এরপর বললেন, দেখেন, বামপন্থীদের সঙ্গে আমার সব সময় বন্ধুত্ব ছিল। তোয়াহা সাহেব আমার পারিবারিক বন্ধু। তার মেয়ের বিয়েতে আমি গেছি। আমাদের দুই পরিবার সব সময়ই যোগাযোগ রাখে। তোয়াহা কোথায়? ওকে বলবেন তো আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে। রনো আর কাজী জাফরকে চা খাইয়ে তিনি বিদায় দিলেন। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক কথায় গেলেন না।
এর বেশ কিছুদিন পরে, তাজউদ্দীনের অফিসে এল দিনাজপুরের কমিউনিস্ট নেতা বরদা চক্রবর্তীর নেতৃত্বে জাতীয় সমন্বয় কমিটির আরেকটা প্রতিনিধিদল। তারা এসেছেন স্মারকলিপি নিয়ে। তারা তাজউদ্দীনকে বললেন, মস্কোপন্থী ক্যাডারদের ট্রেনিং দেওয়া হচ্ছে, তাদের ক্যাম্প আছে। আমাদেরও ক্যাম্প করতে দিতে হবে। আমাদেরও অস্ত্র দিতে হবে।
তাজউদ্দীন বললেন, এটা তো আওয়ামী লীগের যুদ্ধ নয়, রাশিয়ান কমিউনিস্ট পার্টিরও যুদ্ধ নয়, এটা জাতীয় মুক্তি আন্দোলন, তাই তো?
হ্যাঁ। আমরা তো সেই কথাটাই বলতে এসেছি।
তাজউদ্দীন মৃদু কিন্তু দৃঢ়স্বরে বললেন, বাংলাদেশের কোনো দল বা গোষ্ঠীর মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে তো কারও অনুমতির দরকার হয় না। কাদের সিদ্দিকী টাঙ্গাইলে লড়াই করছেন, তিনি তো ভারতে আসেননি, হালিম বাহিনী, আফসার বাহিনী, হেমায়েত বাহিনীসহ যেসব বাহিনী বাংলাদেশের ভেতরে বীরের মতো যুদ্ধ করছে, তারা আমার কাছে দেখাও করতে আসেনি, অস্ত্র চাইতেও আসেনি। তারা আওয়ামী লীগ না ছাত্রলীগ, রুশপন্থী নাকি চীনপন্থী, আমি কোনো দিন জিজ্ঞাসাও করতে যাইনি। দেখুন, মার্ক্সবাদ নিয়ে আমিও কিছু পড়াশোনা করেছি, মাও সে তুংয়ের গেরিলাযুদ্ধের বই, চে গুয়েভারার বই আমারও সামান্য হলেও পড়া আছে। আমার জানামতে, এসব বইয়ে লেখা আছে, শত্রুর অস্ত্রই হচ্ছে বিপ্লবী গেরিলাদের অস্ত্র। আসল মার্ক্সিস্ট গেরিলারা শত্রুর অস্ত্র কেড়ে নিয়ে লড়াই করে। তারপর আরও আরও অস্ত্র তাদের দখলে আসে। কিন্তু এখন দেখছি, আপনারা বিপ্লবীরা অস্ত্রের জন্য পেটিবুর্জোয়া আওয়ামী লীগের কাছে অস্ত্র চাইতে এসেছেন। চীনের সব সরকারি কাগজে দেখেন, লিখেছে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীদের বিরুদ্ধে তাদের লড়াই। এখন যাদের বিরুদ্ধে আপনাদের লড়াই, তাদের কাছ থেকে অস্ত্র নেবেন। ভারতীয়রা জানে না যে সেই অস্ত্র তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করা হবে? আপনার হাতে আমি অস্ত্র দেব, আর সেটা কালকে পশ্চিম বাংলা বিহারের নকশালদের হাতে যাবে না, এটার নিশ্চয়তা আপনারা দিতে পারেন, আমি পারি না। কাজেই আমার হোস্ট কান্ট্রি আমাকে বলে দিয়েছে, অস্ত্র যেন চীনাদের হাতে না যায়।
আমরা তো ভারতে এসেছি, চীনের ওই লাইন আমরা মানি না বলেই।
আপনাদের থিসিসগুলো আমি পড়ে ফেলেছি। আপনারা একই সঙ্গে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এবং ভারতের বিরুদ্ধে লড়বেন। একই সঙ্গে পাকিস্তানি মিলিটারি এবং আওয়ামী লীগের মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়বেন।
কাজেই আপনারা আমাকে সমর্থন দিতে এসেছেন, আমি আপনাদের স্বাগত জানাই। আপনারা এ দেশে থাকেন, সিপিআইএম চারু মজুমদার অসীম চ্যাটার্জির সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন, বাংলাদেশে লড়াই করেন, আমি আপনাদের সাফল্য কামনা করি। দয়া করে আমার মতো বুর্জোয়া দলের আহাম্মক প্রধানমন্ত্রীর কাছে অস্ত্র চাইবেন না, ক্যাম্প চাইবেন না।
৪৪
এমন একঘেয়ে বৃষ্টি। মুষলধারে বৃষ্টি হয়ে গিয়ে আকাশ পরিষ্কার হবে, তা না। ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। আমীর-উল একবার আকাশের দিকে তাকালেন। এত ঘোলাটে দেখাচ্ছে আকাশটা। সেকি তার চশমার কাঁচ ঘোলা হয়ে গেছে বলে। নাকি চোখই ঢেকে আছে অশ্রুর বাষ্পে।
কলকাতার মুসলিম গোরস্থানে একটা ছোট্ট কবর খোঁড়া হয়েছে। এক হাত হবে লম্বায়।
এখানে আমীর শুইয়ে দিলেন সাদা কাফনে ঢাকা সাত দিন বয়সী তার পুত্রসন্তান জয়কে।
তিনি তো বাড়ি ছেড়েছেন সেই ২৫ মার্চ রাতে, এরপর আর দেখা পাননি স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের।
জুন মাসে আগরতলা থেকে কলকাতা ফিরে এসে আমীর-উল জানতে পারলেন, লীলা এসেছে কলকাতায়। উঠেছে কোহিনূর ম্যানশনে। তিনি ছুটে গেলেন কোহিনূর ম্যানশনে। স্ত্রী-পুত্র-কন্যাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন খানিকক্ষণ।
স্ত্রী কান্না মুছে জানালেন বিবরণ। তিনটা মাস কী কষ্টই না তাদের করতে হয়েছে। চার বছরের ছেলে পাবলো, দুই বছরের কন্যা শম্পাকে নিয়ে তাকে বাড়ি ছাড়তে হয়। শম্পা অতটুকুন বাচ্চা আশ্রয় নেয় নানির বাড়ি নারায়ণগঞ্জ। শম্পার মামা আওয়ামী লীগ নেতা মোস্তফা সরোয়ার। কাজেই তাদের বাড়িতে মিলিটারি আসে আর সেই বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। আর লীলা এ বাড়ি ও বাড়ি, আত্মীয়র বাড়ি, পরিচিতের বাড়িতে নীড়ভাঙা পাখির মতো ঘুরতে থাকেন। পাবলোকে নিয়ে। বহু কষ্টে নারায়ণগঞ্জে গিয়ে দেখেন, বাড়ির ভিটেতে ছাই। লোকজন নেই। নৌকায় ওঠেন। উদ্দেশ্য লীলার দাদাবাড়ি জামালকান্দি। মিলিটারিদের গানবোটের চোখ এড়িয়ে বহুদিনের ভাসানের পর জামালকান্দি পৌঁছান তাঁরা। সেখানে পরে আসে শম্পা। এরপর রহমত আলী তাঁদের নিয়ে আসেন আগরতলা। আগরতলা থেকে কার্গো বিমানে দমদম।
কোহিনূর ম্যানশনে কোনো আসবাব নেই। মেঝেতে চাদর পাতা। হলো। পাবলো আর শম্পা বাবাকে জড়িয়ে ধরল।
