ফারুক বললেন, না না, তা হবে কেন। আপনার কথা তো প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে উল্লেখ করেছেন।
জিয়া বললেন, তারা মনে করে আমি যথেষ্ট যুদ্ধ করি নাই।
না না। সরকার আপনার ব্যাপারে মোটেও কোনো বিরূপ ধারণা রাখে না। তবে আমার একটা প্রশ্ন আছে। আপনি কেন কালুরঘাট থেকে উত্তর দিকে অগ্রসর না হয়ে বান্দরবানের দিকে চলে গেলেন? আমরা আশা। করছিলাম আপনি চট্টগ্রাম অ্যাটাক করবেন। চট্টগ্রামের পরিস্থিতি ছিল সিরিয়াস। আপনার উপস্থিতি খুব দরকার ছিল।
জিয়া বললেন, আমার কাছে খবর ছিল বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর আসছে। আমি সেটা মোকাবিলা করার জন্য সাগরের দিকে যাওয়া জরুরি মনে করেছিলাম।
জিয়া ক্যান্টনমেন্টে বন্দী তার স্ত্রী-পুত্রের জন্য উদ্বিগ্ন ছিলেন।
ফারুক জিজ্ঞেস করলেন, আপনার ফ্যামিলির কোনো খবর জানেন?
জিয়া বললেন, না। তেমন কিছু জানি না। আমি পাকিস্তানি অফিসারদের জানিয়ে দিয়েছি, ওদের সঙ্গে তোমরা যেমন ব্যবহার করবে, তোমাদের সঙ্গে আমরা তেমন ব্যবহার করব।
কীভাবে জানালেন?
চিঠি লিখেছি। চিঠিটা শাফায়াত জামিলকে দিয়েছি। আমাদের ছেলেরা অনেকেই ঢাকা যায়। তাদের একজন চিঠিটা ডাকে ফেলে। ঢাকার প্রধান মেজর জেনারেল জামশেদের ঠিকানায় চিঠিটা লিখেছি…
জিয়া উদাস হলেন। চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন :
ডিয়ার জেনারেল জামশেদ,
মাই ওয়াইফ খালেদা ইজ আন্ডার ইয়োর কাস্টোডি। ইফ ইউ ডু নট ট্রিট হার উইথ রেসপেক্ট, আই উড কিল ইউ সামডে।
মেজর জিয়া।
৪৬
ব্যারাকপুর ক্যান্টনমেন্ট, চব্বিশ পরগনা। সকাল থেকে আকাশটা খোসা ছাড়া লিচুর মতন হয়ে আছে। সাদা মেঘের নিচ থেকে উঁকি দিচ্ছে কালোর আভাস। এ ধরনের মেঘেই বৃষ্টি বেশি হয়। ২২ জুন ১৯৭১ তারিখটা। শেখ কামাল হিসাব কষে দেখলেন, বাংলাদেশে এখন বর্ষাকাল, হয়তো আষাঢ় মাসের ৮-৯ তারিখ এসে গেছে। ঢাকায় কি এখন বৃষ্টি হচ্ছে? ব্যারাকপুর ক্যান্টনমেন্টের মেডিকেল সেন্টারের বারান্দায় দাঁড়িয়ে একমুহূর্তের জন্য উদাস হয়ে গেলেন ২১+ বছরের কামাল। ছিপছিপে শরীরের ওপরে একটা হাফহাতা ঢোলা শার্ট চব্বিশ পরগনার বৃষ্টিভেজা বাতাসে উড়ছে। ভীষণ গরমে তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। চোখের চশমার কাঁচে জলীয় বাষ্প। ধানমন্ডিতে এখন কি বৃষ্টি হচ্ছে? ৩২ নম্বর বাড়ির গাছগুলো কি এখন বৃষ্টি আর দমকা বাতাসে মাথা ঝাঁকাচ্ছে? মাকে দেখেছেন তিনি, গোসলের পর মাথায় গামছা বেঁধে রাখেন, আর তারপর চুলটা মাথার এক পাশে ঝুলিয়ে মাথাটা কাত করে গামছা দিয়ে বাড়ি মারেন। গাছগুলো তেমন করছে? হাঁসগুলো কি দল বেঁধে প্যাক প্যাক করতে করতে ৩২ নম্বরের গেট পেরিয়ে ঝিলের দিকে যাচ্ছে, আর হাঁসের ঝাকের রাস্তা পার হওয়া দেখে থেমে গেছে। ধাবমান গাড়ি, বেবিট্যাক্সি, রিকশা? তারপর তার মনে হয় যে দেশে মুক্তিযুদ্ধ চলছে, আব্বা পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে (সম্ভবত), মা, আপা, রেহানা, জামাল এবং আদরের রাসেলরা কোথায় তিনি জানেন না। মাঝেমধ্যে ঢাকা থেকে লোকেরা আসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে, স্বাধীন বাংলা বেতারে কণ্ঠ দিতে, তাদের কাছ থেকে আবছা আবছা শোনা যায় যে তাঁদের ধানমন্ডিতে একটা বাড়িতে গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে। সেই বাড়ির চারদিকের দেয়ালের ওপারে কাটাতারের বেড়া দেওয়া হয়েছে বিশেষ রকম অভেদ্য করে, বাড়ির সামনে বালুর বস্তা, এলএমজি পোস্ট, সঙিন উঁচিয়ে সদা সতর্ক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে ভয়ংকর-দর্শন পাকিস্তানি সৈন্যরা। রাসেল কী করছে এখন? সে কি এখনো ভাতের সঙ্গে চিনি মিশিয়ে খায়? তাঁদের বাড়ির গরুগুলোই বা এখন কোথায়? পোষা বাঁদরটা? গরু না থাকলে আর বাড়িতে সারাক্ষণ মিলিটারি প্রহরা থাকলে দুধই-বা তারা পাবেন কোথায়? আপার ডেট তো কাছে আসছে, এই দুর্দিনে আপা ভালো খাবার পাবেন কোথায় আর ডাক্তারই-বা দেখাবেন কীভাবে?
একটা মুহূর্তই শুধু উদাস হলেন কামাল।
হঠাই প্রশ্ন, এই কামাল, তুই এখানে কী করিস?
সংবিৎ ফিরে পেয়ে কামাল তাকালেন, দেখলেন, তার এক পুরোনো বন্ধু শচীন। শচীন কর্মকার।
কামাল বললেন, তুই ক্যান আইছস?
যুদ্ধের ট্রেনিং লইতে। এইখান থাইকা মুরতি অস্থায়ী ট্রেনিং ক্যাম্পে যামু। ফার্স্ট ওয়ার কোর্সে বাংলাদেশ আর্মির কমিশন নিমু।
আমিও আইছি। একই কাজে।
কামাল আর শচীন পরস্পরকে জড়িয়ে ধরলেন। একটু আগে ডাক্তারের চেম্বারে সব কাপড়চোপড় খুলতে হয়েছে দুজনকেই। নাভির নিচে হাত দিয়ে ডাক্তার বলেছেন, কাশি দিন। জোরে কাশি দিন। হার্নিয়া আছে কি না চেক করলেন। হাইড্রোসেল আছে কি না, সেটাও চেক করেছেন। যুদ্ধে এসেছেন দেশের জন্য জীবন দিতে, ডাক্তারি পরীক্ষায় লজ্জা বিসর্জন দেওয়া খুবই সামান্য ব্যাপার।
তারা দুজনেই জানেন তারা এখানে কেন এসেছেন, এখান থেকে কোথায় যাবেন। মুজিবনগর সরকার মে মাসে এসে নিজেদের একটু গুছিয়ে নিতে পেরেছে, আর এ-ও বুঝতে পারছে যে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে।
কামাল প্রধান সেনাপতি ওসমানী সাহেবের এডিসি (এইড-ডে-ক্যাম্প)। তিনি ভেতরের খবর জানেন।
ওসমানী প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনকে বললেন, আমাদের মুক্তিবাহিনীতে এখন আছে সেনাবাহিনী থেকে আসা অফিসাররা, জওয়ানরা, ইপিআর, অফিসার আর জওয়ান, পুলিশ, আনসার, আর আছে ছাত্ররা, সাধারণ মানুষ, কিছু আছেন শ্রমিক, কিছু আছেন বিভিন্ন পেশার মানুষ, শিক্ষক, ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার-উকিল। এরা আমাদের এফএফ–ফ্রিডম ফাইটারস। দেশের মধ্যে অনেকগুলো বাহিনী আছে, যাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ আছে। অনেক জায়গায় অস্ত্রশস্ত্রও পাঠানো হচ্ছে। আমরা এখন কনভেনশনাল ওয়ারফেয়ার আর গেরিলা ওয়ারফেয়ার দুটোই করছি। ইন্ডিয়ান এজেন্সি র আবার মুজিববাহিনী গড়ছে। যেটাকে আমাদের অধীনে আনতে হবে। মুজিববাহিনীর অস্ত্র, ট্রেনিং সবকিছু মুক্তিবাহিনীর চেয়ে বেটার। সে ক্ষেত্রে আমাদেরও কিছু লিডার তৈরি করতে হবে। বেটার ট্রেনিং বেটার ইকুইপমেন্ট দিয়ে। আমরা কমিশন দিব। অফিসার তৈরি করব। মিলিটারি অফিসার। বাংলাদেশ আর্মির।
