মানুষের তখন উৎসাহের কোনো অভাব নেই। এলাকার লোকজন বৈদ্যনাথ আমতলার একটা জায়গার জঙ্গল কেটে সাফসুতরো করে ফেলল।
সন্ধ্যার মধ্যে পাশের ইতালীয় মিশনের চার্চ থেকে চৌকি আনা হলো। জোড়া দিয়ে দিয়ে একটা মঞ্চ খাড়া হয়ে গেল। বাংলাদেশের পতাকার জন্য স্ট্যান্ড লাগানো হলো। সেখানে বাঁশের খুঁটি পোতা হলো পতাকার জন্য।
বৈদ্যনাথতলার এই জায়গায় একটা ইপিআর পোস্ট আছে। কিন্তু ইপিআর জওয়ানরা চলে গেছেন মেজর ওসমানের দলে। পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করছেন। তার বদলে এই পোস্টে এখন ডিউটি করছে আনসার আর পুলিশের একটা দল। তারা তাঁবু গেড়ে পাহারায় রইল। মেহেরপুর থেকে মাইক আসছে। মাহবুব ওয়্যারলেসে খোঁজ নিলেন। রাতের মধ্যেই মাইক রেডি থাকবে।
তৌফিক ও মাহবুব রাতে গেলেন দেই। ভারতের অভ্যন্তরে বিএসএফ ক্যাম্পে। বৈদ্যনাথতলা থেকে বারো মাইল দূরে।
রাতের বেলা প্রচণ্ড ঝড় হলো। দেতাই বিএসএফ ক্যাম্পে শুয়ে তাঁরা আর ঘুমুতে পারলেন না। ঝড়ে মনে হচ্ছে সবকিছু লন্ডভন্ড করে দিচ্ছে।
.
১৭ এপ্রিল ৫টায় পশ্চিমবঙ্গের দেতাই বিএসএফ পোস্ট থেকে রওনা দিয়ে ভোর ৬টার মধ্যেই দুজন–মাহবুব আর তৌফিক-দুই গাড়িতে হাজির বৈদ্যনাথতলায়। রাস্তায় তারা সূর্যোদয় দেখতে পেলেন। সূর্য দেখে তৌফিকের মনটা ভালো হয়ে গেল। গতকাল এখান থেকে চলে যাওয়ার পর রাতে খুব ঝড়বৃষ্টি হয়েছে।
সকাল সকাল বৈদ্যনাথতলায় এসে তো তারা অবাক। ঝড়বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর গ্রামবাসী সারা রাত জেগে দেবদারুর পাতা দিয়ে তোরণ বানিয়েছে। তাতে বাংলা আর ইংরেজিতে লেখা ওয়েলকাম, স্বাগতম। জয় বাংলা। মিশনের সিস্টাররা সারা রাত জেগে কাপড়ে তুলা আঠা দিয়ে লাগিয়েছে। ফাদার ফ্রান্সিসও খুবই ব্যস্ত। এলাকার চেয়ারম্যান, মেম্বার, সংগ্রাম কমিটির লোকেরা খুবই ব্যস্ত। বহু আমগাছ ঝড়ে পড়ে গেছে। তারা সভাস্থল আবারও পরিষ্কার করে ফেলেছেন।
বিএসএফ সাদাপোশাকে পুরো এলাকা ঘিরে রেখেছে। রাস্তায় রাস্তায় তারা ইনফরমার রেখেছে, যদি কোথাও শত্রুবাহিনী হামলা করে, খবর দেবে। পাল্টা আক্রমণ করার ফোর্সও তারা সীমানার ভেতরে তৈরি করে রেখেছে।
মুক্তিযোদ্ধারাও দুই মাইল ব্যাসার্ধ করে একটা বৃত্ত রচনা করে অবস্থান নিয়েছে। তৌফিক আর মাহবুব সেই ব্যাপারটাও চেক করে নিলেন। ওয়্যারলেস দিয়ে ইনফরমার রাখা হয়েছে। কোনো রকমের হামলা হলে আগে থেকেই টের পাওয়া যাবে।
গাছে গাছে মাইক টাঙানো হয়েছে। তৌফিক মাইকে ফুঁ দিলেন। হ্যালো মাইক্রোফোন টেস্টিং। জয় বাংলা, জয় বাংলা। মাইক ঠিক আছে!
এর মধ্যে তৌফিকের খিদে পেয়ে গেছে। মাহবুবকে তিনি বললেন, সকালবেলা তো খেয়ে বের হইনি। এখন তো খিদে পেয়ে গেল। কী করা যায়।
দাঁড়া দেখি। মাহবুব একজন আনসারকে ডেকে বললেন, এই তোমাদের ক্যাম্পে তোমরা খাওয়ার ব্যবস্থা কী করেছ?
স্যার। শুধু ডাল আর ভাত। তবে স্যার গরম-গরম। এখনই চুলা থেকে নামল।
তৌফিক বললেন, ভেরি গুড। আমাদের দুজনকেও একটু ভাগ দাও।
আপনাদের সাথে আর যারা এসেছেন, তাঁদেরও খেতে বলেন। আমরা বেশি করে চাল দিয়েছি। আর ডালে পানি মেশালেই পরিমাণে বাড়বে।
তৌফিক-মাহবুব ক্যাম্পে গিয়ে দুইটা টিনের থালায় গরম ভাত আর ডাল খেলেন। ক্ষুধার্ত পেটে সেই ধোঁয়া ওঠা মাড়ভরা নরম ভাতের স্বাদ তাঁর মুখে চিরদিনের জন্য লেগে থাকবে। যেন অমৃত!
খাওয়ার পর হাত ধুতে ধুতে তৌফিক বললেন, মাহবুব, জাতীয় পতাকা?
মাহবুব বললেন, সেটা তো আনার কথা খেয়াল নাই।
এলাকার চেয়ারম্যান এসে হাজির হয়েছেন। তাঁর নাম সোলেমান বিশ্বাস। তার সঙ্গে মোটরসাইকেল আছে।
তৌফিক বললেন, সোলেমান সাহেব, আপনাকে একটা বিশাল কাজ দেব। বাংলাদেশের জন্য এই কাজটা আপনাকে যেভাবেই হোক করতে হবে।
সোলেমান বিশ্বাস বলেন, জি স্যার। অবশ্যই করব।
এসডিও সাহেবের কাঁধে একটা স্টেনগান। তিনি নিজে এখন যুদ্ধ করছেন। আমরাও যুদ্ধ করছি। সোলেমান বিশ্বাস ভাবলেন।
তৌফিক বললেন, আশপাশের স্কুলগুলোতে যান। বাংলাদেশের পতাকা আনবেন। কী বুঝলেন? কোন পতাকা আনবেন?
বাংলাদেশের পতাকা?
সেইটা কেমন? কী রং?
সেটা সবুজের মধ্যে লাল। লাল গোলের মধ্যে বাংলাদেশের ম্যাপ। সোনার বাংলার ম্যাপ।
একদম ঠিক আছে। সেই পতাকা আনবেন। যান।
সোলেমান বিশ্বাস মোটরবাইক স্টার্ট দিলেন। আনন্দবাস হাইস্কুল, আনন্দবাস প্রাইমারি স্কুল, আনন্দবাস ইউনিয়ন পরিষদে যেতে হবে। বাংলার পতাকা তাঁকে আনতেই হবে।
মাহবুব, মেজর ওসমান চৌধুরীর আসার কথা তার একটা দল নিয়ে। তাঁদেরই গার্ড অব অনার দেবার কথা। এখনো যে তারা আসছেন না? তৌফিক-ই-ইলাহী বললেন উদ্বিগ্ন স্বরে।
কী করতে বলিস? মাহবুব বললেন।
তুই তোর কয়েকজন পুলিশকে নিয়ে গার্ড অব অনার দেবার জন্য তৈরি হ।
আমি তো গার্ড অব অনার কতই নিই। কাজেই কীভাবে দিতে হয় জানি। কিন্তু এই পুলিশেরা কি পারবে? সারদায় ট্রেনিংয়ের সময় শেখানো হয়েছিল। আর তো প্র্যাকটিস নাই।
তুই এখনই ট্রেনিং দে। তারপর এর মধ্যে যদি ওসমান সাহেব আসেন, তাহলে তো আর কথাই নাই।
মাহবুব ডাকলেন তাঁবু গেড়ে রাতে থাকা আনসার-পুলিশদের। বললেন, ইউনিফর্ম পরে চলে আসেন। আমরা গার্ড অব অনার দেব।
