তারপর জিজ্ঞেস করলেন, আপনার আব্বার কোনো খোঁজখবর পাওয়া গেল?
করাচি নিয়ে গেছে শুনলাম। এর চেয়ে বেশি কিছু তো জানি না। কামাল বললেন।
হাসনাবাদে ভালো জায়গায় রাখা হলো কামাল আর শহীদকে। রাতের বেলা গোসল করে গরম ভাত খেতে পারলেন।
পরের দিন গাড়ি করে তাদের নামিয়ে দেওয়া হলো বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের ৫৭/৮ বাড়িটির সামনে।
বাংলাদেশ সরকারের কার্যালয়ে। বিএসএফের পাহারা পেরিয়ে নিচতলা থেকে সোজা দোতলায় উঠে গেলেন কামাল। সৈয়দ নজরুল ইসলাম চাচার ঘরে। তিনি ছিলেন না। এরপর গেলেন তাজউদ্দীন চাচার ঘরে।
তাজউদ্দীন গভীর মন দিয়ে একটা কিছু লিখছিলেন। কামালকে দেখামাত্র উঠে এলেন। এত দিনে কামালের মুখে দাড়ি গজিয়েছে, গোঁফও বড় হয়ে গেছে। ফলে চিনতে একটু দেরি হলেও না চেনার কিছু ছিল না। তাজউদ্দীন শেখ কামালকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন। কামাল সাধারণত আবেগ প্রকাশ করেন না। কিন্তু এখন কাদা ছাড়া কীই-বা করার আছে। দুজনে কাঁদলেন অনেকক্ষণ ধরে।
তাজউদ্দীন জিজ্ঞেস করলেন, ভাবি কেমন আছেন? বাড়ির আর সবাই কে কেমন আছে?
কামাল বললেন, আমি তো বাড়ি ছেড়েছি অনেক দিন আগে। একটার পর একটা বাসা বদল করছিলেন মা। কে কোথায় কীভাবে এখন আছে, সেই খবরটা জানি না। ঢাকা ছাড়ার আগে দেখা করে এসেছিলাম। সেও তো অনেক দিন আগের ঘটনা।
মুজিব ভাইকে করাচি নিয়ে গেছে। জানো?
জি শুনেছি।
তুমি এসেছ। খুব ভালো হয়েছে। আমাদের সঙ্গে বসো। তোমাকে আমাদের খুবই প্রয়োজন।
আমি কিন্তু চাচা ট্রেনিং নিয়ে ফ্রন্টে চলে যাব। যুদ্ধ করব। টেবিলে কাজ করব না।
তা করতে চাইলে সেটাও করা যাবে। আগে তোমার থাকার ব্যবস্থা করি।
আমি নজরুল চাচার সঙ্গে একটু দেখা করে আসি।
হ্যাঁ। খুব ভালো হয়! যাও।
তাজউদ্দীন আহমদ একটা গভীর আশ্বাসের স্পর্শ যেন লাভ করলেন। শেখ মণিসহ যুবনেতা ছাত্রনেতারা তাঁর প্রধানমন্ত্রী হওয়া থেকে শুরু করে তাদের সরকার গঠনটাকে মেনে নিতে পারেননি। শেখ কামাল যদি ৮ নম্বর থিয়েটার রোডে বসেন, কিংবা ফ্রিডম ফাইটারের ট্রেনিংও নেন, তাহলে সেটা তাঁদের জন্য একটা বড় সমর্থন ও স্বীকৃতি হিসেবে অন্যদের সামনে দেখা দেবে। শেখ মণি যদিও তার ফুফাতো ভাই, তবু দুজনের চলাফেরা, মেলামেশা এমনকি উচ্চাশাও আলাদা। কামাল খুবই সংস্কৃতিমনা। খেলাপাগল। তিনি চাইলে কালচারাল ফ্রন্টে লড়তে পারেন। ক্রীড়াক্ষেত্রেও করার আছে অনেক কিছু! বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের নিয়ে একটা স্বাধীন বাংলা খেলোয়াড় দল টাইপ কিছু তো তিনি তৈরি করতেই পারেন। সংগঠক হিসেবে তাঁর সুনাম আছে।
কামাল যুদ্ধে যাবেনই। তাকে আপাতত কাজ দেওয়া হলো, প্রধান সেনাপতি আতাউল গনি ওসমানীর এডিসি (এইড-ডে-ক্যাম্প) হিসেবে কাজ করতে হবে।
কামাল আবারও দেখা করলেন তাজউদ্দীনের সঙ্গে, চাচা, আমি কিন্তু ফ্রন্টে গিয়ে হাতে অস্ত্র নিয়ে লড়াই করতে চাই।
তাজউদ্দীন বলেন, বাবা, যুদ্ধ অনেক দীর্ঘস্থায়ী হবে। আমি অবশ্যই তোমার জন্য ভালো ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করে ভালো জায়গায় পোস্টিং দেব। আপাতত তুমি মুজিবনগরে বসো। তোমার উপস্থিতি আমাদের সাহস দেবে, প্রেরণা দেবে। টু স্পিক দ্য ট্রুথ, এইটা একটা এনডোর্সমেন্ট। তুমি দেখো, মুজিব ভাই নাই। রাম যখন ছিলেন না, তখন তাঁর জুতা সিংহাসনে রেখে ভরত রাজ্য পরিচালনা করেন। আমিও বঙ্গবন্ধুর ছবি সামনে রেখে কাজটা করছি। তোমার আমার পাশে থাকাটা কত জরুরি বুঝছ তো! তুমি বুদ্ধিমান ছেলে, তুমি সহজেই বুঝবে।
কামাল কথাটার মানে বুঝলেন। কলকাতা এসে তিনি নানান কথা শুনছেন। মণি ভাই নাকি বলছেন, তাজউদ্দীন বঙ্গবন্ধুকে ধরিয়ে দিয়েছেন। কামাল ভেবে পান না, আব্বা যদি দেশের কথা ভেবে নিজের জীবন উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নিজে না নিতেন, তাহলে কি তাজউদ্দীনের পরামর্শে তিনি টলতেন! এই সিদ্ধান্ত আব্বার নিজের, আব্বা একজনের সঙ্গেই পরামর্শ করেছেন, তা হলো মা। মায়ের এই সব বিষয়ে সিক্সথ সেন্স প্রবল। মা বলেছেন, তুমি কেন পালাবে। সাড়ে সাত কোটি মানুষের নেতা তো ইয়াহিয়া খানের ভয়ে পালিয়ে যেতে পারে না। তোমার মতো নেতা পালিয়ে বেড়াচ্ছে, দেশের বাইরে যাচ্ছে, এটা হতেই পারে না। এটা তোমার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে যায় না। তোমাকে যদি ইয়াহিয়া খান মেরে ফেলে, তাহলেও দেশ স্বাধীন। যদি বাঁচিয়ে রাখে, তাহলেও দেশ স্বাধীন। মায়ের সঙ্গে এর মধ্যে দুবার দেখা হয়েছে, বিলাপের সঙ্গে মা এই সব কথা বলতেন।
৩৬
মিয়ানওয়ালি কারাগার পাঞ্জাবে, রাওয়ালপিন্ডি রোডে, মিয়ানওয়ালি শহর থেকে মাইল পাঁচেক দূরে। ১৯০৪ সাল থেকে এই জেলখানা চালু আছে, ১৭২ একর জমিজুড়ে কৃষিখামার, জেল এরিয়া, আর হাই সিকিউরিটি এরিয়া। মিয়ানওয়ালি এলাকাটাই প্রচণ্ড গরম, এপ্রিল, মে, জুনে এখানে। পিচ গলে যায় রাস্তায়, মাঠ থেকে আগুনের হল্কা ওঠে, ছাদের ওপরে রাস্তায় গরম বাতাস আগুনসমুদ্রের মতো ঢেউ তোলে; দৃশ্য এখানে গরম বাতাসে কাঁপতে থাকে। মগজ-গলানো সেই গ্রীষ্মে শেখ মুজিবকে রাখা হয়েছে একটা ছোট্ট সেলে, জানালা নেই, অনেক উঁচুতে একটা ছোট্ট গবাক্ষ আছে মাত্র। সেই গবাক্ষ দিয়ে আকাশের একটা ক্ষুদ্র অংশ দেখা। যায়।
