স্যার কতজন লাগবে?
দুই সারিতে ১৬ জন হলে ভালো।
মাহবুব নিজের পোশাকের দিকে তাকালেন। তিন সপ্তাহ ধরে একটাই পোশাক তার পরনে। খাকি ড্রেস। সেটা ধুলায়-কাদায় এমন বিবর্ণ হয়ে গেছে। যে আদিতে আসলে এর রং কী ছিল আর বোঝা যাচ্ছে না। মেজর ওসমান। তাঁকে ক্যাপ্টেনের ব্যাজ পরিয়ে দিয়েছেন। সেটা দেখা যাচ্ছে।
১৬ জন পুলিশ তো পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু জুতা আছে, বেল্ট আছে, টুপি আছে, এই রকম ১৬ জন পুলিশ হয় না। কেউ-বা পরে আছে লুঙ্গি। কারও পায়ে রবারের জুতা। কারও পায়ে লাল কেডস।
মাহবুবের বুক ভেঙে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। তার নিজেরই ড্রেসের ঠিক নেই। অন্যদের কথা তিনি কী বলবেন। তার মাথায় সবুজ বেরেট, পায়ে জঙ্গল বুট। শুধু ক্যাপ্টেনের ব্যাজটা ঠিক আছে।
মাহবুব মোটামুটি চলতে পারে, এমন বারোজনকে আলাদা করলেন। তাদের সামনে দাঁড়ালেন একজন আনসার। হাতে রাইফেল আছে। রাইফেলসহ কীভাবে গার্ড অব অনার দিতে হবে, তিনি দেখিয়ে দিলেন। বারবার প্র্যাকটিস করে ব্যাপারটা যখন রপ্ত হয়ে গেল, তখন মাহবুব ঘর্মাক্ত কলেবরে এসে তৌফিককে জানালেন, হয়ে গেছে। তোর কী অবস্থা?
এখনো জাতীয় পতাকা পাই নাই। তৌফিক বললেন।
এরই মধ্যে সোলেমান বিশ্বাসের মোটরবাইক এসে গেল। সোলেমান বিশ্বাস দুইটা জাতীয় পতাকা আনতে পেরেছেন।
তৌফিকের মুখটা প্রশান্ত হাসিতে ভরে গেল।
সংগ্রাম পরিষদের নেতারা খুবই ব্যস্ত। আশপাশের গ্রাম ভেঙে লোক আসছে। আসছেন আশপাশের মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তারাও।
চেয়ার দেওয়া হয়েছে গ্রামবাসীর কাছ থেকে ধার করে। স্কুল থেকে আনা হয়েছে, আর হয়েছে মিশন থেকে। গাছে গাছে মাইক। আবার সিস্টারদের বানানো ব্যানারে বাংলা আর ইংরেজিতে লেখা : জয় বাংলা। মঞ্চের ওপরে কার্পেট, শতরঞ্জি বসানো হয়েছে, তা-ও দিয়েছেন এলাকাবাসী।
পতাকাস্ট্যান্ডে পতাকা লাগানো হলো। দড়ি আগে থেকেই বাঁধাই ছিল।
নয়টার দিকে একটা গাড়ি এল ভারতের দিক থেকে। গাড়ি থেকে নামলেন ছাত্রনেতা আবদুর রাজ্জাক, আ স ম আবদুর রব।
রাজ্জাককে দেখে ছুটে গেলেন শাহাবুদ্দীন আহমেদ সেন্টু। রাজ্জাক সেন্টুকে আগে থেকে চেনেন। সেন্টু পড়েন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে, প্রথম বর্ষে। শেখ কামালের সঙ্গে খেলাধুলা করেন, বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে গান শেখেন, মার্চ থেকে ধানমন্ডি খেলার মাঠে শেখ কামালের সঙ্গে যুদ্ধের ট্রেনিং নিয়েছেন। ট্রেনিং দিয়েছেন কর্নেল শওকত আলী। ট্রেনিং নিয়েছেন হারুন, নুর আলী, বাচ্চু, তারেক, তান্না, ইকবাল ১, ইকবাল ২ প্রমুখ। সেন্টু মার্চের অসহযোগে বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজের হয়ে গান করে বেড়িয়েছেন ঢাকার রাজপথে, শহীদ মিনারে। ২৫ মার্চের পর চলে আসেন মেহেরপুর এলাকায়, হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে তিনিও প্রতিরোধযুদ্ধে অংশ নিতে থাকেন। এরপর চলে আসেন তাঁর বাড়িতে। বৈদ্যনাথতলার আমবাগান থেকে বাড়ি মাত্র মাইলখানেক দূরে।
রাজ্জাক বললেন, সেন্টু, তুই এখানে কী করিস?
সেন্টু বললেন, রাজ্জাক ভাই, যুদ্ধ করতে গ্রামে এসেছি। শেখ কামাল আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, যার যার এলাকায় যাও। সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে মিলে এলাকায় এলাকায় প্রতিরোধ গড়ো।
রাজ্জাক বললেন, তোর বাড়ি এখানে নাকি?
হ্যাঁ। এই তো বাগোয়ান। এক মাইল দূরে হবে। তবে এই যে দেখতেছেন সুপারিগাছ, ওই যে, ওই বাড়িটা আমার চাচার বাড়ি।
আ স ম আবদুর রব বললেন, চলো তাহলে তোমার চাচার বাড়ি যাই। খুব খিদে পেয়েছে। কিছু খাওয়া যায় কি না।
রাজ্জাক বললেন, সেন্টু, তোকে পেয়েছি। খুব ভালো হয়েছে। তুই না। রবীন্দ্রসংগীত শিখেছিস?
হ্যাঁ। এখনো শিখি।
আমার সোনার বাংলা শিখেছিস তো?
হ্যাঁ। সারা মার্চ মাসে শহীদ মিনারে তো রোজ একবার করে গাইতে হয়েছে।
শোন। এখানে তো স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভা শপথ নেবে। অনুষ্ঠানে তো জাতীয় সংগীত গাইতে হবে। তুই অ্যারেঞ্জ কর।
জি আচ্ছা।
সেন্টু লেগে পড়লেন। ভবের চরের স্টিফেন পিন্টু ঘোষ ভালো গায়, তিনি জানেন। সেন্টু বলেন, রামনগরের মনসুর মোল্লা কই। কুইক। মোটরসাইকেল নিয়ে যাও। আর শোনো, মিশন থেকে হারমোনিয়াম আর তবলা আনো। দরিয়াপুরের আসাদুল হককে ডাকো। সবাই তখন ওই আমবাগানে হাজির হয়েছে।
পাঁচজন বসলেন আমবাগানের পশ্চিমে। একটা গাছের নিচে। একটু রিহার্সাল করে নেওয়া দরকার। রিহার্সাল শুরু হলে আ স ম আবদুর রবও এসে তাঁদের সঙ্গে যোগ দিলেন।
.
দশটার দিকে গাড়ির শব্দ পাওয়া গেল।
কলকাতা থেকে ডজন ডজন গাড়ি এসেছে।
ব্যারিস্টার আমীর আর আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল মান্নান ১৬ তারিখ রাতে কলকাতা প্রেসক্লাবে গিয়ে সাংবাদিকদের দাওয়াত দিয়ে এসেছেন। বলেছেন, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আপনাদের একটা বিশেষ অনুষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া হবে। ভোর সাড়ে ৫টার মধ্যে প্রেসক্লাবে থাকতে হবে। ৬টার মধ্যে গাড়ি ছেড়ে দেবে।
কেন? কোথায় যাব আমরা?
এটা আমরা কালকে বলব। আজকে আপনারা আর কোনো প্রশ্ন করবেন। না। আর আজকে যে আমরা এসেছি, কালকে ভোরে রওনা দিচ্ছি, এটাও আজ আর কারও সঙ্গে শেয়ার করবেন না।
আওয়ামী লীগের এমপিএ-এমএনএ যারা কলকাতায় আছেন, তাঁদের নেওয়ার জন্য গাড়ি দাঁড়াল সিনহা রোডে।
