তাঁর গায়ে একটা গেঞ্জি। গেঞ্জির হাতা কনুই পর্যন্ত নেমে গেছে। তার নিচে সাদা ফরসা হাতের চামড়া কুঁচকানো। আর তাতে সাদা সাদা রোম। পরনে লুঙ্গি।
সায়েরা খাতুন পাকঘর থেকে বের হয়ে এলেন। তিনি ঘেমে গেছেন। শাড়ির আঁচল দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বললেন, কাশেম নাকি জাল নিয়ে গেছে খালে। মাছ আনলে কখন আনবে? মাছ কুটতে হবে। ঝামেলা না। তুমি ভর্তা খাইতে চেয়েছ, পুইড়ে করব নাকি পেঁয়াজ-রসুন দিয়ে চচ্চড়ি করে নিয়ে ভর্তা কইরে দেব?
লুৎফর রহমান হাসেন।
হাসো ক্যানো?
আমি তো ভর্তা খাইতে চাই নাই। কাশেম বানায় বানায় কথা কয়েছে।
নামাজের ওয়াক্ত হতে কত বাকি?
এখনো তো হয় নাই টাইম।
কালকে নাকি রেডিওতে কয়েছে, সাতক্ষীরাতে যুদ্ধ হয়েছে। নাসেরের জন্যি চিন্তা হচ্ছে। সায়েরা খাতুন বললেন।
তোমারে কে বলল?
শেফালি এসেছিল অর মার জন্য তেল নিতে। অর কাছে শুনলাম। লিলির মেয়ে দুইটা নাকি তার দাদার বাড়ি গেছে।
গেলে তো ভালো। কিন্তু শহর বলো গ্রাম বলো কোনো কিছু কি আর নিরাপদ আছে?
হঠাৎই হইহই শব্দ উঠল। উঠানে মোরগগুলো গলা উঁচিয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। চালের ওপর কবুতরগুলো উড়ে উঠল। বাড়ির খোলায় বাধা বাছুরটা দড়ি ছিঁড়ে পালাতে চাইছে। কাক ডেকে উঠছে কা কা। হঠাৎ ঘুম ভেঙে কুকুরগুলো উঠেই ঘেউ ঘেউ করতে করতে তেড়ে গেল বাইরে।
দৌড়ে এল ওই বাড়ির আয়নাল। দাদি দাদি, দাদা দাদা, পালাতে হবি গো।
ক্যান পালাতে হবি ক্যান? লুত্যর রহমান সাহেব বললেন।
মিলিটারি আসতিছে।
মিলিটারি এলে আসবে। আমাদের পালাতে হবি ক্যান?
মিলিটারি কি মানুষ? তারা তো পশু। কিছু বুঝে না। খালি মানুষ মারে। দাদা-দাদি আপনেরা পালিয়ে যান।
পালিয়ে যাব কই? আর এই বয়সে আমি দৌড়াতে পারব? যা তো। যা হবার হবি। লুৎফর রহমান নির্বিকার মুখে বললেন।
কাশেম ভেজা শরীরে পানি টপ টপ করে ফেলতে ফেলতে জালটা উঠানে রাখল। বলল, দাদা, মিলিটারি আসতিছে। পালাতে হবি গো।
পালাবি ক্যান? আমরা কার কী ক্ষতি করিছি? লুৎফর রহমান বললেন।
জামিল দৌড়ে এসে গরুর জন্য ঘাস কাটার খুরপিটা বাড়ির পেছনের গোয়ালের বেড়াতে গুঁজে রাখল। হাতের ডালিটায় কিছু দূর্বাঘাস দেখা যাচ্ছে। জামিল বলল, দাদা মিলিটারি আসতিছে গো।
চুপ করে থাক-সায়েরা খাতুন বললেন।
কথা শেষ হওয়ার আগেই তিন দিক থেকে অস্ত্র উঁচিয়ে খাকি পোশাক পরা সৈন্যরা এসে দাঁড়াল বাড়ির উঠানে। তারা তাক করল অস্ত্র। হ্যান্ডস আপ।
শেখ লুত্যর রহমান বললেন, বাবারা, মাথা ঠান্ডা করো। আমার বয়স এইটির বেশি। আই অ্যাম এইটি প্লাস। আমার এক পা কবরে। আমাকে অস্ত্রের ভয় দেখাচ্ছ ক্যানো? অস্ত্র নামাও। কী চাও, বলো।
লুত্যর রহমান সেগুন কাঠের চেয়ারে বসেই রইলেন। সায়েরা খাতুন তার হাতল ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন।
হু ইজ লুৎফর রহমান?
আই অ্যাম লুৎফর রহমান।
ইয়োর সন ইজ দ্য এনিমি অব পাকিস্তান। ইয়োর সন ইজ দ্য এনিমি অব কায়েদে আজম। হি উইল বি পানিশড। সার্চ দ্য হাউস।
সৈন্যরা বাড়ির ভেতরে গেল। এই ভবনের নিচতলা, দোতলা, খাটের নিচ ভালো করে তল্লাশি চালাল।
সৈন্যদের কমান্ডার বলল, এই বুড়ঢ়া। বারান্দা থেকে নামো। বুড়টি নামো। আমরা বাড়িতে আগুন দেব।
লুত্যর রহমান জানেন, উত্তেজিত সৈনিকদের সঙ্গে তর্ক করতে নেই। তিনি সায়েরা খাতুনকে বললেন, চলো।
সায়েরা খাতুন বললেন, ঘরে কোরআন শরিফ আছে। নিয়ে আসি।
লুৎফর রহমান বললেন, দেয়ার ইজ আ কোরআন শরিফ ইন দ্য রুম। শি ইজ গোয়িং টু পিক দ্যাট।
ইউ হিন্দু। হোয়াট কোরআন? নো নিড টু ব্লাফ আস। জাস্ট গেট আউট অব দ্য হাউস।
লুত্যর রহমান বারান্দা ছাড়লেন। উঠান ছেড়ে বাড়ির প্রাঙ্গণে এসে দাঁড়ালেন। একটা নিমগাছের ডালপালা-পাতা তাদের মাথার ওপরে ছায়া নাড়তে লাগল।
কুকুর ঘেউ ঘেউ করছে।
সৈনিকেরা বাড়িতে পেট্রল ঢালতে লাগল। গানপাউডার ছিটাল। তারপর ফ্লেয়ার গানের ট্রিগার টিপল বাড়ির দিকে তাক করে। মুহূর্তে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠতে লাগল পুরো বাড়ি।
এর দরজা, জানালা, কপাট, বারান্দা, দোতলা, সিঁড়ি সবখানে আগুন আর আগুন। লুৎফর রহমানের পাশে এসে দাঁড়াল তার কেয়ারটেকার আরশাদ (বয়স ৩৩)।
তার পাশে দাঁড়াল কাশেম (২২), জামিল (১৬)। দাঁড়াল এসে শেফালির মা (৩৮)। শেফালির মায়ের হাতে রান্নার পেষা মসলা লেগে আছে, হলুদ, মরিচ, পেয়াজের দাগ…তার হাতে চুড়ি, নাকে নথ…
শেফালির মা ডুকরে কেঁদে উঠল–ও মা গোয় আগুন দিয়া সব পুড়ায়ে দেল গো…
সায়েরা খাতুন হতবাক হয়ে গেলেন। তার চোখ দিয়ে জল গড়াতে লাগল।
লুত্যর রহমান কিছু বলছেন না। শুধু একবার রোদে পোড়া আকাশটার দিকে তাকালেন, আকাশে ধোয়া, আকাশে আগুন, আকাশে ছাই, তিনি আল্লাহকে বললেন, আল্লাহ জালিমের জুলুম তুমি সহ্য করো কেমন করে?
আগুনে বাড়িটা পুড়ছে। ঠাস ঠাস শব্দ হচ্ছে জানালার কপাট খুলে খুলে পড়ার…
মিলিটারিরা চারপাশে দাঁড়িয়ে শেখ মুজিবের পিতার বাড়ির ব্যুৎসব প্রত্যক্ষ করছে। তাদের বুটের নিচে কাদা। তাদের পিঠে অনেক বড় বড় ব্যাগ। কোমরভরা গুলি। হাতের মেশিনগানে জলপাই রঙের বেল্টে গুলির সারি। তাদের মাথায় হেলমেট। তাদের চোখে ক্ষুধার্ত হায়েনার ক্রোধ।
