এই সময় সেন্টু, পিন্টু, আসাদুল, মনসুর হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইতে শুরু করলেন :
আমার সোনার বাংলা,
আমি তোমায় ভালোবাসি
চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস আমার প্রাণে
ও মা আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি…
গান গাইছেন তারা সমস্ত দরদ ঢেলে দিয়ে।
.
ব্যাঙ্গমা বলবে, এত সুন্দর কইরা এত মায়া দিয়া আমার সোনার বাংলা আর কেউ কখনো গাইছে কি না আমগো জানা নাই।
ব্যাঙ্গমি বলবে, হ। তুমি ঠিকই কইছ।
.
জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হচ্ছে।
মঞ্চে সবার চোখ ভিজে আসছে। দর্শকসারিতে বসা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ, পুলিশ ইপিআর সৈনিক আমলা যারা কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, নড়াইল থেকে এসে পৌঁছাতে পেরেছেন, উপস্থিত গ্রামবাসী–সবার চোখ দিয়ে জল ঝরতে লাগল। পুরো এলাকার পরিবেশ মুহূর্তে গেল পাল্টে। পরে গোলোক মজুমদার রুস্তমজিকে রিপোের্ট করবেন, যখন আমার সোনার বাংলা গানটা হচ্ছিল, পুরো সভার দশ হাজার মানুষ যেন বিদ্যুতায়িত হলো। ইলেকট্রিফায়েড। ও মা ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে–গাইতে গাইতে সবাই কাঁদছেন, সৈয়দ নজরুল কাঁদছেন, তাজউদ্দীন কাঁদছেন, কামারুজ্জামান কাঁদছেন, ক্যাপ্টেন মনসুর কাঁদছেন, ওসমানী কাঁদছেন, মিজান চৌধুরী কাঁদছেন, মান্নান কাঁদছেন, শেখ মণি, রাজ্জাক, আ স ম আবদুর রব, তোফায়েল, সিরাজুল আলম খান, শাজাহান সিরাজ, উপস্থিত এমপিএরা, এমএনএরা, আমীর, উপস্থিত সরকারি কর্মকর্তারা, মাহবুব, তৌফিক, নুরুল কাদের, উপস্থিত মেজররা, কর্নেলরা, পুলিশ, আনসার, ইপিআর, মুজাহিদ–সবাই দরদর করে কাঁদছেন। কাঁদছে সমবেত হাজার হাজার লুঙ্গি পরা, গেঞ্জি পরা, পাঞ্জাবি পরা, শার্ট পরা, খালি গা, খালি পা, স্যান্ডেল পা গ্রামবাসী। এমনকি সেই আমের বাগানে গাছে। গাছে পাখিরাও যেন নিজেদের গান ভুলে কণ্ঠ মেলাতে লাগল ওই আমার সোনার বাংলার সঙ্গে। যখন শিল্পীরা গাইছেন, মা তোর বদনখানি মলিন হলে আমি নয়নজলে ভাসি…তখন কুড়ি হাজার চোখ অশ্রুর প্লাবনে ভেসে যেতে লাগল! সাদা বিদেশি সাংবাদিকেরা কলকাতার বাঙালি সাংবাদিককে জিজ্ঞেস করলেন, সবাই কাঁদছে কেন? কলকাতার বাঙালি সাংবাদিক বললেন, ওরা ওদের জাতীয় সংগীত গাইছে। জাতীয় সংগীত গাইবার সময় কাঁদতে হবে। কেন? এটা তুমি বুঝবে না। এটা কেবল বাঙালিরাই বুঝতে পারে। বলে কলকাতার সাংবাদিক নিজেই চোখ মুছতে লাগলেন।
মাহবুব লেফট-রাইট করে এলেন মঞ্চের সামনে। স্যার, প্যারেড পরিদর্শনের জন্য দল প্রস্তুত স্যার।
সৈয়দ নজরুল আর কর্নেল ওসমানী তাঁর সঙ্গে চললেন। প্যারেড পরিদর্শন করলেন। ওসমানীর পরনে নতুন পোশাক। গতকাল নিউমার্কেট থেকে কাপড় কিনে দরজিকে দিয়ে বানানো হয়েছে। নতুন পোশাকে তাঁকে বেশ প্রত্যয়ী মনে হচ্ছে।
প্যারেড পরিদর্শন শেষে সৈয়দ নজরুল মঞ্চে গিয়ে দাঁড়ালেন। মার্চপাস্ট করে তাদের সালাম জানিয়ে পুলিশ-আনসারের দলটা অনুষ্ঠান চত্বরের প্রান্তে গেল। মাহবুব ঘোষণা দিলেন : হল্ট। ডিসমিস…আনসার-পুলিশরা জনতার সঙ্গে মিশে গেলেন।
কোরআন শরিফ থেকে পাঠ হলো। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করলেন অধ্যাপক ইউসুফ আলী :
মুজিবনগর, বাংলাদেশ
তারিখ : ১০ এপ্রিল ১৯৭১
যেহেতু ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭১ সালের ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে শাসনতন্ত্র রচনার উদ্দেশ্যে প্রতিনিধি নির্বাচিত করা হয়েছিল; এবং
যেহেতু এই নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ ১৬৯টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগদলীয় ১৬৭ জন প্রতিনিধি নির্বাচিত করেছিল; এবং
যেহেতু জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ তারিখে শাসনতন্ত্র রচনার উদ্দেশ্যে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধিবেশন আহ্বান করেন; এবং
যেহেতু তিনি আহূত এই অধিবেশন স্বেচ্ছাচার এবং বেআইনিভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেন; এবং
যেহেতু পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ তাদের প্রতিশ্রুতি পালন করার পরিবর্তে বাংলাদেশের জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে পারস্পরিক আলোচনাকালে ন্যায়নীতিবহির্ভূত এবং বিশ্বাসঘাতকতামূলক যুদ্ধ ঘোষণা করেন; এবং
যেহেতু উল্লিখিত বিশ্বাসঘাতকতামূলক কাজের জন্য উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জনের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং বাংলাদেশের অখণ্ডতা ও মর্যাদা রক্ষার জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান; এবং
যেহেতু পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ বর্বর ও নৃশংস যুদ্ধ পরিচালনা করেছে। এবং এখনো বাংলাদেশের বেসামরিক ও নিরস্ত্র জনগণের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন গণহত্যা ও নির্যাতন চালাচ্ছে; এবং
যেহেতু পাকিস্তান সরকার অন্যায় যুদ্ধ ও গণহত্যা এবং নানাবিধ নৃশংস অত্যাচার পরিচালনা দ্বারা বাংলাদেশের গণপ্রতিনিধিদের পক্ষে একত্রিত হয়ে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব করে তুলেছে; এবং
যেহেতু বাংলাদেশের জনগণ তাদের বীরত্ব, সাহসিকতা ও বিপ্লবী কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশের উপর তাদের কার্যকর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে;
