মান্নান বললেন, তাহলে চলেন দোতলায় যাই। তাজউদ্দীন ভাইকে পুরা ঘটনা জানায়া আসি।
চলেন। আমগো একটা স্টুডিও লাগব। আর লাগব একটা অফিস।
তাজউদ্দীন সাহেব ওই ভবনের দোতলায় ছোট্ট একটা ঘরে একা ঘুমান। নিজের কাপড়চোপড় নিজেই ধোন। দুই সেট কাপড়। একটা যদি বৃষ্টির দিনে
শুকায়, তিনি মুশকিলে পড়েন। রান্নাবাড়া এই বাসাতেই হয়। অফিসের সবাই এখানে খান।
কাজেই তাদের দোতলায় উঠে যেতে কোনো অসুবিধা হলো না। তখন ঘড়িতে বাজে সাড়ে এগারো। তাজউদ্দীন জেগেই আছেন।
তাজউদ্দীন সব শুনলেন। হাসলেন। কারণ, তিনি জানেন, ট্রান্সমিটার জোগাড় হয়েছে। ভারতীয়রা তাকে সব রিপোর্ট আগেই করে।
বললেন, আপনারা অনুষ্ঠান করতে পারবেন শুনে খুব ভালো লাগল। এই বাড়িতেই একটা রুমের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। খালিই আছে। কাল থেকে কাজ শুরু করে দিন। আমরা তো এই অফিস ছেড়ে চলে যাব থিয়েটার রোডে। আপনাদের তাহলে আর কোনো অসুবিধা হবে না।
মুকুল মেলা রাতে ভাড়া করা বাড়িতে ফিরলেন। স্ত্রী বললেন, এত রাত হলো যে!
মুকুল বললেন, দেশের জন্য যুদ্ধ করতে আসছি, রাত বেশি না কম, হিসাব করার টাইম নাই।
রাতের বেলা আর ঘুমালেন না। কাগজ-কলম নিয়ে বসে পড়লেন মুকুল। আলাদা ঘর নেই। যাহা বেডরুম, তাহাই রিডিং রুম। মশারির ওপরে একটা লুঙ্গি দিয়ে আলো আড়াল করলেন, ওরা ঘুমুচ্ছে, ঘুমোক। টেবিল নেই, মেঝেতে বসে লিখে চললেন চরমপত্রের প্রথম কিস্তি।
পরের দিন মুকুল গেলেন বালু হক্কাক লেনে, জয় বাংলা অফিসে। মান্নান বসে আছেন। তাঁর মুখ গোমড়া। কপালে চিন্তারেখা স্পষ্ট। ওই মিয়া, আর তো ৪৮ ঘণ্টা নাই, আছে আর মোটে ৩২ ঘণ্টা।
আমি একটা জিনিস লিখে ফেলছি। একটু পইড়া দেন।
মান্নান পড়ছেন আর হাসছেন।
মুকুল বললেন, যাক আপনে হাসছেন। মেঘ সইরা গেছে। আলো ফুইটা উঠছে।
সঙ্গে সঙ্গে ঘরের ভেতরে আলো ফুটে উঠল যেন। ঢাকা বেতারের তিন কর্মী এসেছেন। আশফাকুর রহমান, তাহের সুলতান, টি এইচ শিকদার। তাঁরা বললেন, তাঁরা তিনজনই প্রোগ্রামের লোক।
মুকুল হাসছেন। আমাদের তো প্রোগ্রামের লোকই চাই।
আমরা সঙ্গে করে দেশাত্মবোধক গানের টেপ এনেছি।
তাহের সুলতান বললেন, আমি প্রোগ্রাম রেকর্ড করে দিতে পারব।
টেপগুলো ওরা এনেছিলেন বালিশের ভেতরে ভরে, ফিতা সব জড়াজড়ি করে একেবারে ছ্যাড়াব্যাড়া অবস্থা। ওরা সেই টেপগুলো নতুন স্কুলে ওঠালেন। ওদের কাজ দেখে মুকুল বললেন, মান্নান ভাই আর চিন্তা নাই।
এর মধ্যে এসে গেছেন আমিনুল হক বাদশা আর শিল্পী কামরুল হাসান। তাঁরা দুজনেই অনুষ্ঠানের জোগাড়যন্ত্র, পরিকল্পনা বিষয়ে সাহায্য করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন।
সার্কুলার রোডের মুজিবনগর অফিসের একটা রুমকে স্টুডিও বানানো হলো। দোতলার এই ঘরের পাশেই থাকেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রথম দিনের অনুষ্ঠানসূচি: সন্ধ্যা ৭টা ৩৫ পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত। অগ্নিশিখা (মুক্তিযোদ্ধাদের বিশেষ অনুষ্ঠান)। বাংলা সংবাদ। রক্তস্বাক্ষর (গণমুখী সাহিত্য অনুষ্ঠান)। বজ্রকণ্ঠ (বঙ্গবন্ধুর ভাষণ)। জাগরণী। ইংরেজি সংবাদ। চরমপত্র। দেশাত্মবোধক গান।
সংবাদের দায়িত্ব নিলেন কামাল লোহানী। খবর পড়লেন সৈয়দ হাসান ইমাম। ছদ্মনাম সালেহ আহমেদ। ইংরেজি খবর মিসেস টি হোসেন (নাম নিলেন পারভিন হোসেন)। কোরআন তিলাওয়াত করলেন জয় বাংলা সম্পাদক মাহমুদুল্লাহ চৌধুরী। অনুষ্ঠান ঘোষণা ও অনুষ্ঠানের দায়িত্ব আশফাকুর রহমান।
২৫ মে দেশের মানুষ মিডিয়াম ওয়েভ ৩৬১.৪৪ মিটার ব্যান্ডে শুনতে পেল : স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র।
.
ব্যাঙ্গমা বলে, দলে দলে শিল্পীরা আইসা স্বাধীন বাংলা বেতারে অংশ নিতে লাগল।
ব্যাঙ্গমি বলে, দেশের মানুষ জাইগা উঠল। সারা দেশের সব মানুষের কাম দাঁড়াইল রোজ রাইতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শোনা।
ব্যাঙ্গমা বলে, মুজিবনগর সরকারের সেরা কাজগুলানের একটা হইল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। এই এক বেতার সাড়ে সাত কোটি মানুষকে বাঁচায়া রাখছিল, জাগায়া রাখছিল। এই এক বেতারের অনুষ্ঠান শুইনা বেগম মুজিব, শেখ হাসিনা, রেহানা নিজেদের মন শক্ত রাখতেন, মুক্তিযোদ্ধারা খালি পায়ে, ছেঁড়া লুঙ্গি পইরা, কাদাপানিতে থ্রি নট থ্রি কাঁধে ফিট কইরা খিদা ভুইলা থাইকা ট্রিগারে আঙুল টিপত, এক কোটি শরণার্থী দ্যাশ স্বাধীন হইলে আর দুঃখু থাকব না, এই তো আর কয়টা দিন বইলা বাইচা থাকনের চেষ্টা করত!
.
বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের দোতলা বাড়ির নিচতলার ক্যানটিন। এখানেই সরকারের মন্ত্রীরা খান। নেপালি দারোয়ান তাঁদের পাহারা দিতে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকেন। মন্ত্রীরা খেয়েদেয়ে চলে গেলেন।
অমনি বেতার কর্মীরা এসে ঢুকলেন ক্যানটিনে।
এম আর আখতার মুকুল একটা খাসির মাংস দাতে ছেঁড়ার চেষ্টা করছেন, ছিঁড়ছে না, ছিঁড়ল যখন এক টুকরা ছিটকে গিয়ে পড়ল রাজশাহী থেকে আসা বেতার কর্মী শামসুল হুদা চৌধুরীর শার্টে, মুকুল বললেন, সরি, খাসির মাংস ভাইবা টান দিছিলাম, কুত্তার মাংস আছিল, তাই ছিটকায়া আপনার গায়ে পড়ছে, মাইন্ড কইরেন না।
শুনে বেলাল মোহাম্মদ হাসেন। প্লেট কম। তিনি লাইনে দাঁড়িয়ে একটা প্লেট পেয়েছেন। ভাত নিলেন। মাংস নিলেন। একটু ডাল কি নেবেন?
