এই সেলে মুজিব একা থাকেন। গরমে সেদ্ধ হন। তাকে খাবার দেওয়া হয় খুবই খারাপ, বিছানা-বালিশ দেওয়া হয়েছে অপর্যাপ্ত। তারও চেয়ে বড় কথা, তাঁর সঙ্গে কাউকে কথা বলতে দেওয়া হয় না।
তবে বিকেলে চল্লিশ মিনিটের জন্য তাঁকে সেল থেকে বের হতে দেওয়া হয়। সেলের সামনে চল্লিশ গজের চিলতে একটা পরিসরে তিনি হাঁটেন। এই সময় তিনি আকাশ দেখতে পান। তারপর পাশে তাকাতেই বিশাল বড় দেয়াল তাঁর শ্বাসরোধ করে ফেলতে চায়।
অবশেষে তাকে একটা ফ্যান দেওয়া হয়। সেই ফ্যানটা ছোট্ট ভ্যাপসা গরমে তেতে ওঠা ঘরের উত্তপ্ত বাতাসকে আরও গরম করে তুলতমাত্র।
তাঁর কাছে একবার দেখা করতে আসেন একজন ছোটখাটো মানুষ। বলেন, আমি এখানকার জেলার। আমি আপনার কুশল জানতে এসেছি। আশা করি আপনি ভালো আছেন।
শেখ মুজিব ঠিক করে রেখেছেন, তিনি কারও সঙ্গে কোনো কথা বলবেন না। তিনি চুপ করে থাকেন।
আমরা আপনার মঙ্গল চাই। আপনি নিশ্চয়ই আমাদের প্রশংসা করবেন যে আপনাকে আমরা ফ্যান দিয়েছি।
শেখ মুজিবের মনে হলো, লোকটার গালে তিনি কষে চড় মারেন। কিন্তু তিনি জানেন, তারা তাঁকে ফাঁসি দেবে। কাজেই এখন এমন কোনো কিছু করা উচিত হবে না যাতে তারা কারাগারের মধ্যেই তার ওপরে চড়াও হওয়ার কোনো অজুহাত খুঁজে পায়।
আপনার জন্য আমরা তো তামাকের ব্যবস্থা করেছি।
কথা সত্য। শেখ মুজিবকে পাইপ রাখতে দেওয়া হয়েছে। তামাকও দেওয়া হয়।
আপনার স্বাস্থ্য চমৎকার আছে। বলতে গিয়ে লোকটার চোখ কাঁপে। কারণ সে দেখতেই পাচ্ছে যে শেখ মুজিবের স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে গেছে। ওজন। কমে গেছে।
আপনার জন্য আমরা তো ইমপ্রুভড ডায়েটের ব্যবস্থা করেছি। আপনাকে এখন দুইটার বদলে তিনটা করে রুটি দেওয়া হচ্ছে।
শেখ মুজিব এই বিদ্রূপগুলো গ্রহণ করতে পারছেন না। তাকে খাবারের নামে যা দেওয়া হচ্ছে, তা তার জন্য অখাদ্য। তাঁর স্বাস্থ্য ক্রমাগতভাবে খারাপ হচ্ছে। গরমে তাঁর ফ্লু হয়েছে, তিনি অনেক দিন রোগে ভুগেছেন। এখন এসবও সহ্য হয়ে এসেছে।
আপনি লোকটা তো অকৃতজ্ঞ–আমি আপনার জন্য এত কিছু করলাম, আর আপনি আমাকে একটা ধন্যবাদও দিচ্ছেন না। আপনার জন্য আমরা তো একজন ফালতুও নিয়োগ দিয়েছি। সে আপনার সেবাযত্নও করতে পারবে।
মুজিব কিছু বলছেন না দেখে বিরক্ত হয়ে জেলার উঠে গেলেন। জেলার তাঁর নিজের বুকের মধ্যেই একটা চাপ বেদনা তিনি অনুভব করলেন। কারণ, তিনি আসলে মিথ্যা বলছিলেন। সেল এলাকার বাইরে গিয়ে জেলার তাঁর সঙ্গী প্রহরী ও কর্মকর্তাদের বললেন, আকাশ কি মেঘলা হয়ে গেছে? আজ কি বৃষ্টি হবে?
মুজিব জানেন, তার সেলের মধ্যে ইদানীং একটা লোক দিনের বেলা আসে। সে বলে, সে একটা মেয়েকে অপহরণ করেছিল। সে জন্য তার জেল হয়েছে। নিজের নাম সে বলে আকবর। কিন্তু মুজিব এই জীবনে কম জেল খাটেননি! লোকটার উচ্চতা, চুল কাটার ধরন, আর গোলাকৃতি মুখে লম্বা নাকের নিচের কৃত্রিম হাসিটি বলে দেয় যে সে মিথ্যা বলছে। আসলে পাকিস্তানি মিলিটারি তাকে নিযুক্ত করেছে তার ওপরে নজরদারি করার জন্য।
লোকটা মুজিবের সঙ্গে খাতির দিতে চায়, তাঁর সঙ্গে গল্প করতে চায়। মুজিব কোনো কথা বলেন না।
মুজিব জানেন না দেশে কী হচ্ছে। মুজিব জানেন না তার স্ত্রী-পুত্র-কন্যারা কেউ বেঁচে আছে কি না। ৩২ নম্বরে ২৫ মার্চ রাতে তারা প্রচণ্ড গুলিগালাজ করছিল। তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য গুলিবর্ষণের দরকার ছিল না।
এবার মুজিবের কাছে মিলিটারির লোকজন আসতে শুরু করে। তারা তাঁর কাছ থেকে এমন বিবৃতি বের করার চেষ্টা করে, যা দিয়ে হয় তাঁর ফাঁসি নিশ্চিত করা যাবে, নয়তো যা প্রকাশ করে বাংলাদেশের সংগ্রাম বন্ধ করে দেওয়া যাবে। কিন্তু মুজিব ঠিক করেছেন, তিনি কোনো কথাই বলবেন না। তিনি কোনো প্রশ্নের জবাব দেন না। তিনি জানেন, তিনি যা বলবেন, তা-ই তাঁর বিরুদ্ধে বাংলার মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে। তিনি যদি বলেন, তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করে দিয়েছেন ২৫ মার্চ রাতেই, তাহলে সেটাই তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হবে, তিনি যদি বলেন, তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি, তাহলে সেটার রেকর্ড বারবার করে প্রচার করা হবে। ২৫ মার্চ রাতে তার বাড়িতে যত গোলাগুলি করেছে, পিলখানা আর রাজারবাগে যত গুলি করা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে যত গোলাগুলি করা হয়েছে, যে খবর তার কাছে ফোনের পর ফোনে আসছিল, যার প্রেক্ষাপটে তিনি নির্দেশ দেন যে মেসেজ প্রচার করো, তারপর বাংলার মানুষ নিশ্চয়ই প্রতিরোধ রচনা করেছে। তিনি নির্দেশ দিয়ে এসেছেন, চট্টগ্রামের বাঙালি সৈন্যদের বলো–নট টু সারেন্ডার, মুভ টুওয়ার্ডস কুমিল্লা, তাজউদ্দীন, মণি, তোফায়েল, রাজ্জাক, সিরাজকে কলকাতার অ্যাড্রেস মুখস্থ করানো আছে, কলকাতাতে তার লোক বাড়ি ভাড়া করে কয়েক বছর ধরেই লিয়াজোঁ করছে–বাংলার মানুষ মুক্তির জন্য লড়ছে–এই মুক্তিকামী মানুষের মুক্তিসংগ্রামকে বিভ্রান্ত করানোর জন্য তাঁর একটা কথাই যথেষ্ট–তাই আর্মি ইন্টেলিজেন্স বারবার করে তাঁর কাছে আসছে, মিষ্টি মিষ্টি কথা বলছে, আপনার কোনো দোষ নেই, আপনি বলুন, তাহলে আপনাকে ছেড়ে দেওয়া হবে, সেই সব দুষ্ট লোকের মিষ্টি কথায় ভোলার লোক তো শেখ মুজিব নন।
