আজান হচ্ছে মসজিদে। কে আজান দিচ্ছে?
আগুন নিভে আসছে। অনেকগুলো কুকুর জড়ো হয়ে সৈন্যদের থেকে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে ঘেউ ঘেউ করছে। বাথান থেকে ছুটে পালিয়েছে গরুরা।
আগুনের তেজ কমে এল।
ওকে ওল্ডম্যান। আমাদেরকে তোমরা যত ব্যারব্যারিয়ান ভাবো, আমরা তত খারাপ নই। দ্যাখো, তোমাদের বুড়োবুড়ির গায়ে আমরা একটা ফুলের টোকাও দেই নাই। বিদেশি সাংবাদিকেরা এলে বোলো, দ্য কমান্ডার ওয়াজ। ভেরি জেন্টল। হি ওয়াজ কাইন্ড অ্যান্ড কনসিডারেট। ওকে। বাই। টেক কেয়ার। ট্রপস। ফল আউট।
সৈন্যরা চলে যাচ্ছে। তারা বোধ হয় বাইগার খাল দিয়ে গানবোটে এসেছে। খালের দিকে যাচ্ছে।
আরশাদ বলল, আপনারা কার বাড়িতে এসেছিলেন, জানেন তো। এইটা শেখ বাড়ি। শেখ মুজিবের বাপের ভিটা। দাদার ভিটা। এই বাড়ির একটা নিয়ম আছে। দুপুরের খাবার টাইম হয়েছে। এই বাড়িতে দুপুরে কেউ আইলে
খেয়ে যেতে পারে না। অফিসার, আপনে দুপুরে দুমুঠো জয় বাংলার ভাত খেয়ে যাবেন। নালি পরে গৃহস্থের অকল্যাণ হবে।
কী বলল লোকটা?
একজন দোভাষী কথাটা অনুবাদ করে দিল।
সঙ্গে সঙ্গে হাতের মেশিনগান তুলল অফিসারটা। তাক করল আরশাদের দিকে। ট্রিগারে আঙুল রাখল। পেশাদার আঙুলে চাপ দিল নির্ভুলভাবে। ট্যা ট্যা ট্যা করে একঝক গুলি বেরোতে লাগল। আরশাদের বুক ফুটো হলো, কান উড়ে গেল, কপালে গুলি লেগে করোটির পেছন দিক ফুটো করে মগজ গেল উড়ে। আরশাদ এসে গড়িয়ে পড়ল লুৎফর রহমানের কোলে। লুৎফর রহমান আরশাদকে ধরলেন। পাথরের চোখ দিয়ে তাকালেন একবার অফিসারটার দিকে। সেই চোখে আগুন ছিল। অফিসার চোখ নামিয়ে ফেলল। পাশের জওয়ানটা তখন অস্ত্র তুলল জামিল, কাশেম, শেফালির মায়ের দিকে। আবার প্রচণ্ড শব্দ, আগুনের ফুলকি আর রক্তের ফিনকি। চিৎকার, আর্তনাদ…
চার-চারটা লাশ পড়ে রইল খোলায়।
সৈন্যরা চলে গেল। লুত্যর রহমান, সায়েরা খাতুন পোড়া বাড়ির আগুনছাই ধোয়ার দিকে একবার তাকাচ্ছেন। ধোঁয়ায় চোখ খোলা যাচ্ছে না। একবার নিজের হাত-পা-বুকের দিকে তাকাচ্ছেন। এত রক্ত কার? আরশাদের…
সৈন্যরা চলে যাচ্ছে, পেছনে পেছনে তেড়ে যাচ্ছে কুকুরগুলো…
কাক ডাকছে কা কা…
আরশাদের রক্তে ভিজে গেছে লুৎফর রহমানের গায়ের কাপড়, পরনের লুঙ্গি…
৪২
রিমি, রিপি, সোহেল, মিমি সবাই এসে উঠেছেন কোহিনূর ম্যানশনে। মওলানা ভাসানীর সঙ্গে একই ফ্ল্যাটে কদিন থাকতে হবে।
মওলানা ভাসানী খুবই খুশি। জোহরা তাজউদ্দীন ওরফে লিলি রান্না করেন। আর কাঁচা মরিচ কচকচ করে চিবিয়ে মওলানা ভাসানী দুপুরে খান।
বাচ্চারা তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। তিনি গল্প করেন।
বুঝলা মা, তাজউদ্দীন একটা খাঁটি মানুষ।
৫৪ সালে ইলেকশনের সময় তার লগে একসাথে গেছিলাম হাতির পিঠে চইড়া, শাল-গজারির বনের ভিতর দিয়া, কাঁপাসিয়া।
রিপি বলল, আপনি হাতির পিঠে চড়লেন। আপনার ভয় লাগল না।
রিমি বলে, হাতিটা নাকি আগুন দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিল।
রিপি বলে, আপনি কি বাঘের সামনে পড়েননি?
রিমি বলে, আমার দাদি একাই একটা লাঠি হাতে বাঘকে তাড়া করেছিলেন।
মওলানা ভাসানী খান। আর গল্প করেন। বলেন, মজিবর নাই। আওয়ামী লীগরে সামলানো কি যা-তা কথা? কে কারে মানে? মোশতাক মনে করে সে। সিনিয়র। তারই হওনের কথা প্রধানমন্ত্রী। মনসুর আলী মনে করেন তিনি প্রাদেশিক পরিষদের নেতা। তারই হওনের কথা প্রধানমন্ত্রী। কামারুজ্জামান। মনে করে, সে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি। তারই হওনের কথা সভাপতি। এই দিকে আছে রাজ্জাক, তোফায়েল, শেখ মণি, সিরাজ। তাজউদ্দীন বড়ই ঝামেলায় আছে। তবে তাজউদ্দীন সিনসিয়ার আছে। পারলে সে-ই পারব।
.
রিমি, রিপিদের এই ফ্ল্যাটে এলেন শেখ কামাল। লিলির সঙ্গে দেখা করলেন। জিজ্ঞেস করলেন, কাকি, আপনার কিছু লাগবে?
লিলি বললেন, বাবা, তুমি তো আরও শুকিয়ে গেছ। তুমি বসো। আমি রান্না করছি। খেয়ে যাও। তোমার কাকু তো আসে না। আমিও ভালোমতো
খবরাখবর পাই না। মুজিব ভাইয়ের নতুন কোনো খবর পাওয়া গেল?
না। নতুন খবর তো নাই। পাকিস্তানের কোনো জেলখানায় রেখেছে। কোথায় রেখেছে, তা-ও তো কেউ ঠিকঠাক বলতে পারে না।
তোমার মায়ের কোনো খবর পেলে? হাসিনা, রেহানা এরা কেমন আছে?
আমি তো দেখা করে এসেছি। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি পালিয়ে পালিয়ে থাকত। এখন নাকি মিলিটারি ধরে হাউস অ্যারেস্ট করে রেখেছে।
কী দুশ্চিন্তার কথা? হাসিনার ডেট কবে জানো?
না কাকি।
লিলি রাঁধতে লাগলেন। কামাল রিমি-রিপির সঙ্গে গল্প করতে লাগলেন।
রিমি বলল, কামাল ভাই, আপনি কি বন্দুক চালাতে জানেন?
জানি তো।
কী কী চালাতে পারেন?
সবকিছু।
রাইফেল?
পারি।
স্টেনগান?
পারি।
মর্টার? কামাল হেসে ফেললেন। মর্টার চালানোর ট্রেনিং নিতে আমি যাচ্ছি। লিলি বললেন, সত্যি?
জি কাকি। আমি বাংলাদেশ ওয়ার ফোর্সের ফার্স্ট ব্যাচে যাব। মুরতি ট্রেনিং সেন্টারে ট্রেনিং হবে। মিলিটারি ট্রেনিং।
লিলি বললেন, আমার অনেক দোয়া থাকল বাবা। তুমি যেন ভালো থাকো। কী শুকিয়ে গেছে ছেলেটা আমার! এখানকার খাবার ভালো না?
ভালোই তো কাকি। তাজউদ্দীন কাকুর সঙ্গেই তো খাই। একই ক্যানটিনে।
কী খাও না-খাও। আর কিছু পারি না-পারি, রাঁধতে তো পারি। কথাটা লিলি কাকে যে বললেন, কামালকে নাকি রিমি, রিপির আব্বাকে, সে শুধু অন্তর্যামীই বলতে পারবেন।
৪৩
কলকাতায় সাইফুল মওলানা ভাসানীর সঙ্গে থাকেন। বাইরে প্রহরা। বেরোনো যাবে কি না জানেন না। গোয়েন্দারা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। কেন তিনি। ন্যাপ মোজাফফর করা লোক ভাসানী ন্যাপের সভাপতির সঙ্গে এসেছেন? শেষে গোয়েন্দারা বলল, মওলানা ভাসানীর একটা সংবাদ সম্মেলন করা উচিত। ভাসানী রাজি হলেন। তবে তিনি নিজে বাইরে যেতে চাইতেন না। বলতেন, কলকাতায় নকশালদের বড় উৎপাত। বাইরে যাওন ঠিক না।
