাহিরে মুখ বাড়াইতে তাহার সাহসে কুলাইল না; কী জানি যদি এমন কোনো স্ত্রী-পরিজনের। সহিত তাহার চোখাচোখি হইয়া যায়, যিনি তাহাকে দেখা দেন না, তাহা হইলে ভয়ঙ্কর লজ্জার কথা হইবে।
কিন্তু আবদুল্লাহ্ কাহারো সাড়াশব্দ পাইল না। যদিও রৌদ্রে উঠান বেশ ভরিয়া গিয়াছে, তথাপি বাড়িসুদ্ধ সকলকে নিদ্রিত বলিয়াই বোধ হইল। বেলা দেড় প্রহরের পূর্বে ইহাদের শয্যাত্যাগের নিয়ম নাই; তবে যাহারা নিতান্তই ফজরের নামায কাযা করিতে চাহেন না, তাহারা ভোরে একবার শয্যাত্যাগ করেন বটে, কিন্তু নামায পড়িয়াই আবার আর এক কিস্তি নিদ্রা দিয়া থাকেন। সুতরাং এ সময়ে একা একা সটান বাহিরে চলিয়া গেলেও কোনো অদ্রষ্টব্যা পুর-মহিলার সাক্ষাতে পড়িয়া অপ্রস্তুত হইবার সম্ভাবনা নাই। আবদুল্লাহ্ একবার ভাবিল, তাহাই করা যাউক; কিন্তু পরক্ষণেই তাহার খেয়াল হইল, একজন পথপ্রদর্শকের সাহায্য ব্যতিরেকে শ্বশুর-দুর্গের প্রাঙ্গণ অতিক্রম করা জামাতার পক্ষে গুরুতর অশিষ্টতা। কাজেই, বাহিরে যাইবার জরুরি তলব থাকিলেও তাহাকে আপাতত নিশ্চেষ্ট হইয়া শয্যাপ্রান্তে বসিয়া থাকিতে হইল।
একটু পরেই হালিমা দরজার কাছে আসিয়া মৃদুস্বরে জিজ্ঞাসা করিল, ভাইজান, উঠেচেন?
