লীলা বললেন, আমারও তো ডেট এগিয়ে আসছে।
আমীর-উল বললেন, হ্যাঁ। তোমার শরীরের যত্ন দরকার। এত ধকল, এত পালানো, এত দৌড়, এত খাটুনি গেছে এই শরীরের ওপর দিয়ে।
আমীর-উল কৃষ্ণনগর গিয়েছিলেন। সেখানে এসে উঠেছে তার নির্বাচনী এলাকা কুষ্টিয়ার সাতটা গ্রামের মানুষ। সাতটা গ্রামের ঘরবাড়ি পাকিস্তানি মিলিটারি জ্বালিয়ে দিয়েছে। গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে, তাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করতে করতে কলকাতা ফিরতে দেরি হয়ে গেল।
কলকাতায় ঢুকে গাড়ি সোজা গেল ক্লিনিকে। আমীর-উল নামলেন গাড়ি থেকে। ক্লিনিকে ঢুকলেন। দরজা ঠেলে ঢুকলেন লেবার ওয়ার্ডে। দেখা পেলেন লীলার। তার কোলে একটা ছোট্ট বাচ্চা। লীলা বললেন, ছেলে হয়েছে। তারা নাম রাখলেন জয়।
ছেলে নিয়ে তারা ফিরে এলেন কোহিনূর ম্যানশনে। পাবলো, শম্পা নতুন ভাই পেয়ে খুশিতে আহ্লাদিত। জয় নামটাও তাদের খুব পছন্দ হয়েছে। কিন্তু তিন দিনের মাথায় জয় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ল। বারবার পায়খানা হচ্ছে। ডাক্তার ডাকা হলো। ডাক্তার বললেন, ডিসেন্ট্রি হয়েছে। তবে এতবার পায়খানা হওয়া ভালো না। ক্লিনিকে ভর্তি করুন। স্যালাইন দেওয়ার ব্যবস্থা করুন।
আমীর-উলের মুখ শুকিয়ে এল। টাকা পাবেন কই?
শুনে তাজউদ্দীন তিন শ টাকা দিলেন আমীর-উলের হাতে। আবারও ক্লিনিকে ভর্তি করা হলো জয়কে। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। সাত দিন বয়সী জয় মারা গেল।
ছেলেকে কবরে নামালেন। ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে আমীরের চুল ভিজে আসছে। ছেলেকে কবরে শুইয়ে মাটি ঢালতে শুরু করলেন তিনি। আর সঙ্গের লোকেরা। সন্তানকে মাটির নিচে শুইয়ে দিয়ে তিনি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন খানিকক্ষণ। মোনাজাত করলেন। তখনই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। ভালোই হলো। বৃষ্টিতে কাদলে কেউ সেই কান্না দেখতে পায় না।
আমীর-উলের শোক সামলাতে সাত দিনের বেশি সময় লাগল। কিন্তু লীলা কিছুতেই সামলাতে পারছেন না। মাতৃদুগ্ধধারা গড়িয়ে পড়ছে বুক থেকে, আর কান্না উথলে উঠছে দুই চোখে। তিনি শুধু কাঁদেন। শুধু কাঁদেন।
আমীর-উল বললেন, চলো আমার সঙ্গে।
কোথায়?
শরণার্থীশিবিরে।
কেন?
দেখবে, শরণার্থীশিবিরে মায়েরা কত কষ্ট করছে। প্রতিদিন কয়েক হাজার শিশু মারা যায় সব কটি শিবিরে। ওদের সেবা করো। ওদের পাশে দাঁড়াও।
আমীর-উলের সঙ্গে জিপে করে শরণার্থীশিবিরে গেলেন লীলা। এটা কি মানুষের বসতি! সারি সারি তাঁবু। পুরো রাস্তা কর্দমাক্ত। বাথরুম নেই। গর্ত খুঁড়ে কোনোরকমে ছালা দিয়ে ঘিরে বানিয়ে দেওয়া হয়েছে পায়খানা। সেই গর্ত উপচে গড়াচ্ছে মলধারা। বৃষ্টির পানি ঢুকে পড়েছে তাঁবুর ভেতরে।
হাড্ডিসার একেকটা শিশু। চোখ কোটরাগত। খালি গা। খালি পা। মেয়েদের পরনে শতচ্ছিন্ন পোশাক। পর্দার বালাই নেই। লোকগুলোর মুখে ক্ষুধা, হতাশা, অনাহারের চিহ্ন। খাবারের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ায় ওরা। হাতে একটা করে থালা। আধঘণ্টা, এক ঘণ্টা পরে খিচুড়ির মতো কিছু একটা পাতে পড়ে। মানুষ আশ্রয় নিয়েছে বড় বড় ড্রেনের পড়ে থাকা পাইপের ভেতরে। যশোর রোডের দুই ধারে ঝুপড়িঘর তুলে, চালা তুলে, প্রাচীরের পাশে পলিথিনের চালা তুলে, ছই ফেলে থাকে মানুষ।
মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প কিংবা মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য অপেক্ষমাণদের জন্য যুব শিবিরের অবস্থাও কিছুমাত্র ভালো নয়। মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পের মধ্যে হাঁটুপানি। সেখানেই থাকছে তারা। কোনো কিছু নিয়েই তাদের কোনো অভিযোগ নেই। অভিযোগ একটাই : বেশি করে অস্ত্র দিন। বেশি করে গোলাবারুদ দিন। এই গোনা গুলি আর সীমিতসংখ্যক ছোট অস্ত্র দিয়ে তো দেশকে শত্রুমুক্ত করা সম্ভব না। অস্ত্র চাই। অস্ত্র চাই।
লীলা এই কাদার মধ্যে হাঁটলেন। একটামাত্র শিবিরে এক ঘণ্টা হাঁটতেই দুটো শিশুর লাশ তার চোখে পড়ল।
তিনি একটা তাঁবুর সামনে দাঁড়ালেন। পুরো এলাকার বাতাস বোটকা গন্ধে ভারী হয়ে আছে। ভেতরে মানুষগুলো কীভাবে থাকে, দেখার জন্য উঁকি দিলেন। একজন মা তার শিশুসন্তানের লাশ বুকে জড়িয়ে আছে। তাঁর কাঁদার শক্তিটুকুনই নেই। লাশ সৎকার করবেন, সেই সামর্থ্য নেই।
শরীরের বলও নেই।
তাঁর স্বামী তাকে বলছেন, জড়িয়ে ধরে থেইকে হবিটা কী। যা, ফেলে দিয়ে আয় ওই ওদিকটায় রাস্তার ওপারে। লোকেরা দেখলে ওরাই পোড়ানির ব্যবস্থা কইরবে…
লীলা নিজের সন্তান হারানোর দুঃখ ভুলতে শরণার্থীশিবিরের জন্য কাজ করতে লেগে পড়লেন। বিদেশ থেকে ফান্ড আনতে হবে। লিখতে হবে। জনমত গড়ে তুলতে হবে।
৪৫
জিয়াউর রহমানের সঙ্গে দেখা হলো প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের একান্ত সচিব ফারুক আজিজ খানের। জিয়ার গায়ে একটা সাফারি স্যুট, পাতলা কাপড়ের, গ্রীষ্মে পরার উপযোগী, চোখে কালো চশমা। তাঁকে খানিকটা উদ্বিগ্ন মনে হচ্ছে। যদিও চোখ কালো চশমায় ঢাকা বলে তাঁর মনের খবর যে খুব পড়া যাচ্ছে, তা নয়!
ফারুক খান বললেন, বসুন। চা খান।
জিয়া বসলেন।
ফারুক বললেন, প্রধানমন্ত্রী তো এখন নেই। কোনো কথা ছিল?
না। কোনো কথা ছিল না। একটু দেখা করতাম। সৌজন্য সাক্ষাৎ। আমার মনে হচ্ছে, জেনারেল ওসমানী আমার ওপরে খুশি নয়। হয়তো সরকারের লোকজনও আমার ওপরে নাখোশ।
