বাদশা মিঞা যেন একটু ক্ষুণ্ণ মনেই কহিলেন, আর ক্রোক কত্তে পাল্লে কই! ওদিকে মীর সাহেব যে কোন্ সন্ধানে ছিলেন তা তিনিই জানেন; ঠিক সময়মতো এসে হাজির আর কি?
তা, তিনি এসে কী কল্লেন?
টাকাটা মিটিয়ে দিলেন আর কি!
লাল মিঞা যেন আকাশ হইতে পড়িলেন। চোখ তুলিয়া কহিলেন, হ্যাঁ মীর সাহেব!
বাদশা মিঞা গম্ভীরভাবে কহিলেন, হ্যাঁ। তবে ওর ভেতর অনেক কথা আছে। আবার তাহার ওষ্ঠ ও অঙ্গুলি ক্ষিপ্রগতিতে চলিতে আরম্ভ করিল।
লাল মিঞা ঔৎসুক্যে অধীর হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, কী কথা, ভাই, কী কথা?
কিছুক্ষণ আপন মনে তসবি পড়িয়া বাদশা মিঞা কহিলেন, কথা আর কি! যেত ঘোষেদের ঘরে তার বদলে এল এখন মীরের পোর হাতে। সে ঐ ফিকিরেই দিনরাত ফেরে কিনা।
লাল মিঞা একটুখানি দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া কহিলেন, তাই তো!
বাদশা মিঞার তসবি ঘন ঘন চলিতে লাগিল। একটু পরে তিনি কহিলেন, এর ভেতরে মীরের পোর আরো মতলব আছে…
সাগ্রহে লাল মিঞা জিজ্ঞাসা করিলেন, কী মতলব, ভাই সাহেব?
বাদশা মিঞা স্বর অত্যন্ত নামাইয়া ফিসফিস করিতে করিতে কহিলেন, মদনের ব্যাটার বউকে দেখেছেন?
না।
চাষা হলে কী হয়, দেখতে বেশ!
তাই–কী?
মীরের পোর নজর পড়েছে।
চোখ কপালে তুলিয়া লাল মিঞা কহিলেন, এ্যাঁ, সত্যি নাকি?
কদ্দিন দেখিছি মীরের পো ওপারে গিয়ে সময় নেই অসময় নেই, ঘুরঘুর করে একলাটি ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর দেখুন কত লোকের বাড়ি-ঘর-দোর নিলাম হয়ে যাচ্ছে, ক্রোক হচ্চে, কারুর বেলায় কিছু না, ওই মদন গাজীর জন্যেই ওর এত পুড়ে উঠল–কেন? টাকাটা অমনি দিয়ে ফেলে, একটা খতও নিলে না! হাঃ! মীর সাহেব তেমনি তোক আর কি! আর এখন তো খুব সুবিধেই হয়ে গেল! বাপ-ব্যাটা দুজনেই মরেছে। আসল কথা, আমি যা বললাম– দেখে নেবেন।
লাল মিঞা কহিলেন, মীরের পোর ওদিকেও একটু আছে, তা তো আমি জানতাম না! এই জন্যেই আর বেথা কল্লে না, কেবল পথে পথেই ঘুরে বেড়ায়।
সমর্থন পাইয়া বাদশা মিঞা সোল্লাসে কহিলেন, ঠিক বলেছেন, ভাই! ওইটাই আসল কথা। নইলে একলা মানুষ, এত টাকা রোজগারের ফন্দি কেন? তোর বাপু কে খাবে!
ওর পয়সা কি আর কারুর ভোগে লাগবে? খোদা সে পথ যে আগেই মেরে রেখেছেন! হারামের পয়সা ও হারামেই উড়িয়ে দিয়ে যাবে।
বাদশা মিঞা গম্ভীরভাবে স্বীয় মস্তকটি বারকয়েক আঁকা দিয়া অনুমোদন জ্ঞাপন। করিলেন। কিন্তু তাহার ওষ্ঠদ্বয় ও অঙ্গুলি দ্রুতবেগে তসবি পাঠ করিয়া চলিল।
এমন সময় মসজিদ হইতে মগরেবের আযান শোনা যাইতে লাগিল। উভয়েই নীরবে আযান বাদ মোনাজাত করিলেন এবং তাড়াতাড়ি বৈঠকখানা হইতে বাহির হইয়া মসজিদের দিকে প্রস্থান করিলেন।
নামায অন্তে যখন মুসল্লিগণ মসজিদ হইতে একে একে বাহির হইতে লাগিলেন, তখনো। সন্ধ্যার অন্ধকার ভালো করিয়া ঘনায় নাই। মীর মোহসেন আলিও মসজিদে আসিয়াছিলেন, কিন্তু তিনি একটু বিলম্বে আসিয়া এক প্রান্তে স্থান লইয়াছিলেন, এবং নফল নামায শেষ করিয়া মুদ্রিত নয়নে নীরবে দোয়া দরুদ পাঠ করিতেছিলেন। বাদশা মিঞা বাহিরে আসিবার সময়। অস্পষ্ট আলোকে তাহাকে দেখিতে পাইলেন এবং লাল মিঞার গা টিপিয়া ইশারা করিয়া দেখাইলেন। উভয়ে পরস্পরের দিকে চাহিয়া একটু গূঢ়ার্থসূচক হাস্য করিলেন।
আজকার মদন গাজী সংক্রান্ত ব্যাপারটি সকলের কাছে সালঙ্কারে বর্ণনা করিবার জন্য বাদশা মিঞা উৎসুক হইয়া পড়িয়াছিলেন। তাই বাহিরে আসিয়া দুই-একজনের সম্মুখে। কথাটি উত্থাপন করিবামাত্র কী হয়েছে? কী হয়েছে? বলিতে বলিতে বহু উৎকণ্ঠ শ্রোতা তাহাকে ঘিরিয়া দাঁড়াইল। বাদশা মিঞা তাহার ইতিহাস অর্ধেক চোখের ভঙ্গিতে এবং অর্ধেক নিম্ন স্বরে বলিয়া যাইতে লাগিলেন। এদিকে মীর সাহেব মসজিদ হইতে বাহির হইয়া যখন তাহাদের সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইয়া সালাম-সম্ভাষণ করিলেন, তখন সকলে প্রতিসম্ভাষণ। করিয়া, কবে আসিলেন? কেমন আছেন? ইত্যাদি কুশল প্রশ্ন করিলেন; মীর সাহেবও স্মিতমুখে সকলের কুশল জিজ্ঞাসা করিয়া গৃহাভিমুখে গমন করিলেন।
বাটী আসিয়া মীর সাহেব দেখিলেন যে, তাহার বৈঠকখানার বারান্দায় কে একটা লোক বসিয়া আছে। সিঁড়িতে উঠিতে উঠিতে তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, কে হে, অন্ধকারে বসে?
লোকটি কহিল, আমি আলতাফ।
ওঃ, তুমি এসেছ! বেশ, বেশ, বেশ। আমি আরো ভাবছিলাম, তোমাকে ডেকে পাঠাব। ঘরে এস–ওঃ, ঘর যে অন্ধকার, –এই উলফৎ উলফৎ!
উলফৎ নামক তাহার বিহার-নিবাসী ভৃত্যটি অন্য ঘরে বসিয়া বসিয়া তামাক টানিতেছিল। মনিবের ডাকে সে তাড়াতাড়ি হুঁকা রাখিয়া গালভর ধোয়া ছাড়িতে ছাড়িতে ভারী আওয়াজে উত্তর দিল, আওতা হায়, হাজুর।
মীর সাহেব একটু বিরক্ত হইয়া কহিলেন, আরে আওতা কেয়া রে। বাত্তি লাও না! শাম হো গ্যায়া আভতক বাত্তি নেহি দিয়া ঘর মে?।
উলফৎ বাহিরে আসিয়া কহিল, উ কা হায় মেজ পর! তাহার পর ঘর অন্ধকার দেখিয়া অপ্রস্তুত হইয়া বলিয়া উঠিল, আরে বুত গইল! হম্ তো হারকেল জ্বালকে মে হী পর ধর দিয়া রাহা।
মীর সাহেব একটু হাসিয়া কহিলেন, হ, হাঁ, বুত তো গইল, আভ ফের জ্বালা দেই তো আচ্ছা ভইল।
মনিব তাহার ভাষা লইয়া মধ্যে মধ্যে এইরূপ পরিহাস করিতেন, তাহাতে উফৎ শুধু একটু হাসিত, কখনো বেজার হইত না। সেও একটুখানি হাসিয়া কহিল, আবহী জ্বালা দেতা হাজুর।
