.
রিপি বলে, তারপর সেই হিলম্যান গাড়িতে আম্মুর ঘাড়ে মাথা রেখে আমরা
এসে পৌঁছালাম টিকাটুলীর মোড়।
রিমি বলে, গাড়ি ছেড়ে দিয়ে আমরা বেবিট্যাক্সি নিলাম। গেলাম ডেরমাঘাট পর্যন্ত।
রিপি বলে, ডেরমা না রে ডেমরা।
রিমি বলে, ডেমরা। ডেমরাঘাট থেকে লঞ্চে চড়ে আমরা গেলাম পাগলা আফতাব চাচার বাড়িতে।
রিপি বলে, গ্রামের এই বাড়িটা আমার খুব পছন্দ হলো। চারদিকে আমবাগান। ঝড় এল। আমরা আম কুড়াতে গেলাম। আম্মুকে বললাম, আম্মু আমরা এখানেই থেকে যাই।
রিমি বলে, আম্মু হেসে ফেললেন।
রিপি বলে, আমরা খুশি হলাম। আম্মু হেসেছেন।
রিমি বলে, সেখানেও থাকা নিরাপদ নয়। সবাই জেনে গেছে তাজউদ্দীনের ফ্যামিলি আছে এই বাড়িতে।
রিপি বলে, নৌকায় চড়ে আমরা এসে পৌঁছালাম দাদাবাড়িতে। উঠলাম মফিজ কাকুর ঘরে।
রিমি বলে, কী সুন্দর দোতলা কাঠের বাড়ি। নিচতলায় থাকেন কাকুরা। দোতলায় থাকি আমরা।
.
এখন আম্মু ডাকছেন। রিমি, রিপি এদিকে এসো। তোমার কাকুকেও ডেকে আনো।
কেন আম্মু?
রেডিওতে বলছে, তোমার আব্দুর ভাষণ প্রচার করবে।
আকাশবাণী কলকাতা। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ গতকাল একটি গোপন বেতার থেকে ভাষণ দেন। এখন সেই ভাষণের রেকর্ড প্রচার করা হচ্ছে।
দোতলার কাঠের ঘরে সবাই উপস্থিত। মফিজ কাকু। হোসনে আরা কাকিমা। লিলি। রিমি। ইপি। দিপি।
তাজউদ্দীনের গলা শোনা গেল :
স্বাধীন বাংলাদেশের বীর ভাইবোনেরা,
বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মুক্তিপাগল গণমানুষের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর সরকারের পক্ষ থেকে আমি আপনাদেরকে আমার সংগ্রামী অভিনন্দন জানাচ্ছি…
সোহেল কথা বলে উঠল।
রিমি বলল, সোহেলবাবু কথা বোলো না। আব্দুর কথা শোনো…।
লিলির চোখ ভিজে যাচ্ছে। যাক। মানুষটা বেঁচে আছে। আর বেঁচে আছে বাঙালির স্বাধীনতার আশা। সরকার হয়েছে। এখন মুজিব ভাই না জানি কোথায়?
৩৩
২৬ বছর বয়সী তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী মেহেরপুরের মহকুমা প্রশাসক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে পেশা শুরু করে এখন সিএসপি অফিসার। লড়াই করছেন স্বাধীন বাংলাদেশের হয়ে, সেই ২৫ মার্চ রাত থেকে। পুলিশ, আনসার, ইপিআর, সংগ্রাম পরিষদের লোকজন মিলে তাঁর বাহিনী। কাঁধে স্টেনগান নিয়ে তিনি চলাফেরা করেন।
মাহবুব উদ্দিন আহমেদ, ঝিনাইদহ মহকুমা পুলিশ কর্মকর্তা। তাঁর সঙ্গে দুই হাজার মুক্তিসেনা। পুলিশ, আনসার, ইপিআর আর সাধারণ মানুষ মিলে।
ইপিআরের মেজর আবু ওসমান চৌধুরী তার হাজারো ইপিআর নিয়ে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন। বাঙালি সৈনিক, বাঙালি পুলিশ, ইপিআর, আনসার আর হাজার হাজার ছাত্র শ্রমিক সাধারণ মানুষ মিলে মার্চের মধ্যে পদ্মার পশ্চিম পারকে পাকিস্তানি দখলমুক্ত করেই ফেলেছিলেন। কিন্তু দখল ধরে রাখা যাচ্ছে না। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পাকিস্তানি বাহিনী তাদের শক্তিবৃদ্ধি করে এগিয়ে আসছে, তাদের সমর্থন দিচ্ছে পাকিস্তান বিমানবাহিনী। একের পর এক জেলা মহকুমা সদর ছেড়ে দিয়ে ক্রমাগত। পিছু হটছে মুক্তিবাহিনী।
এই হতাশার মধ্যে বিএসএফের নেটওয়ার্কে তৌফিকের কাছে ফোন এল। বৈদ্যনাথতলায় হবে বাংলাদেশ সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান। স্ট্রিকট সিক্রেট।
১৬ এপ্রিল ১৯৭১ বৈদ্যনাথ তলায় মাহবুব আর তৌফিক এলেন জিপ নিয়ে। এখানে আসা খুবই কষ্টকর। রাস্তাঘাট ভাঙাচোরা।
মাহবুব বলেছিলেন, জায়গাটা কিন্তু ভালোই বাছাই করেছে।
তৌফিক বললেন, চুয়াডাঙ্গায় করতে চেয়েছিল। পাকিস্তানি মিলিটারি টের পেয়ে সেখানে ব্যাপক এয়ার অ্যাটাক করে। বম্বিং করে।
মাহবুব বললেন, সেই তুলনায় এই জায়গাটা সব দিক থেকে সেফ। এটা একটা এনক্লেভের মতো। তিন দিকেই ইন্ডিয়া। বিমান হামলা করতে গেলে বিমান ইন্ডিয়ার আকাশসীমা লঙ্ঘন করবে। পাকিস্তানিরা এত বড় বোকামো করবে না। ইন্ডিয়ান সৈন্য ইনভাইট করে আনবে না। আর এত গাছ যে ঠিক কোন জায়গাটায় প্রোগ্রাম হচ্ছে, আকাশ থেকে বোঝাও যাবে না।
তৌফিক বললেন, আর সড়কপথে মিলিটারি এই জায়গাটাতে এসে পৌঁছাতেও পারবে না। মেহেরপুর দিয়ে আসতে হবে। মেহেরপুর এখনো মুক্তিবাহিনীর দখলে। সেই সাহস পাকিস্তানি মিলিটারির হবে না। শক্তিতেও কুলাতে পারবে না।
দুই দিন আগেই তাজউদ্দীন আহমদ এখানে নাকি লোক পাঠিয়েছিলেন। সঙ্গে ছিলেন বিএসএফের অফিসার। তাঁর সঙ্গে সাদাপোশাকের আরও লোকজন। তারা পুরো এলাকাটা রেকি করে গিয়েছেন।
তৌফিক ও মাহবুবকে দেখে একজন-দুজন এলাকার মানুষ ভিড় করতে শুরু করেছে।
এলাকার সংগ্রাম পরিষদের নেতা কে? জানতে চাইলেন তৌফিক।
রুস্তম আলী নামের একজন কলেজছাত্র এগিয়ে এলেন। বললেন, আমি এখানকার সংগ্রাম কমিটিতে আছি।
আপনাদের লোকজনকে ডাকুন।
আবদুল মোমিন চৌধুরী, দোয়াজ উদ্দীন মাস্টার, আইয়ুব হোসেন, রুস্তম আলী, রফিকুল ইসলাম, জামাতী আলী, সৈয়দ আলী–গ্রামের যুবকেরা এগিয়ে এলেন। তাঁরা বললেন, তাঁরা এই এলাকার সংগ্রাম কমিটির নেতা। ২৬ মার্চেই তারা ইপিআর পোস্টে এসে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা তুলেছেন। পুরা এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে আছে।
সীমান্তচৌকিতে প্রহরারত পুলিশ, আনসার সদস্যরাও এগিয়ে এলেন।
বলা হলো, এখানে নেতারা আসবেন। একটা মিটিং করবেন। আমবাগানের নিচের একটা জায়গা পরিষ্কার করতে হবে।
