জামাল হেসে উঠলেন। এই রুটি গুলি না করে ভেঁড়া যাবে বলে তো মনে হচ্ছে না!
বাইরে সশস্ত্র সেনাপ্রহরা। তারা ক্যাম্প বানিয়ে বাড়ির চারদিকে পাহারা বসিয়ে সঙিন উঁচিয়ে রইল।
৩৮
ইন্দিরা গান্ধীর মন খারাপ। মেজাজও খারাপ। মন খারাপ থাকলেই তাঁর মেজাজ খারাপ হয় না। অনেক সময় খুব মন খারাপ থাকলে তিনি খুব নরম হয়ে যান। তখন নাশতার টেবিলে রাহুলকে কোলে নেন, আর পরিচারিকা নারীটির হাতে একটা আঙুর তুলে দেন। আবার মেজাজ খারাপ অবস্থায়, তিনি গুনগুন করে রবীন্দ্রসংগীতও গাইতে থাকেন, একা একা, কাউকে না শুনিয়ে। আজকে তার মন খারাপ। কারণ, বাংলাদেশ থেকে খুব মন খারাপ করা খবর আসছে। পাকিস্তানি মিলিটারি সাধারণ মানুষদের ওপরে নির্বিচার গুলি চালাচ্ছে, বাড়িঘরে আগুন দিচ্ছে, লাশে লাশে সব ছেয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেছেন যে এরই মধ্যে ১০ লাখ বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু তিনি রাগে ফুঁসছেন এ জন্য যে র রিপোর্ট করছে, নারীদের ওপরে অকথ্য নির্যাতন করা হচ্ছে। সকালবেলা বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এবং সংবাদপত্রের খবর পড়েই তিনি বিষণ্ণ হয়ে ছিলেন। তার ওপর যখন শরণার্থীদের আসার স্রোত লক্ষ করলেন, তখন তার নিজেকে মনে হলো অসহায়। এরই মধ্যে ৫ লক্ষাধিক শরণার্থী এসে গেছে, মে মাসের শুরুতে সংখ্যাটা ১০ লাখ অতিক্রম করবে। শুধু ১০ লাখ লোককে খাওয়াতে-পরাতে হবে, তা-ই না, এরা সামাজিক রাজনৈতিক আইনশৃঙ্খলা এবং স্বাস্থ্যগত সমস্যা তৈরি করবে। এরা যদি কলেরায় আক্রান্ত হতে থাকে, তাহলে তো শুধু এরাই মারা যাবে না, আশপাশের জনপদের মানুষও মারা যেতে থাকবে। এরা যদি নকশালবাদী হয়ে যায়, তাহলে এখনই পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে যে ভয়াবহ সমস্যায় ভারত ভুগছে, তা কত গুণ বেড়ে যাবে। এরা যদি সিপিআইএমের ভোটার হয়ে যায়, ভোটের হিসাব পাল্টে দেবে।
মন ও মেজাজ দুটো খারাপ, এই অবস্থায় ইন্দিরা গান্ধী তার অফিসে এলেন। ২৫ এপ্রিল ১৯৭১। দিল্লির আবহাওয়া সবে গরম হতে শুরু করেছে, যদিও তাপমাত্রা এখনো দিল্লির কুখ্যাত গরমের তুলনায় তেমন কিছু না বলেই মনে হচ্ছে। গাড়ি থেকে নেমে তিনি একবার বায়ে তাকালেন, চোখে সানগ্লাস, তিনি কী দেখছেন, কী ভাবছেন, তাঁর প্রহরীরাও জানছে না। তিনি কয়েক ধাপ সিঁড়ি বেয়ে করিডর পেরিয়ে নিজের অফিসের দিকে হাঁটতে লাগলেন। আজ মন্ত্রিসভার বৈঠক আছে। নিজের ঘরে কিছুক্ষণ বসলেন। তার সচিব এবং উপদেষ্টারা তাকে ব্রিফ করলেন। এর মধ্যে আছে তিনটা টেলিগ্রাম। তিনটা এসেছে কলকাতা, গুয়াহাটি আর আগরতলা থেকে। শরণার্থীতে রাজ্যগুলো ভেসে যাচ্ছে, এখন তারা কী করবেন?
তিনি সভাকক্ষে প্রবেশ করলেন। মন্ত্রীরা এবং কর্মকর্তারা দাঁড়িয়ে তাঁকে নমস্কার জানালেন। তিনি বসার সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রীরা কথা শুরু করলেন।ম্যাডাম, বাংলাদেশ সমস্যা নিয়ে আমাদের এখনই কিছু করা উচিত। আমরা কিছুই করছি না। এটা চলতে পারে না।
ইন্দিরা চোখে একটা ডার্ক গ্লাসের চশমা পরেছেন। তিনি অন্যদের তাঁর চোখের ভাষা বুঝতে দিতে চান না।
আমরা কিন্তু বাংলাদেশের জন্য কিছুই করছি না।
আমাদের উচিত এমন কিছু করা, যাতে পাকিস্তান চিরদিনের জন্য একটা শিক্ষা পায়।
ম্যাডাম, পাকিস্তানকে শিক্ষা দেওয়ার এমন সুযোগ আর এক মিলিয়ন বছরেও আসবে না।
ইন্দিরা গান্ধী বললেন, এই, জেনারেল মানেকশজিকে বোলাও।
ইন্দিরা গান্ধী এই মত জানেন, বহু ভারতীয় চায়, এখনই ভারতীয় সৈন্য ঢুকে যাক বাংলাদেশে, পরাজিত করুক পাকিস্তানিদের, সাহায্য করুক স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায়। এই মতের একজন হলেন কে সুব্রামানিয়াম, খুব সিনিয়র আমলা, যিনি যুদ্ধ-রণনীতি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। পরিচালক, ডিফেন্স স্টাডিস অ্যান্ড অ্যানালাইসিস, দিল্লি। সুব্রামানিয়ামের মত হলো, এই লড়াই বেশি দিন চলতে দেওয়া যাবে না, অতি দক্ষ, প্রশিক্ষিত নিয়মিত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নিরস্ত্র জনতার লড়াই বেশি দিন চলতে পারে না, বাঙালিরা হতাশ হয়ে যাবে, যার ফল ভালো হবে না। খুব দ্রুত আক্রমণ করতে হবে এবং এমন করে আক্রমণ করতে হবে যেন পাঁচ দিনের মধ্যেই যুদ্ধ শেষ করে ফেলা যায়। সুব্রামানিয়ামের এই মত তিনি লিখিতভাবে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে দিয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের দিয়েছেন, আর প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রাম ও অর্থমন্ত্রী ওয়াই বি চ্যাবন এখন এই কথাটাই পাড়লেন প্রধানমন্ত্রীর সামনে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল স্যাম মানেকশ এসে হাজির হলেন। মানেকশর চুল সৈন্যদের তুলনায় লম্বা, তিনি ইন্দিরা গান্ধীর বছর পাঁচেকের বড়, ইন্দিরার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক সুন্দর, উষ্ণ এবং পরিহাসময়। তাঁর সাদাকালো গোঁফে তাকে কিছুটা চার্লি চ্যাপলিনের বড় সংস্করণ বলে মনে হচ্ছে।
ইন্দিরা বললেন, মানেকশ, এই হচ্ছে টেলিগ্রাম, এটা পাঠিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী, এটা পাঠিয়েছেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী, এটা পাঠিয়েছেন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী। শরণার্থী আর শরণার্থী। এসব কী হচ্ছে? আপনি এই ব্যাপারে কী করছেন?
মানেকশ আগে থেকেই জানেন তাকে কী বলা হবে। তিনি ঠিক করেছেন তিনি মাথা ঠান্ডা রাখবেন। ঠান্ডাস্বরে কথা বলবেন।
