সাইফুল মওলানা ভাসানীর পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করলেন। বললেন, ভাসানী বাংলাদেশের ভেতরেই এক গোপন জায়গায় আছেন। তিনি একটা বিবৃতি দিয়েছেন। সাইফুল সেটা পড়ে শোনালেন।
জয় বাংলা পত্রিকার ৯ জুন সংখ্যায় বের হলো :
বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের প্রশ্নে কারও আপত্তি থাকা উচিত নয়–মওলানা ভাসানী
গত ৩১ মে বাংলাদেশের কোনো এক স্থানে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান। ভাসানী বাংলাদেশ সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের সকল প্রকার প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দেন। বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের মুক্তির দাবীতে যাদের মুখে মুখে সব সময় খই ফোটে, বাংলাদেশের প্রশ্নে সেই সমস্ত সমাজতান্ত্রিক দেশের পূর্ণ নীরবতায় মওলানা ভাসানী বিস্ময় প্রকাশ করেন।…
বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম পরিচালনার জন্য সর্বদলীয় সরকার গঠনসম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে মওলানা বলেন, আমি সর্বদলীয় জগাখিচুড়িতে বিশ্বাস করি না। বাংলাদেশের উভয় অংশে আমরা সর্বদলীয় সরকারের কাণ্ড কারখানা দেখেছি। তাতে কোনো কাজের কাজ হয় না। তিনি বলেন, সাড়ে সাত কোটি মানুষের মুক্তিই আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। সুতরাং সাড়ে ৭ কোটি মানুষের মুক্তি ও স্বাধীনতার ব্যাপারে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের প্রশ্নে আমাদের কারও কোনো আপত্তি থাকা উচিত নয়।
সংবাদ সম্মেলনের পর সাইফুল বাইরে বের হতেন। থিয়েটার রোডে বাংলাদেশ সরকারের কার্যালয়, পার্ক সার্কাস রোডে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির অফিস। পার্ক সার্কাসের নাসিরুদ্দীন রোডে ন্যাপ কার্যালয়। সাইফুল সেসব অফিসে যাতায়াত করতে আরম্ভ করলেন।
মওলানা ভাসানী ফ্ল্যাট থেকে বের হন না। মাঝেমধ্যে বিকেলে গাড়ি করে যান গঙ্গার ধারে হাঁটতে।
হায়দার আকবর খান রনো, রাশেদ খান মেনন কলকাতা এসেছেন। তাঁরা মওলানা ভাসানীর সঙ্গে দেখা করতে চান। সাইফুল সেই বার্তা নিয়ে এলেন মওলানার কাছে। ভাসানী বললেন, এখন না। সময় হইলে নিজেই বলব।
তিনি রননা, মেননের সঙ্গে দেখা করলেন না।
ভাসানী ন্যাপ নেতা মশিউর রহমান যাদু মিয়া কলকাতা এলেন। উঠলেন টাওয়ার হোটেলে। পাশেই টাওয়ার লজ।
১ ও ২ জুন কলকাতার বেলেঘাটার এক স্কুলে আয়োজিত হলো বাংলাদেশের চীনাপন্থী বাম ও কমিউনিস্ট সংগঠনগুলোর এক সম্মেলন। যাদু। মিয়া তাতে দুই দিন যোগ দিলেন।
মওলানা ভাসানীর অনুপস্থিতিতে তাঁকে প্রধান করে গঠন করা হলো বাংলাদেশ জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম পরিষদ।
সাইফুলকে ধরলেন যাদু মিয়া–তাঁর নেতার সঙ্গে তাঁকে দেখা করিয়ে দিতে।
সাইফুল বললেন মওলানা ভাসানীকে, টাওয়ার লজে সিকদার, রনো, মেনন, অমল সেনদের সাথে যাদু ভাইদের বৈঠক হচ্ছে।
ভাসানী বললেন, ভালোই তো। যদি একখান পথ বাইর করতে পারে, তা তো ভালোই হইব। স্বাধীনতার লড়াই তো অনেক ফ্রন্টেই হইতে পারে।
যাদু ভাই আপনার সাথে দেখা করতে চান।
না না। ওর সাথে দেখা করা যাইব না।
ক্যানো? আপনার পার্টির সেক্রেটারি, তাঁর সঙ্গে দেখা করবেন না?
না। সে আমারে জাদুটোনা করব। সে আমারে ফিরায়া লইতে চায়।
আপনাকে ফিরিয়ে কই নেবে?
আমারে পাকিস্তান সমর্থন করতে কয়। আমার সাথে চীনারা দেখা করছে। কয়, পাকিস্তান সমর্থন করো। আমি কি সেইটা হইতে দেই? আমি ভারতে আসি, এইটা যাদু মিয়া চায় না। কয় আমারে চীনে নিয়া যাব। যেই দেশ বাংলার স্বাধীনতা চায় না, সেই দেশ আমি ক্যান যামু? যাদু আইছে আমারে ফিরায়া লইতে। অর সাথে দেখা করন যাইব না। কইলাম স্বাধীনতার লড়াই যদি দ্যাশে করতে না পারি, যেই দ্যাশ আমগো স্বাধীনতার লাইগা সাহায্য দিব, সেই দ্যাশে যামু। আমি আসলে লন্ডন যাইতে চাইছিলাম।
লন্ডন ক্যান?
বিশ্বশান্তি সম্মেলনে যাওনের পথে লন্ডন আটকা পড়ছিলাম না! আন্তর্জাতিক একটা শহর। স্বাধীনভাবে কাজ করা যাইত।
লন্ডন যাওয়ার জন্য নৌকায় উঠলেন!
তোমারে ডাইকা নিলাম, তুমি বুঝলা না। শুনো, ভারত হইল রবি ঠাকুর, গান্ধী, দেশবন্ধু, নেতাজি, নেহরু, আবুল কালাম আজাদের দ্যাশ। নেহরুর সাথে আমার সম্পর্ক ভালো আছিল। ইন্দিরা নেহরুর বেটি। সে বাংলার স্বাধীনতারে সাহায্য কইরবই। ভারত আমগো বন্ধু। আর যে চীনের সাথে আমাদের এত দোস্তি, বিপদে সেই চীন মুখ ফিরায়া রইল। আমার দুঃখটা তুমি বুঝ!
.
ব্যাঙ্গমা বলবে, মশিউর রহমান যাদু মিয়া কলকাতা থাইকা ভাইগা গেলেন। গিয়া যোগ দিলেন পাকিস্তানিগো লগে। রাজাকারির চরম করতে লাগলেন। কলকাতায় বইসা ন্যাপ নেতারা মিটিং কইরা যাদু মিয়ারে বহিষ্কার করলেন ভাসানীর সম্মতি লইয়া।
.
তাজউদ্দীন এসেছেন তার স্ত্রী-কন্যা-পুত্রদের সঙ্গে দেখা করতে।
এসে তিনি মওলানা ভাসানীর সঙ্গে গল্প করতে লাগলেন। তাজউদ্দীন বললেন, হুজুর, আমার জন্য দোয়া করবেন। মনে হয় বিশাল একটা ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ সাগরে একা ছোট্ট ডিঙা ভাসিয়েছি।
মওলানা বললেন, এত দিন তো আমাদের অভিজ্ঞতা ছিল হরতাল করার, মিটিং করার, প্রেস রিলিজ লেখার, আর প্রস্তাব পাস করার। এবার তো অস্ত্র। হাতে যুদ্ধ করতে হইতেছে। আর করতে হইব কূটনীতি! একলা পারবা?
তাজউদ্দীন বললেন, আপনার দোয়া থাকলে পারব। আমার দলের মধ্যে নানান মত আছে। ভেতরে-ভেতরে ষড়যন্ত্র আছে। তবে আপনি দোয়া করবেন। সেটা আমার বিশেষভাবে চাই।
