রেনু কাঁদবেন না। রেনু একটা আহ্ শব্দও করবেন না। তিনি খোকাকে বললেন, ওই ড্রয়ারটা খোল তো। ওইটাতে চেকবই থাকার কথা।
চেকবই পাওয়া গেল। সোনাদানা, টাকাপয়সা, বাসনকোসন লুট হয়েছে, চেকটা লুট হয়নি, চেকবই নিয়ে ব্যাংকে গেলে ধরা পড়ার ভয় থেকে যায় তো। খোকা ময়লা ড্রয়ার খুলে চেকবইগুলো নিলেন।
বাইরে এলেন তাঁরা। খোকা মেজর জেনারেল উমরকে বললেন, এই যে চেক পাওয়া গেছে, অথরাইজেশন লেটার আনিয়ে দিন।
উমর বললেন, আপনি একটা অথরাইজেশন লেটার লিখে আমাকে পাঠিয়ে দেবেন। আমি ব্যবস্থা করে দেব।
রেনু আর খোকা খোকার গাড়িতে করে মগবাজার পেট্রলপাম্পের পেছনে নতুন ভাড়া নেওয়া বাড়িতে। বদরুন্নেসা আপার বাড়িটা ছেড়ে দিয়ে তাঁরা এই বাড়িটা ভাড়া নিয়েছেন, বদরুন্নেসাদের বাড়িটা ছিল বড় রাস্তার ওপরে, আর সন্দেহজনক লোকদের ওই বাড়ির সামনে ঘোরাফেরা করতে দেখা যাচ্ছিল। তারপর খোকা বের হলেন অথরাইজেশন লেটার টাইপ করানোর জন্য। টাইপ করা শেষে সেটা উমরের লোকের হাতে তুলে দিয়ে থোকা ফিরে এলেন তার ভাবির কাছে।
.
ব্যাঙ্গমা বলবে, পরে বঙ্গবন্ধুর সাইনসহ সেই অথরাইজেশন লেটার ব্যাংকের ঠিকানায় ফিরা আসে। ব্যাংকের ম্যানেজার যোগাযোগ করেন খোকার লগে। খোকা ব্যাংকে গিয়া তার মিয়া ভাইয়ের সইটা দেইখা জানে পানি ফিরা পান। এর মানে হইল, বঙ্গবন্ধু বাইচা আছেন।
.
রেনু বললেন, ভাইডি, ব্যবস্থা কর। আমরা আজ সন্ধ্যাতেই এখান থেকে পালায়া যাব। পারবি না আমাদের নিয়ে সরে যেতে?
খোকা বললেন, ভাবি। আপনি বললে অবশ্যই পারব। তবে সমস্যা হলো, আপনাকে সবাই চেনে। হাসিনাকেও সবাই চেনে। অন্য দশটা পরিবার সহজে পালাতে পারে। আপনাদের পক্ষে পালানো খুব কঠিন। বাঙালিরা যেখানেই আপনাদের দেখবে, ঘিরে ধরবে। বিহারিরা দেখলে, পাকিস্তানিরা দেখলে, জামাতি মুসলিম লীগাররা দেখলে মেরে ফেলবে। তারপরও আপনি বলছেন, চলেন, বিকেলের দিকে বের হই। ওয়াজেদের গাড়ি আমার গাড়ি দুইটা গাড়ি নিয়ে গ্রামের দিকে চলে যাব। যা হয় হবে।
শেখ হাসিনা নাজুক শরীর নিয়ে রান্না করেছেন। রেনু নামাজ পড়তে জায়নামাজে বসেছেন। জামালও নামাজ পড়ছেন। জামাল সালাম ফিরিয়ে মোনাজাত করতে যাবেন, এই সময় আবদুল বারান্দা থেকে বলে উঠল, ভাইয়া, দেখে যান।
জামাল বারান্দায় গিয়ে নিচে তাকালেন। দুটো ট্রাকের মতো। ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে শুধু বন্দুকের নল। তিনি দ্রুত ঘরে ঢুকে মাকে বলতে লাগলেন, মা, গাড়িভর্তি শুধু বন্দুক আর বন্দুক।
খোকা সাব, জামাল বলতে বলতে বুটের আওয়াজ তুলে কতগুলো লোক দোতলায় উঠে এল।
তারা দরজায় ধাক্কা দিতে লাগল।
ওয়াজেদ মিয়া দরজা খুললেন।
সামনে দাঁড়ানো লোকটা বললেন, আমি মেজর হোসেন। এই বাড়িতে শেখ মুজিবের ফ্যামিলি আছে। আমি তাদের অ্যারেস্ট করতে এসেছি।
ওয়াজেদ মিয়া বললেন, আপনাদের কাছে ওয়ারেন্ট আছে?
মেজর বললেন, দেশে মার্শাল ল চলছে। আমি মিলিটারির এমন বিভাগের কর্মকর্তা, যারা যেকোনো কাউকে যেকোনো সময় অ্যারেস্ট করতে পারে। তার হাতের ওয়্যারলেস তুলে তিনি কাউকে খবর দিলেন আরও ফোর্স পাঠাতে।
বেগম মুজিব বেরিয়ে এলেন। বললেন, আমাকে কেন অ্যারেস্ট করবা?
আমি কি রাজনীতি করি?
মেজর বলল, আপনাদের আমাদের সাথে যেতে হবে। বেগম মুজিব, রেহানা, রাসেল আর জামাল যাবে। বাকিরা আলাদা পরিবার। বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। উনি স্বামীর সঙ্গে থাকতে পারবেন। খোকা আলাদা ফ্যামিলি।
রেনু বললেন, আমার মেয়ে প্রেগন্যান্ট। তাকে ছেড়ে আমি কোথাও যাব না।
আচ্ছা তাহলে তাকে সঙ্গে নিয়েই চলেন।
না। যাব না।
আপনারা যদি আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা না করেন, আপনাদের আমরা করাচি পাঠিয়ে দেব।
বাড়িতে তো আসবাব বলতে কিছু ছিল না। যা দুই-চারটা বাসনকোসন ছিল, সেসব বস্তাতে ভরে রমা আর আবদুলকে রাখা হলো সেসবের সঙ্গে। ওয়াজেদ আর খোকার দুই গাড়ি, আর্মির জিপ-ট্রাক মিলে একটা সেনাবহর, ট্রাকের সামনে এলএমজি বসানো, সৈনিকদের হাতে হাতে স্টেনগান, সন্ধ্যার সময় মগবাজার থেকে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল হয়ে তাঁদের আনা হলো ধানমন্ডি ১৮ নম্বর রোডের ২৬ নম্বর বাড়িতে। বাড়ির ভেতরে তাঁদের ঢুকিয়ে দিয়ে বাইরে থেকে তালা দেওয়া হলো।
পুরো বাড়ি অন্ধকার। মেঝে সঁতসেঁতে। কোনো ফার্নিচার নেই। তারা দিয়ে গেল একটা পুরোনো দুর্গন্ধযুক্ত কম্বল।
দুপুরে তাদের খাওয়া হয়নি। সন্ধ্যার পর এই বাড়িতে এসেছেন তারা। খাবারের কোনো ব্যবস্থা নেই। রাসেলও না খেয়ে। মমতাজ হকের ছোট্ট বাচ্চাটাও কষ্ট পাচ্ছে। কষ্ট পাচ্ছেন হাসিনা।
খোকা উল্টো দিকের এক আত্মীয়বাড়ি থেকে বাচ্চাদের খাবার জোগাড় করে ফেললেন।
রাত ১২টার দিকে সৈন্যরা মিলিটারি চৌকি আর রুটি-ডাল দিয়ে গেল।
মিলিটারি গাড়ি করে রমা আর আবদুলও এসে গেল বস্তাভরা বাসনকোসন নিয়ে। সেই বাসন বের করে রেহানা সবার হাতে হাতে খাবার তুলে দিতে লাগলেন।
সারাটা দুপুর খাওয়া হয়নি। হাসু আপার নিজের হাতের রান্না ফেলে রেখে তারা চলে এসেছেন। রেহানা বললেন, এই ছিল আমারে রেজেকে। আপার রান্না না খেয়ে এখন মিলিটারি রুটি খেতে হচ্ছে।
ওয়াজেদ মিয়া রুটি ঘেঁড়ার চেষ্টা করতে লাগলেন। খোকা বললেন, ওয়াজেদ মিয়া, তোমাকে কি রুটি ছিঁড়ে দেব?
