রিপি বলল, আমরা রামচন্দ্রপুর গ্রামে ওয়্যারলেস অফিসারের বাড়িতে থাকলাম। পরে গেলাম এমএনএর বাড়ি। রাতের বেলা ঘুম থেকে ডেকে তুলে বলল, পালাতে হবে। আবার পালানো শুরু।
রিমি বলল, একটা সিঅ্যান্ডবি ব্রিজের ওপরে আর্মির টহল থাকে। নিচ দিয়ে যেতে হবে।
রিপি বলল, আমরা নৌকা ছেড়ে দিয়ে হেঁটে হেঁটে ব্রিজের নিচ দিয়ে পার হয়ে এসেছি। সেখান থেকে গেলাম সিদলা গ্রামে।
রিমি বলল, তারপর নৌকা। নৌকা ছেড়ে দিয়ে হাঁটা। কত আলপথ, কত টিলা, কত রাস্তা যে আমাদের হাঁটতে হয়েছে। একটা সরু বাঁশের সাঁকো পার হতে গিয়ে…
রিপি বলল, রিমি কেঁদে দিয়েছিল। রিমি বলল, তারপর আমরা বর্ডার পার হলাম।
তোফায়েল আহমেদ মন দিয়ে গল্প শুনছেন। আম্মু ঘুমিয়ে পড়েছে। তার কোলে সোহেল। সে জেগে উঠে কাঁদতে শুরু করে দিয়েছে।
মোট নয় ঘণ্টার উড়াল শেষে বিমান অবতরণ করল দমদম বিমানবন্দরে।
তোফায়েল কাকু বললেন, আপনারা কোথায় যাবেন? আমার সঙ্গে চলুন। আমি পৌঁছে দিই।
লিলি বললেন, আমাদের নিতে লোক আসবে। আমরা তাদের সঙ্গেই যাই। হাইকমিশনে যেতে বলেছে।
তাদের নিতে দুজন ভদ্রলোক এলেন। দুটো অ্যাম্বাসেডর ট্যাক্সিতে তারা চললেন পার্ক সার্কাস। ততক্ষণে দিনের আলো নিভে এসেছে। রিমি, রিপি গাড়ির জানালা দিয়ে কলকাতা দেখছে।
দমদম পুরো গ্রাম। ছোট বিমানবন্দর। সেখান থেকে যাওয়ার পথেও গাছগাছড়া। অনেকক্ষণ চলার পরে কলকাতা শহর শুরু হলো। ল্যাম্পপোস্টে নিয়নবাতি জ্বলছে। অনেক ট্যাক্সি। সব অ্যাম্বাসেডর গাড়ি। টানা রিকশা দেখতে পেয়ে রিমি আঙুল তুলে দেখাল, ওই যে টানা রিকশা। ভয়ানক ভিড় রাস্তাঘাটে। আর ওই যে ট্রাম। টুংটুং শব্দ তুলে চলছে।
শেষে গাড়ি এল কলকাতার বাংলাদেশ হাইকমিশনে। লাল রঙের একটা পুরোনো বাড়ি। কিন্তু বড়ই সৌকর্যময়। আম্মু বললেন, ইংরেজ আমলের বাড়ি।
১৮ এপ্রিল পাকিস্তানের কলকাতা উপহাইকমিশনের সকল কর্মকর্তা কর্মচারী একযোগে নিজেদের বাংলাদেশ হাইকমিশন বলে ঘোষণা দিয়েছে। পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে তুলে দিয়েছে বাংলাদেশের পতাকা। সাইনবোর্ডও বদলে ফেলেছে।
.
ব্যাঙ্গমা বলে, কাজটা করা অত সহজ আছিল না।
ব্যাঙ্গমি বলে, অতিগোপনে তাজউদ্দীন আহমদ আর উপহাইকমিশনার হোসেন আলী একটা গাড়িতে বইসা মিটিং করেন। হাইকমিশনের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী আগের হারেই বেতন পাইবেন, তাদের লাইগা হাইকমিশনে। জমা টাকা থেকে আলাদা কইরা রাইখা দেওয়া হইব, এই সব শর্ত উত্থাপিত হইলে তাজউদ্দীন রাজি হন।
.
হাইকমিশন অফিসের পাশেই হোসেন আলী সাহেবের বিরাট বাসভবনটাও লাল। দোতলা। অনেক রুম। বিশাল ড্রয়িংরুম। বাড়ির সামনে লন। এতে মাঝেমধ্যেই বড় বড় পার্টি করা যায়, সেই ব্যবস্থা আছে। সরকারের প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের জন্য হোসেন আলী সাহেব তার গেস্টরুম দিলেন।
সবাই ভীষণ ক্লান্ত, খেয়েদেয়ে সোহেল, মিমি, রিমি, রিপি ও তাদের আম্মু শুয়ে পড়লেন।
একটু পরে হোসেন আলীর ছেলেমেয়েরা ডাকল রিমি আর রিপিকে। এই এসো। একটা জিনিস শোনাই।
রেকর্ড প্লেয়ারে বাজতে থাকল গান :
শোনো একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি
প্রতিধ্বনি আকাশে-বাতাসে ওঠে রণি, বাংলাদেশ, আমার বাংলাদেশ। তারপর বাজতে লাগল :
ভায়েরা আমার, আজ দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি, আপনারা সব জানেন সব বোঝেন…এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।
রিমি চোখ বড় বড় করে এই গান আর ভাষণ শুনতে লাগল। বড় ভালো লাগার গান। বড় ভালো লাগার ভাষণ। তারা এই গান আকাশবাণীতে আগেও শুনেছে। আর মুজিব কাকুর ভাষণ তো তাদের অনেকবার শোনাই। তবে এই ভাষণ যতই শোনা যায়, ততই ভালো লাগে। সমস্ত গায়ে কাঁটা দেয়।
রাত ১২টার পর তাদের আলু এলেন।
আব্বু রিমি-রিপিকে আদর করলেন। তারপর রিপিকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কেমন ছিলে?
রিপি বলল, আব্ব, আমাদের কাঁপাসিয়া থানা লুট করে অস্ত্র নিয়ে গেছে। মুক্তিযোদ্ধারা। ১০ এপ্রিলে। আপনি যেদিন ভাষণ দিয়েছিলেন।
রিমি বলল, আব্বু আমরা এক বাড়িতে ছিলাম না। বারবার পালিয়েছি মিলিটারির অত্যাচারে। পথে আমরা অনেক লাশ দেখেছি। লঞ্চে-নৌকায় চলার সময় পানিতে লাশ ভেসে যেতে দেখেছি।
আব্বু উঠলেন। আম্মু যে ঘরে ছিলেন, সেই ঘরের দরজায় দাঁড়ালেন। বললেন, লিলি কেমন আছ। শোনো, আমি বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারব না। ৭-৮ মিনিটের জন্য এসেছি। অনেক কাজ। তোমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তোমরা আপাতত কোহিনূর প্যালেসে উঠবে। পরে নজরুল ভাই, মনসুর আলী ভাইদের বিল্ডিংয়ে ফ্ল্যাটে উঠবে। আরেকটা কথা, আমি একটা প্রতিজ্ঞা করেছি। যত দিন দেশ শত্রুমুক্ত না হচ্ছে, যত দিন নিজের দেশে ফিরে যেতে না পারছি, তত দিন দাম্পত্য জীবন যাপন করব না। কাজেই আমি তোমাদের সঙ্গে থাকব না। আমি থিয়েটার রোডে আমাদের অফিসের পাশে রুম নিয়ে থাকি। ওখানেই থাকব।
লিলি থ। তাঁর মনে কত কথা। কত কিছু বলার ছিল। কত কিছু বলবেন। বলে পরিকল্পনা করে রেখেছেন। কিসের কী। আচ্ছা, সেই ভালো। দেশ স্বাধীন করার মিশন নিয়ে এসেছ। দেশ স্বাধীন করো।
