সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী বাংলাদেশের জনগণ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতি যে ম্যান্ডেট দিয়েছেন সে ম্যান্ডেট মোতাবেক আমরা, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা, আমাদের সমবায়ে গণপরিষদ গঠন করে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র ঘোষণা করছি।
এবং এর দ্বারা পূর্বাহ্নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা অনুমোদন করছি…
ইউসুফ আলী শপথ করালেন। উপরাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রীরা শপথ নিলেন। সৈয়দ নজরুল ভাষণ দিলেন, তাজউদ্দীন বক্তৃতা করলেন।
দেশি-বিদেশি সাংবাদিকেরা ছবি তুলল, চলচ্চিত্র ধারণ করল, এলাকার মানুষের কথা রেকর্ড করে নিল। হাজারও মানুষ চেয়ারে বসে, চারদিকে দাঁড়িয়ে থেকে, আমগাছের ডালে উঠে বসে এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটাকে প্রত্যক্ষ করল।
এরই মধ্যে মেজর ওসমানের ইপিআর দল চলে এসেছে। তারাও একবার মার্চপাস্ট করে সালাম জানালেন নতুন সরকারের নেতৃবৃন্দকে।
অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের কাছে গেলেন নেতারা। তাজউদ্দীন সাংবাদিকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন উপরাষ্ট্রপতি আর মন্ত্রীদের। এক সাংবাদিক জিজ্ঞেস করলেন, জায়গার নাম কী?
তাজউদ্দীন বললেন, মুজিবনগর।
সাংবাদিকদের গাড়িতে তুলে আবার কলকাতার উদ্দেশে রওনা করিয়ে দেওয়া হলো।
নেতারা আরও খানিকক্ষণ থাকলেন। এলাকাবাসী মুড়ি, চিড়া, পানি, ভাত-রুটি যে যেভাবে পারে, এনে নেতাদের খাওয়াতে লাগলেন। তারা নেতাদের জড়িয়ে ধরলেন, পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলেন, আর কাঁদতে লাগলেন।
তাঁদের চোখের পানি নেতাদের চোখের পানির সঙ্গে মিশে পড়তে লাগল বৈদ্যনাথতলার মাটিতে।
তাজউদ্দীনরা গাড়িতে উঠছেন। তৌফিক, মাহবুব, ওসমান তাঁদের বিদায় জানাচ্ছেন। তৌফিক বললেন, স্যার, আপনাদের অসংখ্য ধন্যবাদ আপনারা আমাদের ইতিহাসের সাক্ষী হওয়ার সুযোগ দিলেন।
তাজউদ্দীন বললেন, তোমরা ইতিহাসের সাক্ষী নও। তোমরা ইতিহাসের নির্মাতা।
.
একে একে নেতারা গাড়িতে উঠে কলকাতার দিকে চলে গেলেন।
মাহবুব, তৌফিক, এলাকার মুক্তিযোদ্ধারা, এলাকাবাসী রয়ে গেলেন। তাদের সামনে অনেক কাজ। যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধ চলবে। তারা পাকিস্তানি বাহিনীকে কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা এলাকা থেকে বিতাড়িত করবেনই।
৩৪
বাংকারে এলএমজি পোস্টে মোস্তফা। ২২ বছরের সুঠাম যুবক। ৮০০ গুলি আছে। তিনি চালাতে থাকবেন গুলি। ততক্ষণে তার সঙ্গীরা নিরাপদে সরে যেতে পারবে।
কুমিল্লা, আখাউড়া রেললাইনের ধারে অবস্থান নিয়েছেন তারা। প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে সকাল থেকেই।
১৮ এপ্রিল ১৯৭১।
মোহাম্মদ মোস্তফা জাত সৈনিক। পাকিস্তানের চেয়ে এক বছরের ছোট। ১৯৪৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর জন্ম। ভোলার দৌলতখানের হাজীপুর গ্রামে জন্ম তার। তার বাবাও ছিলেন মিলিটারি। সবাই তাঁদের বাড়িটাকে বলত, হাবিব মিলিটারির বাড়ি। বাবার মতো মোস্তফাও মিলিটারি হতে চেয়েছেন ছোটবেলা থেকেই। হাবিলদার বাবার সঙ্গে বালক মোস্তফা কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টেও থেকেছেন। তাঁরা ছিল দুই ভাই, তিন বোন। মোস্তফাই বড়। বাবার গল্প তাঁকে গর্বিত করে। বাবা ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ করেছেন। সেই সময়ই গ্রামে এসে মালেকা বেগমকে বিয়ে করেন। বিয়ের পরপরই চলে যান যুদ্ধক্ষেত্রে। বাবার সঙ্গে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে থাকার সময় বালক ছোট্ট মোস্তফা দেখেছেন। কুচকাওয়াজ। বিশেষ করে ব্যান্ডদল যখন বাদ্য বাজাত, আর সৈন্যরা মার্চপাস্ট করত, খুব ভালো লাগত মোস্তফার। ১৯৬৬ সালে মোস্তফার বিয়ে হলো ভোলার গ্রামে, স্ত্রী পেয়ারা বেগম। কিন্তু বিয়ের পরই ছেলে নিখোঁজ। মোস্তফা ফিরেছিলেন ১৯৬৮ সালে, জানিয়েছিলেন, আর্মিতে জয়েন করেছেন।
এলএমজির ট্রিগারে হাত রেখে গুলি চালাতে চালাতে মোস্তফার মনে পড়ছে তার স্ত্রী পেয়ারা বেগমের কথা। বউটা পোয়াতি। তাঁকে বাড়ি রেখে তিনি বাড়ি ছেড়েছেন ১৯৭০-এর ঘূর্ণিঝড়ের পর। তারপর তো দেশেই ঘূর্ণিঝড় লেগে গেল। নির্বাচন হলো। আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল। মার্চ মাস ধরে অসহযোগ।
৪র্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে চাকরি তার। মেজর শাফায়াত জামিলের সঙ্গে তাঁরা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছিলেন মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে। খবর আসছে, পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালি সৈন্যদের ওপরে আক্রমণ করবে। মেজর খালেদ মোশাররফকে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে পাঠানো হয়, সেখান থেকে আলফা কোম্পানিসহ তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় শমসেরনগরের দিকে। শমসেরনগরে মেজর শাফায়াত জামিল আর মেজর খালেদ মোশাররফ বৈঠক করলেন। যুদ্ধ আসন্ন। তাঁরা বিদ্রোহ করবেন।
.
২৫ মার্চের পর কুমিল্লায় পাকিস্তানি সৈন্যরা আক্রমণ করে ঘুমন্ত বাঙালি সৈন্যদের হত্যা করে। আর শমসেরনগর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকায় বিদ্রোহ ঘোষণা করেন খালেদ মোশাররফ আর শাফায়াত জামিল। এপ্রিলের শুরুতে চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সব কোম্পানি একত্র হয়। মেঘনার পশ্চিমে তারা শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যুহ গড়ে তোলে। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনী বিপুল শক্তি সংগ্রহ করে হেলিকপ্টার, যুদ্ধবিমান, গানশিপসহ এমন আক্রমণ করে যে পিছিয়ে যাওয়া ছাড়া মুক্তিবাহিনীর কোনো উপায় থাকে না। এরপর তারা আখাউড়াতে তাদের ডিফেন্স লাইন গড়ে তোলে।
