পেছন থেকে একজন বললেন, ভাই, দুজনের খাবার নেন। প্লেট নাই। আমি খুবই ক্ষুধার্ত। আপনার প্লেটে ভাগ করে খাই?
বেলাল মোহাম্মদ তাকিয়ে দেখলেন, আর কেউ না, দাঁড়িয়ে আছেন চশমা পরা শেখ কামাল। তিনি বললেন, নিশ্চয়ই। আসুন। যুদ্ধের মধ্যে ছাদের নিচে বসে রান্না করা খাবার খাচ্ছি, এই কি বেশি নয়!
তারা মুখোমুখি একটা টেবিলে বসলেন। একই থালা থেকে খাবার ভাগ করে খেতে খেতে বেলাল মোহাম্মদ বললেন, আমার নাম বেলাল। চট্টগ্রামে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র আমরাই সবার আগে প্রচার করি। ২৬ মার্চ আমরা বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা অনেকবার প্রচার করেছি।
কামাল বললেন, পরে কী হলো?
বেলাল একটা আলুতে কামড় দিয়ে বললেন, ৩০ মার্চের পর পাকিস্তানিরা কালুরঘাটে বোমা মারে। পরে আমরা একটা এক ওয়াটের ট্রান্সমিটার নিয়ে সরে পড়ি। পরে আবার আগরতলা থেকে ৫০ ওয়াটের একটা বেতার থেকে অনুষ্ঠান করেছি।
কামাল বললেন, এক মিনিট। এক মিনিট। ১ ওয়াট। ৫০ ওয়াট। এখন যে স্বাধীন বাংলা বেতার এখান থেকে রেকর্ড হচ্ছে আর আমরা সবাই শুনছি, এটা কত ওয়াট?
এখনকারটা ৫০ কিলোওয়াট।
দাঁড়ান দাঁড়ান। কিলো মানে হাজার। মানে ৫০ হাজার ওয়াট। আর আপনাদেরটা ছিল ১ ওয়াট আর ৫০ ওয়াট? রাইট?
রাইট।
মানে এখনকারটা হাজার গুণ শক্তিশালী?
জি।
কামাল মাথা নাড়লেন। বেতারের শিল্পীদের অধিকাংশই তার পরিচিত। তিনি নিজে গান করেন, নাটক করেন, অনুষ্ঠান করেন, কাজেই শিল্পীরা সবাই তাঁর বন্ধু। সবার সঙ্গে ক্যানটিনে ভাগাভাগি করে খেতেই তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন বেশি। না হলে চাচাঁদের সঙ্গে বসে গুরুগম্ভীরভাবে খেতে হয়। বাড়িতে আব্বা-মা সবার সঙ্গে তারা গল্পগুজব করেই খেতেন।
খাওয়া হয়ে গেলে কামাল বললেন, প্লেটটা আমাকে দেন।
বেলাল ভাবলেন, কামাল হয়তো আরেকটু খাবার আনবেন। ও মা, তিনি। খাবার না এনে প্লেট ধুতে শুরু করে দিলেন।
বেলাল বললেন, করছেন কী, করছেন কী!
শেখ কামাল বললেন, বেলাল ভাই, আপনি তো খাবার নেবার আগে ধুয়েছিলেন, এবার আমার পালা। আমরা এক প্লেটে খেতে পারলে সেই প্লেট কি আমি ধুতে পারব না?
৪১
শেখ লুৎফর রহমান রহমান সাহেব বসে আছেন তাঁদের টুঙ্গিপাড়ার বাড়ির বারান্দায়। কবুতরগুলো বাকবাকুম রব তুলে গলার পালক ফুলিয়ে ডাকছে। কবুতরের বাসাটা চারটা বাঁশের ওপরে, ঘরের দেয়াল ঘেঁষে। সুন্দর ডিজাইনের এই দোতলাটা লুত্যর রহমান সাহেব কিছুদিন আগে করেছেন। খোকা বাড়ি এলে দুনিয়ার লোক এসে বাড়ি ভরে যায়। ১৯৬৯ সালে। ক্যান্টনমেন্টের বন্দিশালা থেকে বের হয়ে লঞ্চ ভাড়া করে যখন খোকা সবাইকে নিয়ে এই বাড়িতে এসেছিল, তখন ইউসুফ হারুন সাহেব হেলিকপ্টার নিয়ে এসেছিলেন। কাজেই বাড়িঘর ভালো করা দরকার। তাতে সুবিধা হয়েছে।
তবে সারা বছর বাড়ি তো খালিই পড়ে থাকে। লুৎফর রহমান সাহেব এবং খোকার মা মাঝেমধ্যে ঢাকায় গিয়ে থাকেন। নাসেরও তো থাকে খুলনা। বাড়ি তো বলতে গেলে ফাঁকা। এখন তিনি আছেন, খোকার মা আছে। একটা ঘরই লাগে। বাকি ঘরগুলো বছর ধরে পড়ে থাকে।
উঠানে মোরগ-মুরগি চড়ছে। দুটো কুকুর রান্নাঘরের সামনে অলস ভঙ্গিতে শুয়ে আছে। সারা রাত কুকুরদের জাগতে হয়, তাই তারা সারা দিন ঘুমায়। একটা কাক ডেকে উঠল বাড়ির পেছনের শজনেগাছের ডালে।
কাক কেন ডাকে? অনেক দিন আগে লুৎফর রহমান সাহেব একটা বটতলার বই দেখেছিলেন, কোন প্রহরে কার ডাকের কী ব্যাখ্যা। কাকের ডাকের সঙ্গে অন্য কোনো কিছুর কোনো যোগ আছে–এই সব কুসংস্কারে
তার একেবারেই সায় ছিল না কখনো। তবু আজ তার মনে অজানা শঙ্কা এসে। ভর করল।
আরশাদ কাঁসার গেলাস হাতে এসে পাশে দাঁড়াল।
লুৎফর রহমান সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, কী?
আরশাদ বলল, ডাবের পানি। খান। আপনের না পেশাবে সমস্যা। একটু খান। পেশাব ক্লিয়ার হবেনে।
লুৎফর রহমান সাহেব গেলাস হাতে নিয়ে বললেন, খোকার মারে দিছ?
জি। দিছি।
খোকার মা কই?
পাকঘরে।
গরমের মধ্যে পাকঘরে গেছে ক্যান? শেফালির মা নাই?
খালা পাকঘরে না গিয়া পারে না। অভ্যাস।
ঠিকই কইছ। অভ্যাস। দেশের খবর কী?
আর কোনো খবর নাই। মুক্তিফৌজ ভালো যুদ্ধ করতেছে। এইটা খালি জানি।
খোকার আর কোনো খবর পাইছ?
না। পাই নাই তো। করাচিতে রাখছে মনে হয়।
নাসেরের খবর পাইছ?
নাসের ভাইজান তো ইন্ডিয়া গেছে গা। ওইপার থাইকা যুদ্ধ করতাছে।
কামাল পৌঁছাইছে কি না খবর পাইছ।
হ। পাইছি তো। আপনারে না কইলাম। দুইজন আসছিল। মুক্তিযোদ্ধা। বইলা গেল, বর্ডার থাইকা খবর পাঠাইছে। কামাল মামা কলকাতা পৌঁছায়া গেছে।
রেনুর কোনো খবর পাইছ?
না। নতুন খবর পাই নাই কিছু। শুনলাম ভাবিরে নাকি বাড়িতে আটকায়া রাখছে।
গরুগুলানরে পানি দিছ?
জি দিছি।
আয়নাল কই। খেতে গেছে?
জি গেছে।
আইব কখন?
এই তো। বেলা তো অনেক হইছে। আয়া পড়ব।
জামিল কি গরুর ঘাস কাটতে গেছে?
জি গেছে।
কাশেম কই?
কাশেমরে কইলাম বাড়ির পেছনে একটু কোদাল চালাইতে। পুঁইশাক লাগান যায়। কথা শুনে না। জাল নিয়া খালে গেল। কয়, মাছ ধইরা আনি। আপনার কথা কয়। আপনে নাকি টাকি মাছের ভর্তা খাইতে চাইছেন।
কখন চাইলাম?
আরে নিজে খাতি চায়। সে জন্য কয়।
লুৎফর রহমানের বয়স কত কেউ জানে না। তিনি বলেন, এইটি প্লাস। সেই কবে তিনি আদালতের চাকরি ছেড়েছেন।
