আরে কী হয়েছে, তাই বল না! আমার সাধ্যে যা থাকে তা করব বলছি–এখন উঠে স্থির হয়ে বসে কথাটা কী বল তো শুনি!
এই কথায় একটু আশ্বস্ত হইয়া সাদেক পা ছাড়িয়া উঠিয়া মাটির উপর বসিতে বসিতে কহিল, আর কি থির হবার যো আছে, হুজুর! দিগম্বর ঘোষ মশায় আমাগোর সব খায়ে বইছেন, এখন বাড়িখানও কোরক দে আজ আসে বাশগাড়ি করতিছেন। আমাগোর কী উপায় হবে, হুজুর! আমাগোর বাঁচান কর্তা। আপনি না হলি আর কেউ বাঁচাতি পারবে না!…
মীর সাহেব তাহাকে বাধা দিয়া কহিলেন, আরে ছি ছি! অমন কথা বলে না সাদেক, বাঁচানেওয়ালা খোদা!–আচ্ছা, কত টাকার দেনা ছিল?
সাদেক কহিল, খতে ল্যাহা ছিল দুইশো তিন কুড়ি, এখন সুদ আর খরচ-খরচা নে মহাজনের দাবি হইছে পাঁশশয় বাইশ টাকা কয় আনা যেনি!…আপনি যদি এট্টু দয়া না করেন মীর সাহেব, তবে আমরা এবার এক্কাল পথে দাঁড়াই…
মীর সাহেব কহিলেন, আচ্ছা তুমি এগোও, –আমি টাকা নিয়ে আসছি।
না, হুজুর, আমি আপনার সাথেই যাব–গাং সাঁতরে আইছি, তাড়াতাড়ি লা পালাম না, কারে কিছু কই নি, পাছে দেরি হয়ে যায়…।
আচ্ছা আচ্ছা, চল, আমি এক্ষুনি টাকা নিয়ে আসছি। বলিয়া মীর সাহেব অন্দরে চলিয়া গেলেন, এবং একটু পরেই কাপড়চোপড় পরিয়া আবশ্যকমতো টাকা লইয়া বাহিরে আসিলেন।
মীর সাহেবের বাড়ির পশ্চাতে বাগানের পরেই তাঁহাদের ঘাট; ঘাটে একখানি ডিঙ্গি নৌকা বাঁধা ছিল, উভয়ে গিয়া তাহাতে উঠিলেন। সাদেক বৈঠা লইয়া বসিলে মীর সাহেব জিজ্ঞাসা করিলেন, আচ্ছা সাদেক, তোমাদের এমন দশা হয়েছে, তা এদ্দিন আমাকে একবারও বল নি তো!
সাদেক কহিতে লাগিল, কী করব হুজুর, বাপজী আপনার কাছে আসতি সাওস করেন না। ওই বাদশা মিঞাই তো যত নষ্টের গোড়া–তানিই বাপজীরে আপনার কাছে আসতি মানা করেন। তানারা সাত-পুর্ষে মুনিব; বাপজী কন, কেমন করে তানাগোর কথা ঠেলি!…
আমি তো সেই কালেই কইছিলাম বাপজীরে যে, ও ঘোষের পোর কাছে যাবেন না– ওর যে সুদির খাই বাপই রে! তা, বাদশা মিঞা পরামিশ্যে দে বাজীরে সেই ঘোষের পোর কাছেই নে গেল–তা নলি কি আজ আমাগোর ভিটেমাটি উচ্ছন্ন যায় হুজুর!
বলিতে বলিতে ডিঙ্গি আসিয়া ওপাড়ে ভিড়িল। মীর সাহেব চট করিয়া নামিয়া মদন গাজীর বাড়ির দিকে চলিলেন। সাদেক তাড়াতাড়ি নৌকাখানি বাধিয়া রাখিয়া পশ্চাৎ পশ্চাৎ দৌড়াইয়া গেল।
.
০৯.
সেইদিন বৈকালে আসরের নামায বাদ তসবিটি হাতে ঝুলাইতে ঝুলাইতে বাদশা মিঞা প্রতিবেশী জ্ঞাতি লাল মিঞার বাড়িতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তাহার পায়ে এক জোড়া বহু পুরাতন চটি, পরিধানে মার্কিনের থান-কাটা তহবন, গায়ে ঐ কাপড়েরই লম্বা কোর্তা, মাথায় চিকনিয়া চাঁদপাল্লা টুপি তসবির দানাগুলির উপর দ্রুত সঞ্চলনশীল অঙ্গুলিগুলির সহিত ওষ্ঠদ্বয় ঘন কম্পমান।
এইমাত্র লাল মিঞা আসরের নামায পড়িয়া গিয়াছেন–বাদশা মিঞার আগমনে তিনি বাহিরে আসিয়া সালাম-সম্ভাষণ করিলেন, বাদশা মিঞাও যথারীতি প্রতিসম্ভাষণ করিয়া তাহার সহিত বৈঠকখানায় গিয়া উঠিলেন। বৈঠকখানা ঘরটি নিরতিশয় জীর্ণ এবং আসবাবপত্রও তাহার অনুরূপ। বসিবার জন্য একখানি ভগ্নপ্রায় চৌকি—সে এত পুরাতন যে, ধুলাবালি জমিয়া জমিয়া তাহার রং একেবারে কালো হইয়া গিয়াছে। চৌকির উপর একটি শতছিদ্র ময়লা শতরঞ্জি পাতা, তাহার উপর ততোধিক ময়লা দুই-একটা তাকিয়া, উহার এক পার্শ্বে সদ্যব্যবহৃত ক্ষুদ্র জায়নামাজটি কোণ উল্টাইয়া পড়িয়া আছে। মেঝের উপর একটা গুড়গুড়ি, নইচাটিতে এত ন্যাকড়া জড়ানো হইয়াছে যে, তাহার আদিম আবরণের চিহ্নমাত্রও আর দৃষ্টিগোচর হইবার উপায় নাই। গৃহের এক কোণে একটি মেটে কলসি, কোণে একটি বহু টোল-খাওয়া নল-বাঁকা কলাইবিহীন বদনা স্বকৃত কর্দমের উপর কাত হইয়া পড়িয়া আছে।
টলটলায়মান চৌকিখানির করুণ আপত্তির দিকে নজর রাখিয়া উভয়ে সাবধানে তাহাতে উঠিয়া বসিলেন। লাল মিঞা কহিলেন, তারপর, ভাই সাহেব, খবর কী?
অঙ্গুলি এবং ওষ্ঠদ্বয়ের যুগপৎ সঞ্চালন বন্ধ করিয়া বাদশা মিঞা কহিলেন, পলাশডাঙ্গার মদন গাজীর খবর শুনেন নি?
না তো। কেন, কী হয়েছে?
মারা গেছে। বলিয়া তিনি আবার পূর্ববৎ অঙ্গুলি এবং ওষ্ঠ ঘন ঘন চালাইতে লাগিলেন।
মারা গেছে! হঠাৎ মারা গেল কিসে?
ওঃ, সে অনেক কথা। ও দিগম্বর ঘোষের অনেক টাকা ধারত কিনা, তাই দিগম্বর এসেছিল বাড়ি ক্রোক কত্তে। সে কিছুতেই দখল দেবে না, তারপর যখন জোর করে ওদের বাড়ি থেকে বার করে দিতে গেল, তখন ওর ছেলেটা গিয়ে পানিতে পল, আর তাই শুনে মদন অজ্ঞান হয়ে ধড়াস করে পড়ে গেল চৌকাঠের ওপর। তারপর মাথা ফেটে রক্তারক্তি আর কি!
তাইতে ম’ল?
হ্যাঁ, সেই যে পল, আর উঠল না…
আহা! বেচারা বুড়ো বয়সে বড় কষ্ট পেয়েই গেল!
সহানুভূতিসূচক ঘাড় নাড়া দিয়া বাদশা মিঞা কহিলেন, সত্যি, বড় কষ্টটাই পেয়েছে! এদানী তার বড়ই টানাটানি পড়েছিল কিনা?
ছেলেটা যে পানিতে পল বলে তার কী হল?
তা তো আর শুনি নি। সেও গেছে বোধহয়…
আহা! একসঙ্গে বাপ-ব্যাটায় গেল! মুসিবত যখন আসে, তখন এমনি করেই আসে।
বাদশা মিঞা অনুমোদনসূচক মস্তক সঞ্চালন করিয়া কহিলেন, তার আর সন্দেহ কি? বলিয়াই আবার তসবি চালাইতে লাগিলেন।
লাল মিঞা আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, বাড়ি ক্রোকের কী হল?
