১৬ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী আখাউড়া আক্রমণ করতে এলে যুদ্ধ শুরু হয়। একটা পুকুরপাড়ে সর্বডানে ট্রেঞ্চ খুঁড়ে মোস্তফা কামাল এলএমজি নিয়ে প্রতিরোধ করতে প্রস্তুত। ১৭ এপ্রিল ব্যাপক গোলাগুলি হয়।
১৮ এপ্রিল প্রচণ্ড বৃষ্টি। পাকিস্তানি সৈন্যদের গোলাগুলিও থেমে গেছে। তবে কি তারা ফিরে গেছে ব্যর্থতা স্বীকার করে নিয়ে।
কিন্তু না। একটু পরে শুরু হয় প্রচণ্ড আক্রমণ। দুই দিক থেকে আক্রমণ আসছে। মোগড়াপাড়া, গঙ্গাসাগরের দিক থেকে। দরুইন গ্রামের এই ডিফেন্স পোস্টে ১০ জনের প্লাটুনের কমান্ডার মোস্তফা। মেজর শাফায়াত জামিল তাকে ল্যান্স নায়েকের ব্যাজ পরিয়ে দিয়েছিলেন, সেটা পরেই তিনি এখন যুদ্ধরত।
দুই দিক থেকে আসা একযোগে আক্রমণে মুক্তিযোদ্ধারা চাপে পড়ে গেছে। তাদের পিছিয়ে যেতে হবে। পেছানোর জন্যও কভার দিতে হবে।
মোস্তফা বললেন, আমি এলএমজি চালাচ্ছি। তোমরা সরে যাও।
এলএমজির নল প্রচণ্ড গরম। গুলি বের হওয়ার সময় মাটি পর্যন্ত কেঁপে ওঠে। পাকিস্তানি বাহিনী এগোচ্ছে সার বেঁধে। তাদের অনেকের হাতেই এলএমজি। এমনকি মর্টার থেকে গোলাবর্ষণ করছে তারা।
মোস্তফা তাঁর কাজ জানেন। কিছুক্ষণ ঠেকিয়ে রাখতে হবে শত্রুদের। তারপর তিনিও পিছিয়ে যাবেন।
ঠিক এ সময়ে তার মনে পড়তে লাগল তাঁর বাবার মুখ। বাবা ছিলেন বীর। তিনটা মেডেল পেয়েছেন বিশ্বযুদ্ধের সময়। মনে পড়ে মায়ের মুখ। মা বলছিলেন, বাবা, আবার কবে আসবা? সাইক্লোনে সব ভাসায়া নিয়া গেছে, তবু আমরা তো বাঁচিয়া আছি।
ভোলা থেকে আসার পর চিঠি এসেছে বাবার। বাবা মোহাম্মদ মোস্তফা। তোমার স্ত্রী গর্ভবতী। একবার আসিয়া দেখিয়া যাইয়ো।
মোস্তফা ভাবলেন, আমার বাবা ছিলেন সৈনিক। আমিও হয়েছি সৈনিক। আমার ছেলেও সৈনিক হবে। তবে সে হবে স্বাধীন দেশের সৈনিক।
ছেলের নাম কী রাখা হবে?
আমি ছেলেকে দেখতে যাব। তবে যখন যাব, তখন এই দেশ শত্রুমুক্ত। স্বাধীন বাংলাদেশ।
মোস্তফা গুলি চালাচ্ছেন তিন দিকে। একবার দক্ষিণে, একবার পশ্চিমে, একবার উত্তরে।
একজন সহযোদ্ধা বললেন, মোস্তফা চইলা আহো।
মোস্তফা বললেন, তোমরা তাড়াতাড়ি যাও। আমি আসতেছি।
গুলি শেষ হয়ে এসেছে। আর থাকার মানে হয় না। বাংকার থেকে বেরোতে যাবেন, অমনি একটা গুলি এসে লাগল তার কাঁধে। উড়ে গেল কাঁধ। পড়ে গেলেন তিনি। বাংলার মাটিতে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে মাটি। বৃষ্টিতে রক্ত ধুয়ে যাচ্ছে। এই পানি কি মিশে যাবে মেঘনার স্রোতে?
পাকিস্তানি মিলিটারি চলে এসেছে এই এলএমজি পোস্টে। দেখল, একটা বাঙালি সৈন্য তখনো নড়ছে। এ তো বেঁচে আছে। বেয়নেট চালাল তারা।
মুক্তিযোদ্ধারা ফিরে গেছে তাদের ক্যাম্পে।
পড়ে রইল মোস্তফার নিস্পন্দ শরীর। গুলিবিদ্ধ, বেয়নেট-চেরা।
পরে সৈন্যরা চলে গেলে দরুইন গ্রামের চাষা আর শ্রমিকেরা আসে সেখানে। মোস্তফা কামালকে সমাহিত করে সেই জায়গাতেই।
বড় ছেলে মোস্তফার মৃত্যুসংবাদ ভোলার সেই টিনে ছাওয়া বেড়ার ঘরের বাড়িতে কবে এসে পৌঁছায়, তার মা মালেকা বেগম কবে ডুকরে কেঁদে ওঠেন, আর কবে পেটের ভেতরে সন্তান নিয়ে পেয়ারা নির্বাক হয়ে ঘরের খুঁটি ধরে দাঁড়ান, কে তার খোঁজ রাখে!
জুলাই মাসে পেয়ারা বেগমের সন্তান ভূমিষ্ঠ হলো। ছেলে। ছেলের নাম রাখা হলো মোশাররফ হোসেন। দাদা হাবিলদার হাবিব তাঁকে ডাকেন বাচ্চু বলে। তা থেকেই ছেলের নাম হয়ে গেল মোশাররফ হোসেন বাচ্চু।
.
ব্যাঙ্গমা বলবে, মো. মোস্তফাকে স্বাধীনতার পর বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব দেওয়া হইল। নামের লগে যুক্ত কইরা দেওয়া হইল কামাল। বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল।
৩৫
ফজরের আজান হচ্ছে টুঙ্গিপাড়া মসজিদে। আকাশ তখনো অন্ধকার। মোরগ ডেকে উঠছে শেখ বাড়ির মুরগির খুপরিগুলোতে। সারা রাত ভ্যাপসা গরমের পর ভোরবেলাটা একটু ঠান্ডা।
শেখ কামাল ঘুম থেকে উঠে পড়েছেন। নিজের ছোট্ট ব্যাগটা রেডি করে নিয়ে তিনি গেলেন দাদা-দাদির ঘরে।
শেখ কামাল শুনেছেন তাজউদ্দীনের বেতার ভাষণ। আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে সেই ভাষণ পুনঃপ্রচারিত হচ্ছে। বলা হচ্ছে, এক গোপন বেতারকেন্দ্র থেকে এই ভাষণ প্রচার করা হয়েছিল। সেটার রেকর্ড এখন। প্রচার করা হচ্ছে। শেখ কামালের রক্তের ভেতর যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, বর্ডার পার হতে হবে। আকাশবাণী, বিবিসি শুনে বুঝতে পারলেন, যুদ্ধের সন্ধানে যেতে হবে ওপারে।
দাদা বারান্দায় এসেছেন। অজু করবেন। বাড়ির দেখভাল করেন আরশাদ মামু, তিনি কাসার বদনায় পানি এনে দিয়েছেন।
কামাল দাদা লুত্যর রহমানকে কদমবুসি করলেন। দাদিও বেরিয়ে এসেছেন বারান্দায়। তিনিও অজু করবেন। কামাল দাদিকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, দোয়া করেন। আমি যাচ্ছি।
কই যাও? দাদা বললেন।
কামাল বললেন, যুদ্ধ করতে যাই।
দাদা বললেন, দ্যাখো। তোমার আব্বা মানুষের জন্য দেশের জন্য সংগ্রাম করতে গেছে, আমি কোনো দিনও বাধা দেই নাই। তুমি আজকে দেশের জন্য সংগ্রাম করতে যেতে চাচ্ছ, তোমাকেও আমি বাধা দেব না।
কামাল বললেন, দোয়া করেন।
দাদা বললেন, দোয়া করি। ভালো থাকো। সুস্থ থাকো। নিরাপদ থাকো।
কামাল বললেন, আপনারাও ভালো থাকবেন।
দাদা বললেন, এইখানে থাকা আসলে নিরাপদ না। এইটা শেখ মজিবরের বাড়ি। এইখানেও মিলিটারি আসবে। তুমি যাও। সেইটাই ভালো। আমি বৃদ্ধ মানুষ। আমার সাথে তো কারও শত্রুতা নাই। আমি থাকি।
