তাঁকে কোরআন শরিফ দেওয়া হয়েছে। তিনি কোরআন শরিফ পড়েন। এর বাইরে পড়ার জন্যও তাকে কিছু দেওয়া হয় না। তিনি বই চেয়েছিলেন। কিন্তু তারা বলেছে, বই দেওয়া হবে না। শুধু তিন বেলা প্রহরীরা এসে তাঁকে খাবার দিয়ে যায়। লোহার গেট খোলার শব্দ হয়। খাবারটা রেখে নিঃশব্দে লোকেরা চলে যায়। আবার গেট বন্ধ হওয়ার শব্দ আসে।
একবার এক প্রহরী তাকে জিজ্ঞেস করল, শেখ সাহেব, আপনি বেঁচে আছেন কীভাবে? এইভাবে কেউ বাঁচতে পারে?
শেখ মুজিব বললেন, আমার দেশের মানুষের ভালোবাসা আর দোয়া আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
আর একটা কথা তিনি তখন বলেননি। কিন্তু পরে বলেছিলেন। তখন। ভেবেছিলেন। সেটা হলো : আশা। তিনি স্থিরভাবে জানতেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হতে যাচ্ছে। এত মানুষের এত আত্মদান, এত রক্ত কোনো দিন বৃথা যেতে পারে না। তিনি তখন আবৃত্তি করতেন :
বীরের এ রক্তস্রোত মাতার এ অশ্রুধারা
এর যত মূল্য সে কি ধরার ধুলায় হবে হারা?
স্বর্গ কি হবে না কেন?
বিশ্বের ভান্ডারী শুধিবে না এত ঋণ?
রাত্রির তপস্যা সে কি আনিবে না দিন?
নিদারুণ দুঃখরাতে
মৃত্যুঘাতে
মানুষ চূর্ণিল যবে নিজ মর্তসীমা
তখন দিবে না দেখা দেবতার অমর মহিমা?
৩৭
রেনু স্তম্ভিত। স্তম্ভ নিজেও কখনো এত স্তম্ভিত হয়েছে কি না, কে জানে। তিনি কথা বলছেন না, তিনি একটা আহ শব্দও উচ্চারণ করছেন না। তিনি দাঁড়িয়ে আছেন ৩২ নম্বরের বারান্দায়। সঙ্গে মমিনুল হক খোকা।
খোকার হৃদয়টাকে কেউ যেন ব্লেড দিয়ে চিরে চিরে দিচ্ছে, হৃদয় থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে, চোখ দুটো ফেটে আসতে চাইছে, যেন দুই চোখ বেয়েও এখন রক্তধারা বইবে।
একটু দূরে বারান্দার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছেন পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা সেলের প্রধান মেজর জেনারেল গোলাম উমর। মানিক মিয়ার ছেলে ইত্তেফাক-এর আনোয়ার হোসেন মনজুকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল আর্মিরা, পরে তাকে বাড়িতে ফেরত দেওয়া হয়। রেনু আর খোকা এসেছেন মানিক মিয়ার বাড়িতে, মানিক মিয়ার বিধবা স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে, এসে বিপদে পড়লেন তাঁরা। ঘরে বসে আছে, মমিনুল হক খোকা পরে রেনুকে বুঝিয়ে বলবেন, মেজর জেনারেল উমর। এমন একটা অভাবিত সুযোগ উমরের সামনে।
মেজর জেনারেল উমর রেনুকে প্রস্তাব দিলেন ধানমন্ডিতে একটা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে, যা পাহারা দেবে পাকিস্তানি আর্মি। এর বিকল্প হতে পারে বেগম মুজিবকে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া, কিংবা ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দী করে রাখা। রেনু উপস্থিত বুদ্ধিমতো ধানমন্ডিতে বাসা নিয়ে থাকতে রাজি হলেন, তবে তার শর্ত হলো, বাসা ভাড়া তারা নিজেরা দেবেন, আর পাকিস্তানি সরকারের কোনো রকমের অর্থসাহায্য নেবেন না। ওয়াজেদ মিয়া এখন তার সঙ্গেই থাকেন, তাঁর বেতন এখনো পাওয়া যাচ্ছে, মমিনুল হক খোকাও। খরচাপাতি দিতে পারবেন, কিন্তু রেনু আসল চালাকি করলেন, তা হলো হাসুর আব্বার একটা খোঁজ পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা। তিনি বললেন, ৩২ নম্বরের বাড়িতে হাসুর আব্বার ব্যাংকের চেকবই আছে, সেগুলো আনতে হবে, আর। এরপর শেখ সাহেব যদি আমাদের নামে একটা অথরাইজেশন লেটার পাঠান যে ব্যাংকের টাকা তারা তুলতে পারবেন, তাহলেই হয়ে যাবে। মেজর। জেনারেল উমর এ প্রস্তাবে রাজি হলেন, কারণ শেখ মুজিবের স্ত্রী যদি অন্য অনেক নেতার পরিবারের মতো পালিয়ে ভারতে চলে যান, সেটা পাকিস্তানের। জন্য বড় আঘাত হবে, অন্যদিকে বেগম মুজিবকে যদি জিম্মি হিসেবে নিজেদের পাহারায় রাখা যায়, দরকারের সময় দর-কষাকষিতে ব্যবহার করা যাবে। মুজিবের ওপরে বেগম মুজিবের যে অনেক প্রভাব আছে, সেটা পাকিস্তানের নিরাপত্তা বিভাগ খুব ভালো করেই জানে। মেজর জেনারেল উমর বললেন, ঠিক আছে, এখনই চলুন ৩২ নম্বরের বাড়িতে। মানিক মিয়ার বাড়ি। থেকে ৩২ নম্বরের দূরত্ব খুবই কম, শুধু ৩২ নম্বর সেতুটা পার হলেই তো। সেই বিখ্যাত বাড়িটি।
খোকার গাড়িতে রেনু, পেছনে পেছনে উমরের গাড়ি।
গাড়ি দুটো এসে ৬৭৭ নম্বর বাড়ির সামনে দাঁড়াল। রেনু নামলেন। খোকা নামলেন। উমর তাঁদের পেছনে পেছনে।
বাড়ির দিকে একবার তাকিয়েই রেনুর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। এই কি সেই বাড়ি, যেখানে ২৫ মার্চ বিকেলেও মিছিলের পর মিছিল। এসেছিল। এই কি সেই বাড়ি, যেই বাড়িতে গমগম করত মানুষজন, আত্মীয় পরিজন, কাজের লোক, অকাজের লোক, মেহমান, পরিদর্শক, সাক্ষাৎপ্রার্থীরা। সারা বাড়ির গায়ে গুলির দাগ, গোলার আঘাতের চিহ্ন। বারান্দায় কাঁচের গুঁড়া, ভাঙা কাঁচের টুকরা, প্রতিটা আলমারির কাঁচ ভাঙা, টেবিল-চেয়ার অনেকগুলো নেই, অনেকগুলো ভাঙা, স্টিলের আলমারি ভাঙা, জনগণের দেওয়া সোনার নৌকা, সোনার ৬ দফা কিছুই নেই, এমনকি স্টিলের আলমারির ড্রয়ারে রেনু আর হাসিনার যত সোনার গয়নাগাটি ছিল, সেসবও নেই। রেনু উঁকি দিলেন নিচতলার বইয়ের ঘরে, যে ঘরে শেখ মুজিব বসতেন, পড়তেন, নেতাদের ডেকে নিয়ে মিটিং করতেন সেই ঘরে, সেই ঘরে ছিল রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র, বার্নার্ড শ, বার্ট্রান্ড রাসেল, শেলি, কিটস–সব বই গোলার আঘাতে ছিন্নভিন্ন। দেয়ালের ছবিগুলোতে গুলির চিহ্ন। রবীন্দ্রনাথের ছবি গড়াগড়ি খাচ্ছে মেঝেতে, হাসুর আব্বার ছবি, পারিবারিক ফটোগুলো সব ছিন্নভিন্ন, লন্ডভন্ড।
