মানেকশ দাঁড়িয়ে থেকে নির্বিকার মুখে বললেন, আমি কিছুই করছি না। আমার এই ব্যাপারে কীই-বা করার আছে।
আপনার কি কিছুই করার নেই? আপনি কেন কিছু করছেন না? ইন্দিরা বললেন।
আপনি কী চান? আমি কী করি? মানেকশ নিরুত্তাপ গলায় বললেন।
আমি চাই আপনি মার্চ ইন করুন। পূর্ব পাকিস্তানে ঢুকে পড়ুন।
তার মানে আপনি চাইছেন যুদ্ধ?
যুদ্ধ হলে যুদ্ধ। আমি কিছু মনে করব না যদি তার মানে যুদ্ধই হয়।
মানেকশ বললেন, আপনি কি বাইবেল পড়েছেন?
পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং বললেন, বাইবেলের প্রসঙ্গ এখানে কীভাবে আসছে?
মানেকশ বসে পড়লেন। বললেন, বাইবেলের প্রথম বইয়ে প্রথম অধ্যায়ের প্রথম অনুচ্ছেদে আছে, ঈশ্বর বললেন, লেট দেয়ার বি লাইট। আলো আসুক। আর আলো এসে গেল। আপনি বলছেন, লেট দেয়ার বি ওয়ার। যুদ্ধ হোক। আর যুদ্ধ ঘটতে লাগল। আপনি কি প্রস্তুত? আমাকে যদি বলেন, আমি বলব, আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, আমি প্রস্তুত নই।
কেন প্রস্তুত নন। আমরা কি গত বছর থেকেই জানি না যে একটা যুদ্ধ আসন্ন? আমরা কি ১৯৬৮ সাল থেকেই র-এর প্রকল্প বাংলাদেশ বিষয়ে জানি।? আমরা কি মার্চের শুরু থেকেই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা ভাবছি? এপ্রিলের শুরুতেই আমি আপনাকে অভিযানের নির্দেশ পৌঁছে দিইনি?
মানেকশর মনে পড়ছে সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলের চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জে এফ আর জ্যাকবের সঙ্গে তার কথোপকথন। ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশ পেয়ে মানেকশ ফোন করেছিলেন জ্যাকবকে। সরকার চাইছে তুমি সৈন্যদের নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে ঢুকে যাও। জ্যাকব বলেছিলেন, একেবারে অসম্ভব একটা নির্দেশ। একেবারে অবাস্তব। আমাদের হাতে আছে শুধু মাউন্টেন ডিভিশন। এরা পাহাড়ি এলাকায় যুদ্ধ করতে জানে। এরা জানে না কী করে সমতলে চলতে হয়। বাংলাদেশ একটা নিচু পলিমাটির এলাকা। সমতলের সমতল। একটু পরপর নদী। বর্ষাকালে সেই নদী দুকূল উপচে পুরো বাংলাদেশকে জলমগ্ন করে ফেলে। আমাদের হাতে সেতু বানানোর যন্ত্রপাতি, সরঞ্জাম নেই। বাংলাদেশের ওই পারে আগরতলায় মাত্র একটা গ্যারিসনে মাত্র গোলন্দাজ ব্যাটালিয়ন। মানে আগরতলা অরক্ষিত। আমাদের মাউন্টেইন ট্রুপস ট্রেনিং দিতে হবে, সেতু বানানোর যন্ত্রপাতি, সরঞ্জাম দিতে হবে। ট্রপস আনতে হবে। আগরতলা পর্যন্ত পৌঁছাতে হলে কত ঘুরে যেতে হয় আপনি জানেন। সামনে বর্ষাকাল। বাংলার নদী কূলহারা হয়ে পড়বে। ধানখেতে ভরে থাকবে ধান আর পানি। আমরা যদি ঢুকেই পড়ি, বড়জোর আমরা পদ্মার পশ্চিম পার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারব। এখন পর্যন্ত বড় বড় আন্তর্জাতিক শক্তি বাংলাদেশের ব্যাপারে কোনো অবস্থান। নেয়নি। মানেকশ জানেন, কথা সত্য। ব্রিটেন এখনো বলছে, এটা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। ২ এপ্রিল ইয়াহিয়ার কাছে সুপ্রিম সোভিয়েত সভাপতিমণ্ডলীর সভাপতি নিকোলাই পদগোর্নি লিখেছেন, পূর্ব পাকিস্তানে রক্তপাত বন্ধ করার জন্য, সেখানকার মানুষের ওপর নিপীড়নের অবসান ঘটানোর জন্য এবং সমস্যা সমাধানের একটা শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক উপায় উদ্ভাবনের জন্য অত্যন্ত জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আপনাকে সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাচ্ছি। …উদ্ভূত সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানকে সমগ্র সোভিয়েত জনগণ সন্তোষের সঙ্গে গ্রহণ করবেন।
সোভিয়েত ইউনিয়ন এখনো ইয়াহিয়াকেই অনুরোধ করে যাচ্ছে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানের জন্য। আমেরিকা পাকিস্তানের পক্ষে, কিসিঞ্জার, নিক্সন নীতি নিয়েছেন নিষ্ক্রিয়তার। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডগলাস হোম এটা একটা দেশের দুই অংশের মধ্যে অভ্যন্তরীণ সংকট হিসেবে বর্ণনা করেছেন। চীন ব্যাপারটাকে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীদের অপকর্ম হিসেবে দেখছে। মানেকশ জ্যাকবকে বলেন, তাহলে আমরা কোন তারিখে রেডি হতে পারব?
জ্যাকব বলেন, সেতু বানানোর যন্ত্রপাতি পেলে, সবচেয়ে কাছাকাছি আমরা ১৫ নভেম্বরে রেডি হতে পারব।
পরের দিন মানেকশ আবারও ফোন করতে বাধ্য হলেন জ্যাকবকে।
জ্যাকব, মন্ত্রীরা এবং আমলারা আর্মিকে যদি কাপুরুষ না-ও বলে থাকে, অবশ্যই ওভারকনশাস বলছে। আমরা নাকি বেশি সাবধান! তুমি আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হও।
না। আপনি তাদের বলুন, জ্যাকব রাজি না।
তা হয় না। তিনি সেনাপ্রধান। দায়িত্ব তাঁকে নিতে হবে। তিনি অর্ডার করেছেন, তাঁর অধীন লোক অর্ডার মানছে না, এটা তো আর্মিতে হতেই পারে না। তাহলে হয় তাঁকে চলে যেতে হয়, অথবা অধীনস্থকে চলে যেতে হয়।
ইন্দিরা গান্ধী তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। পুরো মন্ত্রিসভা তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। মানেকশ বললেন, আমি আপনাদের বলছি কী ঘটছে। এখন এপ্রিলের শেষ। আর ১৫-২০ দিনের মধ্যে শুরু হবে প্রচণ্ড মৌসুমি বৃষ্টিপাত। বর্ষাকালে পূর্ব পাকিস্তানের নদীগুলো সব সাগরের মতো বিশাল হয়ে যায়। নদীর এক পাড় থেকে আরেক পাড় দেখা যায় না। আমাকে পথে আটকে থাকতে হবে। পাকিস্তানি আর্মি আমাকে পেটাতে থাকবে। এ হলো একটা দিক। দুই নম্বর হলো : আমার আর্মার্ড ডিভিশন এখন বাবিয়ানা এলাকায়। আরেকটা আছে সেকান্দারাবাদে। এখন চলছে ফসল তোলার মৌসুম। আমাকে যদি সৈন্য মুভমেন্ট করতে হয়, প্রতিটা ট্রাক, প্রতিটা গাড়ি, প্রতিটা রাস্তা, প্রতিটা রেলগাড়ি রিকুইজিশন দিতে হবে। মানেকশ তাকালেন কৃষিমন্ত্রী ফখরুদ্দীন আলী আহমেদের দিকে, বললেন, তারপর যদি দুর্ভিক্ষ হয়, আপনি আমাকে দায়ী করবেন না।
