লিলির সঙ্গে খানিকক্ষণ গল্প করলেন তাজউদ্দীন। ছেলেমেয়েদের চুমু খেয়ে তিনি বেরোনোর উদ্যোগ করলেন। ডাকলেন সাইফুলকে। ইসলাম সাহেব!
সাইফুল এগিয়ে গেলেন দরজার দিকে।
তাজউদ্দীন বললেন, আপনাকে মওলানা সাহেব খুবই পছন্দ করেন। আপনি একটু খেয়াল রাখবেন। তাঁর দলের অনেকেই কলকাতায় ঘুরঘুর করছে। পাকিস্তানের এজেন্ট। তাদের মতলব ভালো না। আপনি মওলানা সাহেবকে দেখে রাখবেন।
সাইফুল বললেন, আপনি চিন্তা করবেন না। দলের লোক না এনে তিনি আমাকে এনেছেন বুঝেশুনেই। আবার যাদু ভাই বা মেনন, রনোর সঙ্গে দেখা করেননি, সেটাও তিনি সচেতনভাবে বুঝেশুনে করেছেন।
তাজউদ্দীন বললেন, তবু আপনি অ্যালার্ট থাকবেন।
সাইফুল তাকিয়ে আছেন তাজউদ্দীনের মুখের দিকে। মাঝারি আকারের মানুষটার গোলাকার মুখ, বড় বড় চোখ। কণ্ঠস্বর পাতলা, জননেতার গর্জন তাতে নেই। কাঁপাসিয়ার বন-বনানীর পাতার মর্মর যদিও খানিকটা পাওয়া যায়, প্রমত্ত পদ্মর গর্জন তাতে নেই।
.
কয়েক দিন পরের কথা। জোহরা তাজউদ্দীন তাঁর ছেলেমেয়ে নিয়ে চলে গেছেন পার্ক সার্কাসের কাছে সুন্দরীমোহন অ্যাভিনিউতে। সেখানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতিসহ মুজিবনগর মন্ত্রিসভার অন্যরাও পরিবার নিয়ে থাকেন। তাজউদ্দীন আবার এসেছিলেন মওলানা ভাসানীর ফ্ল্যাটে। হুজুরের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। দীর্ঘ বৈঠক।
মওলানা আর তাজউদ্দীনের কী কথা হলো সাইফুল শোনেননি। মিটিং শেষে তাজউদ্দীন এলেন সাইফুলের ঘরে।
সাইফুল ব্যতিব্যস্ত হয়ে বললেন, ভাই আসেন, ভেতরে বসেন।
তাজউদ্দীন ঘরে ঢুকলেন। সাইফুল তাকে চেয়ার এগিয়ে দিলেন বসার জন্য। বসতে বসতে তাজউদ্দীন সাইফুলের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, এই চেয়ারটা তো বেশ মজবুত। তারপর হেসে বললেন, সাইফুল, আমার নিজের চেয়ারের খুঁটি অসমান।
সাইফুল তাকিয়ে রইলেন তাজউদ্দীনের মুখের দিকে, চোখ দুটোতে কী
যেন অব্যক্ত একটা বেদনা তিনি দেখতে পাচ্ছেন।
সাইফুল সাহেব, মওলানাকে একটু বোঝাবেন। তাঁকে তো সরাসরি সব কথা বলা যাবে না। রেগে গিয়ে উল্টাপাল্টা বিবৃতি দিয়ে বসবেন।
আমার যেটুকু সাধ্য তা না হয় আমি করব। তবে হুজুর চলেন তার নিজের মতে। আপনাকে তিনি খুবই পছন্দ করেন।
কলকাতা ভরে গেছে আমেরিকান সাহায্য সংস্থার লোক দিয়ে। আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ান স্টাডিজ একটা ইন্টারন্যাশনাল রিলিফ কমিটি খুলেছে। আমাদের বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই তাদের সঙ্গে ভিড়ে গেছে। তারা বুঝছে অথবা বুঝছে না যে এটা সিআইএর উদ্যোগ। তারা আসলে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামকে বিভ্রান্ত করতে চায়। রাজনৈতিক সমাধান? মানে আবার ইয়াহিয়ার সঙ্গে আলোচনা করে ৬ দফা বাস্তবায়নের নামে সময়ক্ষেপণ। মানে মুক্তিযুদ্ধটাকেই বিনষ্ট করে দেওয়া। যুদ্ধ করে দেশ শত্রুমুক্ত করা ছাড়া আর কোনো লাইন নেওয়া মানেই পুরো সংগ্রাম, এত মানুষের আত্মদান শেষ হয়ে যাওয়া।
সাইফুল চিন্তিত হলেন। শুধু আমেরিকান লবি, খন্দকার মোশতাক লবি ষড়যন্ত্র করছে তা নয়। মুজিববাহিনী তো আছেই, আরও আছে সেনাবাহিনীর লোকদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব না মানার বা তাদের অশ্রদ্ধা করার প্রবণতা। আসলে তাদের ট্রেনিং তো হয়েছে পাকিস্তানি সৈনিক হিসেবে। সিভিলিয়ানদের বাস্টার্ড সিভিলিয়ান ছাড়া তারা কোনো দিনও বলেনি। শুধু ব্যাটেল বা ওয়ার দিয়ে যে দেশ স্বাধীন হয় না, রাজনৈতিক নেতৃত্ব লাগে, পুরো ব্যাপারটাই যে আসলে সামরিক নয়, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক–এটা বাঙালি মিলিটারি অফিসারদের সবাই কি বোঝেন। এরা ভবিষ্যতে অনেক সমস্যা তৈরি করবে।
তাজউদ্দীন বললেন, আসি সাইফুল। তবে আমাদের প্রধান শক্তি কী। জানেন?
সাইফুল বললেন, আপনি বলেন।
তাজউদ্দীন বললেন, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ। তারা কিন্তু কে আওয়ামী লীগ, কে ন্যাপ, কে মুক্তিফৌজ, কে মুজিববাহিনী, কে বেঙ্গল রেজিমেন্ট, কে ইপিআর–তা বোঝে না, শুধু বোঝে জয় বাংলার পক্ষে না বিপক্ষে, সাড়ে সাত কোটি মানুষের সবাই–শুধু মুসলিম লীগ, জামাত, নেজামে ইসলামী আর কয়েকটা চীনা অতিবিপ্লবী ছাড়া সবাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত। মুজিব ভাইয়ের ওইটাই ম্যাজিক, তিনি স্বাধীনতার মন্ত্র দিয়ে সবাইকে বশীভূত করে ফেলতে পেরেছেন। আমি আসি। আরেকটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে।
বলে তাজউদ্দীন কোহিনূর প্যালেস থেকে নেমে গেলেন। সাইফুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওপর থেকে দেখলেন। তাজউদ্দীন গাড়িতে উঠলেন। অ্যাম্বাসেডর গাড়ি। আরও দুজন সশস্ত্র লোক গাড়িতে উঠল। তাঁর গাড়ি এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা গাড়ি তাকে অনুসরণ করতে লাগল।
.
পিকিংপন্থী দলগুলোর বাংলাদেশ জাতীয় সমন্বয় কমিটির ঘোষণাপত্র নিয়ে রনো আর কাজী জাফর গেলেন তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে। তাজউদ্দীন আহমদ আগে থেকেই সব খবর রাখেন। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট তার কাছে আসে, খবরের কাগজেই ছাপা হয়। নকশাল আন্দোলন নিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর বিশেষ রকমের স্পর্শকাতরতা আছে, এটা তাজউদ্দীন আহমদ জানেন। চীন প্রকাশ্যে বাংলাদেশের বিরোধিতা করছে, যেকোনো পরিস্থিতিতে ভারতের হস্তক্ষেপ রোধে তারা পাকিস্তানের পাশে সামরিকভাবেও থাকবে, এই অঙ্গীকার প্রকাশ্যে ব্যক্ত করছে, এটা তাজউদ্দীন জানেন। এ অবস্থায় রনো আর কাজী জাফরকে তাজউদ্দীন কীভাবে গ্রহণ করবেন। তিনি চেষ্টা করছেন মুখে হাসি ধরে রাখতে। ওদের ঘোষণাপত্রটা নিয়ে তিনি দিলেন ফারুক আজিজ খানকে। তারপর বললেন, চা খান। এই একটু চা দিতে বলো তো।
