রিমি বলে, তাঁতীবাজারে খালার বাসায় আমরা তো ভালোই ছিলাম। হরতাল। অসহযোগ। স্কুল নাই। পড়াশোনা নাই।
রিপি বলে, ২৫ মার্চ সন্ধ্যা পর্যন্ত তো আমরা খেলছিলাম।
রিমি বলে, আমি ঘুড়ি বানানো শিখে গেলাম।
রিপি বলে, আমি তো সুতোয় মাঞ্জা দেওয়াতে এক্সপার্ট হয়ে গেলাম। বাজার থেকে সুতোর গুটি কিনে এনে ছাদে এ মাথা থেকে ও মাথায় টেনে মেলে ধরতে হয়। তারপর ভাতের মাড়, আঠা, রং আর কাঁচের গুঁড়ো দিতে হয়। খুব সাবধানে দিতে হবে কিন্তু, না হলে হাত কেটে যাবে, রক্ত বের হবে।
রিমি বলে, কত ঘুড়ি ওড়ানো শুরু হলো। চৈত্র মাস। বাতাস ঘুড়ি ওড়ানোর জন্য পারফেক্ট। ছাদে ছাদে ঘুড়ি।
রিপি বলে, আর চক দিয়ে দেয়াল ভরে আমরা লিখতে লাগলাম, জয় বাংলা। আঁকতে লাগলাম নৌকার ছবি।
রিমি বলে, আর একটা বানর পিঠে একটা বাচ্চা নিয়ে ওই বাড়ির ছাদ থেকে এসে গেল এই বাড়ির ছাদে। আমি চিৎকার করে উঠলাম। বানরটা ভয় না পেয়ে আমাকে ভেংচি কাটতে লাগল।
রিপি বলে, সারা দিন খেলাধুলা করে মাথার চুলভরা ঘাম নিয়ে আমরা ঘুমুতে গেলাম। খালা তো বকা দেবেন না।
রিমি বলে, ঘুম ভেঙে গেল মধ্যরাতে। গুলির শব্দ। মানুষের চিৎকার। আমরা জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি, চারদিকে আগুন আর আগুন। খালু ছাদ থেকে এসে বললেন, নয়াবাজার, শাঁখারীপট্টি, তাঁতীবাজার সব জ্বলছে। মহল্লায় মহল্লায় আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঘুমন্ত মানুষ ঘর থেকে বের হতেই পড়ছে গুলির মুখে।
রিপি বলে, কী ভয়ঙ্কর ছিল সেই রাত।
রিমি বলে, ভয়ে আমি আধমরা হয়ে গেলাম।
রিপি বলে, সারা রাত গোলাগুলি আর মানুষের চিৎকারে দুচোখের পাতা এক করতে পারলাম না।
রিমি বলে, ২৬ মার্চ দিনের বেলাতেও, ও মা, কী ভয়াবহ ঘটনা ঘটল!
রিপি বলে, পাশেই ছিল সিনেমা হল নাগরমহল। বাড়িপোড়া অসহায় মানুষগুলো এসে ঢুকেছিল ওই সিনেমা হলে। দিনের বেলা আগুন লাগিয়ে দিল সিনেমা হলটিতে।
রিমি বলে, কী বিশ্রী ধোঁয়া! কালো। দম আটকানো। খালার বাড়িও ধোঁয়ায় ভরে গেল।
রিপি বলে, খালু আমাদের বললেন, এই তোমাদের বাবার নাম সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। কেউ এসে যদি জিজ্ঞেস করে, তাজউদ্দীন কে হয়, বলবে কেউ হয় না। আমরা এই বাড়ির মেয়ে।
রিমি বলে, আর অমনি তুমি বললে, না, আমার আব্বার নাম কেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী হবে! আমার আব্বার নাম তাজউদ্দীন।
রিপি বলে, কারফিউ উঠে গেলে বড় মামু এলেন। আমাদের নিয়ে গেলেন মগবাজারে। ছোট মামুর বাড়িতে।
রিমি বলে, সেখান থেকে আনার আপার বাড়িতে আবার নিয়ে গেলেন আমাদের সাইদুল দুলাভাই। আনার আপা তো আমাদের নিজেদেরই বোন। কিন্তু আব্ব, আম্মু, সোহেল, মিমির কোনো খবর তো পাই না।
রিপি বলে, তারপর মার্চের ৩০ তারিখে বড় মামু আর সাইদ ভাই আমাদের নিয়ে আবার বের হলেন সকাল সকাল। মগবাজার মোড়ে দেখতে পেলাম বড় মামুর লাল হিলম্যান গাড়ি। আমাদের গাড়ির ভেতর ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। ঢুকে দেখি, আম্মু, সোহেল, মিমি। আমরা যেন আমাদের ধড়ে জান ফিরে পেলাম।
মিমি বলে, আম্মু কেমন করে এইখানে এলেন সেটাও আম্মু এতবার বলেছেন যে আমাদের মুখস্থ। আম্মু আমাদের সাতমসজিদ রোডের বাড়ি ছেড়ে পাশের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কারফিউ উঠে গেলে বড় মামু আম্মুর খোঁজে বেরিয়ে পাশের বাড়িতে খোঁজ নিলে আম্মুর দেখা পান। তাকে নিয়ে গেলেন তার ধানমন্ডি ১৩/২ বাড়িতে। দুপুরের পর মুসা সাহেব নিয়ে এলেন। একটা চিঠি। আব্দুর চিঠি। আব্বু লিখেছেন, লিলি আমি চলে গেলাম…
রিপি বলে, আম্মু সেই চিঠি পড়ে স্তব্ধ হয়ে রইলেন। চোখের জলে তাঁর কাপড় ভিজে যেতে লাগল।
রিমি বলে, আম্মু আর মামুর একটা করুণ ঘটনাও আছে। ২৭ মার্চের পর আম্মু এ-বাড়ি ও-বাড়ি আশ্রয়ের চেষ্টা করছেন। এক রাতে একটা বাড়িতে। আশ্রয় মিলল। খানিকক্ষণ পর বাড়ির লোক বলল, ভাবি, এই বাড়িতে ছেলেমেয়ে বেশি। বিপদ হতে পারে। চলেন পাশের বাড়িতে নিয়ে যাই। ওইটা একটু ভেতরে। ওই বাড়িতে বিপদ কম। সোহেল, মিমিকে নিয়ে আম্মু তার সঙ্গে বের হলেন। রাতের বেলা। চারদিকে ভয়। আলো নাই। অন্ধকার। মিলিটারির গাড়ির শব্দ। কুকুরের চিৎকার। এর মধ্যে লোকটা বলল, ভাবি, একটা জিনিস ফেলে এসেছি। আপনারা দাঁড়ান। নিয়ে আসছি। বলে তিনি বাড়ির ভেতরে গেলেন। আর আসেন না। গেটে তালা দিয়ে দিয়েছেন। দুইটা বাচ্চা নিয়ে আম্মু আড়াল খুঁজছেন।
রিপি বলে, আম্মু বাড়ির পেছনে গেলেন। অনেক ইট পালা করে রাখা। দুই পালা ইটের মধ্যে তিনি দুই বাচ্চাসহ সারা রাত মাটিতে বসে রইলেন।
.
ব্যাঙ্গমা বলবে, এই ভদ্রলোক ১৯৭২ সালের পর অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের কাছে দরখাস্ত করছিলেন প্রমোশনের লাইগা।
ব্যাঙ্গমি বলবে, এই ভদ্রলোক একজন কর কর্মকর্তা। তিনি দরখাস্ত করলেন তাঁর প্রমোশনের লাইগা। তাজউদ্দীন ফাইল দেখতে আছিলেন হেয়ার রোডের মন্ত্রিবাড়িতে। লিলিরে ডাকলেন। কইলেন, লিলি, তারে প্রমোশন দিয়া দিলাম। লিলি কইলেন, তুমি মন্ত্রী, কারে প্রমোশন দিবা না দিবা তোমার ব্যাপার। তাজউদ্দীন কইলেন, এটার লগে তুমিও জড়িত। ওই যে তোমারে ঘরের বাইর কইরা গেট লাগায়া দিছিল, সেই মানুষ। তুমি সারা রাত খোলা আকাশের নিচে সোহেল-মিমিরে লইয়া আছিলা…লিলি কইলেন, এইটা তোমার ব্যাপার…তাজউদ্দীন কইলেন, আমার ব্যক্তিগত জীবনের ঘটনা দুর্ঘটনা দিয়া তো অফিশিয়াল ব্যাপার বিচার করা যায় না…
