আবারও তিনি প্রধানমন্ত্রীর দিকে ঘুরে তাকালেন, বললেন, আমার আর্মার্ড ডিভিশন হলো আমার স্ট্রাইকিং ফোর্স। এর মাত্র ১২টা ট্যাংক কাজ করে। বাকিগুলো করে না।
অর্থমন্ত্রী ওয়াই বি চ্যাবন বললেন, স্যাম, মাত্র ১২টা ট্যাংক! কেন?
কারণ আপনি অর্থমন্ত্রী! আমি আপনার কাছ থেকে টাকা চেয়ে আসছি। আর আপনি বলেই চলেছেন যে টাকা নেই।
এরপর মানেকশ বলতে লাগলেন, প্রধানমন্ত্রী, যদি ১৯৬২ সালে আপনার বাবা আমাকে সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে বলতেন, যাও, চীনাদের ছুঁড়ে ফেলে দাও, তাহলে আমি বলতাম, এই এই বাস্তব সমস্যা আছে। এখন আমি আপনাকে সমস্যাগুলো বললাম। তারপরেও আপনি যদি আমাকে যুদ্ধে যেতে বলেন, আমি যাব, তবে একটা গ্যারান্টি আমি আপনাকে দেব, ১০০ ভাগ পরাজয়।
জগজীবন রাম বললেন, স্যাম, প্রধানমন্ত্রীর কথা মেনে নাও না!
আমি আমার পেশাগত মত দিলাম। এখন সরকার সিদ্ধান্ত নিক। আমাকে জানাক।
ইন্দিরা গান্ধীর মুখ লাল হয়ে আছে। তিনি বললেন, আচ্ছা, চারটার সময় ক্যাবিনেট আবার বসবে। মন্ত্রীরা একে একে বেরিয়ে গেলেন। প্রধানমন্ত্রী বললেন, স্যাম, আপনি বসে থাকুন।
সবাই চলে গেল। মিটিং রুমে ইন্দিরা আর মানেকশ।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি মুখ খোলার আগে আমি পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারি। আপনি কোনটা চান, আমি কি মানসিক অসুস্থতার কথা বলব, নাকি শারীরিক অসুস্থতার কথা?
ইন্দিরা বললেন, স্যাম, আপনি বসুন তো। আপনি শুধু বলুন, আপনি যা বললেন তার সবই কি সত্য?
জি সত্য। আমার কাজই তো যুদ্ধ করা। যুদ্ধ করে হারা নয়, জেতা। আপনি বলুন আপনি কি রেডি? আপনার ঘর কি রেডি? আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে আপনি কি রেডি? আমার মনে হয় না। আমি জানি আপনি কী চান। আমি আপনাকে সেটাই এনে দেব। তবে সেটা আমাকে আমার সময়ে করতে দিন। আমি আপনাকে ১০০ ভাগ বিজয়ের গ্যারান্টি দিচ্ছি। আরেকটা কথা। আমি বিএসএফের অধীনে কাজ করতে রাজি আছি, সিআরপিএফের (সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স) অধীনে কাজ করতে রাজি আছি। কিন্তু একটা সোভিয়েত এসে বলবে কী করতে হবে, কী করতে হবে না। এটা চলবে না। আর আমি মাত্র একজন পলিটিক্যাল নেতা চাই, আমি যার কথা শুনব। একবার রিফিউজি মন্ত্রী বলবে, একবার দেশরক্ষামন্ত্রী বলবে, একবার বিদেশমন্ত্রী বলবে, তা হবে না। এখন আপনি আপনার সিদ্ধান্ত নিন।
ইন্দিরা বললেন, আচ্ছা কেউ আপনার কাজে হস্তক্ষেপ করবে না। আপনিই হলেন কমান্ডার।
মানেকশ বললেন, ধন্যবাদ। আমি আপনাকে গ্যারান্টি দিচ্ছি আপনাকে আমি জয় এনে দেব।
.
ব্যাঙ্গমা বলে, মানেকশ কোয়ারটারডেক পত্রিকায় ১৯৯৬ সালে এই সাক্ষাৎকার দিছিলেন।
ব্যাঙ্গমি, হ। এইটা তাঁর ভাষ্য। এইটাতে একটু রং আর নাটকীয়তা থাকতে পারে। মানেকশ লেখছিলেন, ফিল্ড মার্শাল হওয়া আর বরখাস্ত হওয়ার মাঝখানে ব্যবধান বড় সামান্য।
৩৯
কার্গো প্লেনে এর আগে কেউই চড়েনি। সোহেল ছোট্ট, সে তো কিছুই বুঝবে না, মিমি শুধু বমি করছে, ওর শরীরটা বেশ খারাপ। আম্মুও বললেন, আমিও কোনো দিন এই ধরনের প্লেন দেখিনি।
রিমি বলল, আসলে তো এটা মালামাল পরিবহনের প্লেন।
রিপি বলল, তবু তো প্লেন। আমাদের যে হেঁটে আগরতলা থেকে কলকাতা যেতে হচ্ছে না এই তো বেশি। না আম্মু?
লিলি মাথা নাড়লেন। ঠিক তা-ই।
রিমি বলল, আমরা তো হাঁটতে পারি। আম্মুর যে পা ভাঙা।
রিপি বলল, সেই ভাঙা পা নিয়েও আম্মুকে কত হাঁটতে হলো।
প্লেন বাগডোগরা বিমানবন্দরে নামল। এটা শিলিগুড়িতে। তেল নেবে।
প্লেনে উঠলেন তোফায়েল কাকু।
তোফায়েল আহমেদ কাকু লিলিকে সালাম দিলেন। বললেন, ভাবি, আপনাদের কথা ভেবে অনেক দুশ্চিন্তা করেছি। কীভাবে এলেন।
.
প্লেনের ভেতরে চার-পাঁচটা চেয়ার আর দুইটা বেঞ্চ পেতে দেওয়া হয়েছে। আম্মু আর তোফায়েল কাকু পাশাপাশি বসেছেন। রিমি আর রিপি বসল। তোফায়েল কাকুর উল্টো দিকে।
রিমি বলল, কাকু, আমরা যে কতবার কত জায়গায় পালিয়ে গেছি।
রিপি বলল, কাকু, খুব ভয় লাগত। শুধুই খবর আসত, মিলিটারি আসছে। আর আমরা এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি, এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে গেছি।
রিমি বলল, আমরা কতবার কত জায়গায় গেছি, আপনাকে আঙুলে গুনি বলি।
রিপি বলল, আম্মু আমাদের ধানমন্ডির বাড়ির পেছনের বাড়িতে ছিলেন। সেখান থেকে এ বাড়ি ও বাড়ি কত বাড়ি গেছেন।
রিমি বলল, এক বাড়িতে আম্মুকে বাইরে রেখে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল।
রিপি বলল, আমরা ছিলাম খালার বাড়িতে। তারপর কারফিউ তুলে নিলে আমরা চলে যাই আমাদের গ্রামের বাড়িতে।
রিমি বলল, সেখানেও পাকিস্তানি মিলিটারি এল গুলি করতে করতে।
রিপি বলল, তারপর আমরা পালিয়ে আবার একটা গ্রামে গেলাম। সেখান থেকে আবার আরেকটা গ্রামে। তারপর সেখান থেকে আরেকটা গ্রামে। লঞ্চে চড়ে চড়ে গেছি।
রিমি বলল, আবার ঢাকা ফিরে গেছি। মামুর বাসায় ছিলাম।
রিপি বলল, জানেন আমাদের বাড়িতে মিলিটারি ক্যাম্প বানিয়েছে। সেখানে নানা থাকেন। নানাকে মিলিটারি বলেছে, আপনি এত ভালো উর্দু জানেন, ইংরেজি জানেন, মেয়েকে হিন্দু লোকের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছেন কেন। ওর নাম তো তাজউদ্দীন না, ওর নাম ত্যাজারাম।
রিমি বলল, তারপর আমরা আগরতলা যাওয়ার জন্য আবার লঞ্চে চড়ে ঢাকা ছাড়লাম।
