কামাল, ২১ থেকে বয়স ২২-এর দিকে যাচ্ছে, এরই মধ্যে গোঁফ হেঁটে ফেলেছেন, চুলে দিয়েছেন কদমছাট, পরনে একটা ফতুয়া, যাতে কিছুতেই তাকে চেনা না যায়। সঙ্গে তোক ঠিক করা আছে, তাঁরা চললেন বর্ডারের উদ্দেশে। সূর্য ওঠার আগেই রওনা দিতে হবে। বেলা এগারোটার মধ্যে যতটুকু পারা যায়, এগিয়ে যেতে হবে। তা না হলে যা রোদ, ভীষণ কষ্ট হবে। প্রথমে যেতে হবে কাশিয়ানী থানা। সেইখানে চাপতাবাজারে বর্ডারের লোক আছে। বাকি পথ সেই লোক গাইড করে নিয়ে যাবেন। খালাতো ভাই শেখ শহীদও ঢাকা থেকে এসেছেন টুঙ্গিপাড়া। দুই ভাই একই সঙ্গে যাবেন ওপারে।
শহীদ বলেন, কামাল হাঁটতে পারবি তো!
কামাল বলেন, আমি যে স্পোর্টসম্যান, সে সম্পর্কে তোমার কোনো ধারণা নাই। আমি ক্রিকেট খেলি, ফুটবল খেলি, বাস্কেটবল খেলি। ইউনিভার্সিটিতে আমি দৌড় প্রতিযোগিতা করে মেডেল পাইছি। তোমার দেখি আমার সম্পর্কে কোনো ধারণাই নাই।
তোকে তো কোনো দিন হাঁটতে দেখি না। সারাক্ষণ তো তুই গাড়িই চালাস।
কামাল বলেন, গাড়ি চালাই বলে হাঁটতে ভুলে গেছি, ব্যাপার তা নয়।
আকাশ ফরসা হতে শুরু করেছে। পাখিরা গাছগাছালিতে প্রাণপণে ডাকছে। লোকজন ঘুম থেকে উঠছে। গরু বের করছে গোয়াল থেকে। মাঠেও যাচ্ছে কৃষকেরা। যত তাড়াতাড়ি যত দূরে চলে যাওয়া যায়, ততই ভালো। না হলে পথে দেখা হলেই লোকে জিজ্ঞেস করে, কোন বাড়ির পোলা? শেখ বাড়ির না?
তারা দ্রুত হাঁটেন। সূর্য উঠছে। সূর্যটাকে পূর্ব দিগন্তে একটা আস্ত ডিম পোচের মতো দেখাচ্ছে। আহা, এই সময় বাজাতে হয় পূরবী রাগ। অদৃশ্য সেতারের তারে আঙুল বোলান কামাল।
এগারোটা পর্যন্ত একটানা হাঁটলেন। সমস্ত শরীর ঘামে ভিজে একাকার। একটা রাস্তার ধারের টিউবওয়েলের মুখে মুখ রেখে পানি পান করলেন পেট ভরে। তারপর বসলেন একটা গ্রাম্য বাজারে। চা খাওয়া দরকার। টোস্ট বিস্কুট পাওয়া গেল বড় বড়। টোস্ট বিস্কুট কিনে ভাঙা কাপের চায়ে ভিজিয়ে ভিজিয়ে খেলেন।
এখানে ঘোড়া ভাড়া পাওয়া যায়। কামাল বললেন, আর কত মাইল আছে। কাশিয়ানী?
আরও ১৫ মাইল।
তাইলে চলো ঘোড়া ভাড়া করি।
পারবি তুই ঘোড়ায় চড়ে চলতি? পড়েটড়ে যাবি না তো!
আরে কী বলো তুমি। দ্যাখো পারি, না না পারি।
কাশিয়ানীর আগে আগে তারা ঘোড়া ছেড়ে দিলেন। রিকশা দেখা যাচ্ছে। তাঁরা রিকশা ভাড়া করলেন। কাশিয়ানী বিপজ্জনক জায়গা। ওয়্যারলেস পোস্ট আছে। পাকিস্তানি মিলিটারির জন্য এইটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্থান। মিলিটারি থাকতে পারে।
ওড়াকান্দি গ্রামের ঠাকুরবাড়িতে উঠলেন তাঁরা। ততক্ষণে সূর্য হেলে পড়েছে। পেটও খিদেয় চো চো করছে। রাস্তায় কলা কিনে খেয়েছেন, একটা বাজারে থেমে খেয়েছেন গুড়ের জিলাপিও। কিন্তু ভালোমতো সকালের নাশতা, দুপুরের খাবার তো আর খাওয়া হয়নি।
পুকুরের পানিতে গোসল সেরে নিয়ে টিনে ছাওয়া বারান্দায় পাতা সেগুন কাঠের হাই বেঞ্চি লো বেঞ্চিতে যখন তাদের কাঁসার থালায় ভাপ ওঠা গরম ভাত দেওয়া হলো, সঙ্গে শুরুতেই সেদ্ধ ডিমের ভর্তা, তখন কামালের জিবে পানি চলে এল। যেন কত দিন তিনি খাননি।
বাড়ির লোকেরা কামাল আর শহীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল সবুজ লুঙ্গি পরা এক লোকের সঙ্গে–এই যে আরশাদ আলী, ইনিই আপনাদের নিয়ে যাবেন বর্ডার পর্যন্ত।
রাতের বেলা বাড়ির লোকজনের সঙ্গে গল্প করতে করতে তার ব্যাগ থেকে ছোট্ট ট্রানজিস্টর রেডিও বের করে বিবিসির খবর ধরলেন কামাল। তারা। আকাশবাণী শুনলেন। তারপর প্রচণ্ড ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়লেন পাটের স্তূপের পাশে একটা বড় পালঙ্কে। পাশে শহীদের নাক শঙ্খের মতো ডাকছে।
আরশাদ আলীকে নিয়ে কামাল আর শহীদ বেরিয়ে পড়লেন পরদিন খুব ভোরবেলা। সকালের নাশতার চেয়ে রোদ ওঠার আগে অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছানো জরুরি। অন্ধকারের মধ্যেই তারা হাঁটতে শুরু করলেন। গাজীর হাট হয়ে দৌলত শরাফপুর পাইকগাছা হয়ে কাটাখালী। সেখানে এসে তাদের আটকালেন একজন ষন্ডামার্কা লোক। তার হাতে বন্দুক। সঙ্গে আরও লোকজন।
কে উনি?
মকবুল চেয়ারম্যান।
কোন মার্কা?
মুসলিম লীগ। হারিকেনের সাপোর্টার।
মুসলিম লীগের এই স্বঘোষিত রাজাকাররা আটকে ফেলল এই তিনজনকে। তোমরা কারা?
আরশাদ আলী বললেন, যা বলার আমিই বলবনে। আপনারা চুপ কইরে থাকেন।
আরশাদ আলী বললেন, আমরা সাতক্ষীরার মানুষ। গোপালগঞ্জ এসেছিলাম। এখন আবার সাতক্ষীরা যেতে চাচ্ছি।
কেন, যেতে চাচ্ছ কেন?
এইখেনে আর কত দিন থাকপ? যেতে হবি না নে! চেয়ারম্যান সাব, দু কুড়ি টাকা আছে। নিয়ে নেন। আমাদের ছেড়ে দেন দিকিনি।
ছয় কুড়ি টাকা নিয়ে মকবুল চেয়ারম্যান ছেড়ে দিলেন ওদের। নৌকা নিয়ে তারা আবারও চলতে শুরু করলেন।
বহু পথ হেঁটে রিকশায়, ঘোড়ার গাড়িতে, নৌকায়, মোষের গাড়িতে চড়ে শেষতক কালীগঞ্জের পাইকাড়া গ্রামের ঠাণ্ডাই গাজীর বাড়িতে এসে উঠলেন তারা। তত দিনে শেখ কামালের শরীরটা খুবই খারাপ হয়ে পড়েছে। বারবার বমি করছেন। এই বাড়িতে থাকলেন কদিন। শরীরটা একটু শক্তপোক্ত হলো। এরাও খুব যত্ন করলেন। শেখ সাহেবের ছেলে শুনে তারা বন্দুক নিয়ে তিন ভাই পালা করে বাড়ি পাহারা দিতেন।
তারপর একদিন বিকেলবেলা রওনা হলেন তারা। প্রথমে দেবহাটা থানার নংলা গ্রামে আশ্রয় নিলেন। সেখান থেকে ছুটিরপুর দিনে দিনে। রাতের অন্ধকারে সীমানা পেরিয়ে বর্ডারের ওপারে চলে গেলেন। পশ্চিম বাংলার হাসনাবাদে তখন সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন এম নুরুল হুদা। তিনি শেখ সাহেবের ছেলেকে কাছে পেয়ে আবেগে জড়িয়ে ধরলেন।
