সকাল ছয়টার মধ্যে ভারতীয় সাংবাদিক, পশ্চিমা সাংবাদিক, ক্যামেরাম্যান দিয়ে ভরে গেল কলকাতা প্রেসক্লাব। সবাইকে নিয়ে ঠিক সময়ে গাড়ি ছেড়ে দিল। বাংলাদেশের নেতারাও যথাসময়ে উঠে গেলেন গাড়িতে। মোটামুটি ৫০টার মতো অ্যাম্বাসেডর গাড়ি এসে আমবাগানের বিভিন্ন জায়গায় গাছের আড়ালে দাঁড়াল। কলকাতা থেকে বৈদ্যনাথতলা পর্যন্ত আসতে তাদের লাগল প্রায় চার ঘণ্টা।
সবার মধ্যে একটু ব্যস্তসমস্ত ভাব। শুধু অবিচল ভঙ্গি দেখা যাচ্ছে সৈয়দ নজরুল ইসলাম আর তাজউদ্দীনের। কামারুজ্জামান সাহেব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। কাজেই তিনি খানিকটা তৎপর হলেন। ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে সাদা পাঞ্জাবি, ঢোলা পায়জামা, কালো চশমায় আরও লম্বা দেখা যাচ্ছে।
কলকাতা সিনহা রোডে সৈয়দ নজরুল গাড়িতে ওঠার আগে টাঙ্গাইলের আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল মান্নানকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, মান্নান, চিরুনি নিয়েছ?
হ্যাঁ। মান্নান জানালেন। সৈয়দ নজরুল আবারও বললেন, চিরুনি নিয়েছ? হ্যাঁ। তিনবার তিনি এক প্রশ্ন করলেন। তখন পাশের আরেক নেতা বলে উঠলেন, লিডার, আপনি চিরুনি দিয়ে কী করবেন? আপনার মাথাতে চুলই নাই।
না, কে বলল নাই। সামনে না থাকলেও পাশে তো আছে।
সব নেতা এসেছেন সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে। খন্দকার মোশতাক এসেছেন লম্বা কোট-প্যান্ট-টুপি পরে। এম এ জি ওসমানী এখানে আসবেন। কিন্তু তার পরার মতো ইউনিফর্ম নেই। তার জন্য আগের রাতে ড্রেস বানানো হয়েছে। কারণ বিএসএফ যা দিচ্ছিল, সবই তাঁর পরনে বড় আর ঢোলা হচ্ছিল।
নেতারা এসে গাড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের গায়ে ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে স্বাগত জানাল জনতা। তাঁরা সভাস্থলের পাশে পুলিশ ফাঁড়ির কাছাকাছি চেয়ার নিয়ে বসলেন।
শেখ ফজলুল হক মণি, তোফায়েল আহমেদ, সিরাজুল আলম খান। এসেছেন। তারা ঘুরে ঘুরে ব্যবস্থা দেখতে লাগলেন। অনেক কাঠের চেয়ার। কোনো চেয়ার ভাঙা। বেঞ্চি। দুটো মঞ্চ। একটা বড়। আরেকটা ছোট্ট ফ্ল্যাগস্ট্যান্ড। দড়ি দিয়ে সভামঞ্চের সামনের দিকটা ঘেরাও করে রাখা হয়েছে। মানুষ এসে ভরে যাচ্ছে পুরো আমতলা।
তাজউদ্দীন বললেন, তৌফিক সাহেব, কোরআন শরিফ তিলাওয়াত করতে পারবেন কে, ঠিক হলো?
জি স্যার। বাকের আলী, এদিকে এসো।
কলেজছাত্র বাকের আলী এগিয়ে এল (পরে তিনি স্থানীয় কলেজের অধ্যাপক হবেন)। তার স্কুলশিক্ষক দোয়াজ উদ্দীন জানতেন, স্কুলের অ্যাসেম্বলিতে বাকের আলী কোরআন শরিফ তিলাওয়াত করত। দোয়াজ উদ্দীনরা দুই দিন ধরে আম্রকাননের সভাস্থলে বড় খাটছেন।
তাজউদ্দীন বললেন, তোমার নাম কী ভাই?
বাকের আলী।
কী করো?
কলেজে পড়ি।
কোন আয়াতটা পড়বা, একটু শোনাব।
বাকের আলী টুপি মাথায় দিয়ে তিলাওয়াত করল। তাজউদ্দীন হাফেজে কোরআন। তিনি বললেন, ঠিক আছে। এইটাই কোরো।
নেতারা আগে এসেছেন। একটু পরে এসেছেন কলকাতা প্রেসক্লাব থেকে গাড়িতে ওঠা সাংবাদিকেরা।
ব্যারিস্টার আমীর সাংবাদিকদের সামলাচ্ছেন।
তাজউদ্দীন আহমদ সব চেক করে নিলেন। নির্বাচিত এমপিএ, এমএনএরা এসেছেন। গুরুত্বপূর্ণ নেতারা এসেছেন। আবদুল মান্নান অনুষ্ঠান পরিচালনা করবেন। এসেছেন। অধ্যাপক ইউসুফ আলী চিফ হুইপ। তিনি শপথ পরিচালনা করবেন। এসেছেন। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। পাশে বসে আছেন। ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, কামারুজ্জামান, মোশতাক আহমদ। আছেন। মুক্তিবাহিনীর প্রধান এম এ জি ওসমানী। আছেন। তৌফিক, শুরু করে দিন। যত তাড়াতাড়ি শুরু করা যায়, ততই মঙ্গল।
তৌফিকও সেটা জানেন। আক্রমণের শঙ্কা সব সময়ই আছে। পাকিস্তানি মিলিটারি টের পেয়ে গেলে প্লেন নিয়ে মাথার ওপরে একটা চক্কর তো দিতেই পারে। আবার সড়কপথেও তারা আক্রমণ করে বসতে পারে। তাড়াতাড়ি করতে হবে। মাহবুব, চল, শুরু কর।
মাহবুব আরেকবার পথের দিকে তাকালেন। ওসমান সাহেবের বিশাল বাহিনী কি এসে পৌঁছাবে না? গার্ড অব অনার তাকেই দিতে হবে?
না। আর সময় নেওয়া ঠিক হবে না।
১১ জন পুলিশ দুই সারিতে দাঁড়ালেন। সামনে একজন তাদের নেতা। আনসার ইয়াদ আলী। তার কাঁধে লেখা আনসার। মুখে দাড়ি।
.
সৈয়দ নজরুল, তাজউদ্দীন আহমদ, কামারুজ্জামান, ক্যাপ্টেন মনসুর, মোশতাক, কর্নেল ওসমানী মঞ্চে এসে দাঁড়ালেন। মঞ্চের পাটাতনে মিশনারি গির্জা থেকে আনা কার্পেট। নিচে চকি। তার নিচে বাংলার মাটি।
হাজার হাজার আমগাছ। আগের দিন বৃষ্টি হওয়ায় আকাশ পরিষ্কার। বৈশাখের এই মধ্যদুপুর আলোয় আলোয় ঝকঝক করছে। বৃষ্টিধোয়া আমপাতাগুলো কী যে সবুজ। আবার অনেক গাছে ছোট ছোট আম ঝুলে আছে। সভাস্থলে অনেকগুলো বড় শিরীষগাছ, সেগুনগাছও আছে। বৃষ্টির পানি কোথাও কোথাও জমে আছে, তাতে আকাশ-আলো-সবুজ পাতার প্রতিবিম্ব পড়ে সামান্য বাতাসে একটু একটু করে দুলছে।
মাহবুব চলে গেলেন তাঁর ১২ জনের গার্ড অব অনার দলের কাছে। ইয়াদ আলী পেছনে গেলেন। মাহবুব সামনে দাঁড়িয়ে কমান্ড করলেন, অ্যাটেনশন।
পুলিশ সদস্যরা পা ঠুকে অ্যাটেনশন হলো।
শোল্ডার আর্মস। তারা কাঁধে রাইফেল তুলল।
এবার তিনি দেহের সব শক্তি মুখে এনে বললেন, প্রেজেন্ট আর্মস। সৈন্যরা বুকের সামনে অস্ত্র উঁচিয়ে ধরল। মাহবুব স্যালুট করলেন।
