নাক বরাবরই হাঁটছেন দুজন। এর মধ্যে এসে গেল সীমান্ত। সীমান্তের খুঁটিগুলো আছে। আর কিছু নেই। সীমান্তচৌকিতে ইপিআর কেউ নেই। বেশির ভাগ ইপিআর জওয়ান মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে লড়াই করতে গেছে। বিএসএফের লোকেরা থাকতে পারত। তাদেরও কাউকে দেখা গেল না। সীমান্তচৌকি আছে। টং আছে।
সন্ধ্যা পেরিয়ে যাচ্ছে। আকাশ অন্ধকারে ছেয়ে আসছে। শুধু একটুখানি লালের পোচ এখনো আকাশের গায়ে। রাতচর পাখিরা বেরোতে শুরু করেছে। নীড়সন্ধানী পাখিরা নীড়ে ফিরে গেছে।
নিজেদের পায়ের আওয়াজে নিজেরাই চমকে উঠলেন সাইফুল আর মোরাদ। আবদুস সামাদের বাড়ি পাওয়া গেল। সামাদ মিয়াকেও।
সাইফুল বললেন, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এসেছেন।
সামাদ সজোরে বলে উঠলেন, হুজুর আসছেন? কী কন? উনি কই? আমারে নিয়া চলেন। নিয়া আসি।
কিন্তু বর্ডার পার হওয়া কি উচিত হবে? আসাম পুলিশ ধরবে না। তাঁকে?
তা-ও তো কথা। হুজুর আবার আসামরে পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে ঢুকানোর কথা কইছিলেন। আসামের নেতারা তার উপরে ম্যালা খ্যাপ্লা। আচ্ছা চলেন গ্রাম পঞ্চায়েতের কাছে যাই।
.
ব্যাঙ্গমা বলবে, পঞ্চায়েতপ্রধান ভাসানীকে আসতে দিতে নারাজ। তার জিজ্ঞাসা আছিল, কোন দল? ন্যাপ? তাইলে ঢোকা যাইব না। শুধু আওয়ামী লীগ হইলে যাইব!
.
সাইফুলের পাল্টা প্রশ্ন, পাকিস্তানি মিলিটারিরা মারার সময় আওয়ামী লীগ ন্যাপ আলাদা করে না। বাঁচার জন্য সবাই তো ইন্ডিয়া যাইতেছে। শরণার্থীদের আবার আওয়ামী লীগ, ন্যাপ কী?
মোরাদকে নৌকায় পাঠিয়ে সাইফুল রয়ে গেলেন আসামে, সামাদ মিয়ার বাড়িতে। কারণ, পরের দিন এই এলাকায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মইনুল হক চৌধুরী আসবেন।
সাইফুল আর সামাদ মিয়া মন্ত্রীর সভার উদ্দেশে বের হলেন দুপুরবেলা। মূল রাস্তা ছেড়ে পাথারের মধ্য দিয়ে লোকচক্ষু এড়িয়ে গিয়ে সভাস্থলে পৌঁছালেন তাঁরা। সেখানে অনেক বাঙালি। আর আলাদা করে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে হলো না।
মন্ত্রী একটা স্কুলঘরে বসেছেন। সাইফুল কাউকে কিছু না বলে জোর করে গিয়ে ঢুকে পড়লেন মইনুল হক চৌধুরীর ঘরে। বললেন, আমি এসেছি মওলানা ভাসানীর পক্ষ থেকে!
মওলানা ভাসানী? কই তিনি?
নামাজের চরে।
মইনুল বললেন, আপনি আমার জিপে ওঠেন। জিপে ওঠার পর তিনি বললেন, মওলানা সাহেব ছিলেন এইখানকার মুসলিম লীগের সভাপতি, আমি ছিলাম সাধারণ সম্পাদক। বুঝতে পারছেন?
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গেলেন স্থানীয় একটা রেস্টহাউসে, ফুলবাড়ি রেস্টহাউস। যেখানে ফোন আছে। তিনি ফোন করলেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে। একটু পর এসে সাইফুলকে বললেন, জিপ নিয়ে যান। মওলানা সাহেবকে নিয়ে আসুন।
সামাদ সাহেব গেলেন হুজুরকে আনতে। আনতে আনতে রাত ভোর হয়ে গেল। কারণ, খবর রটে গেছে যে হুজুর কেবলা জিন্দাপীর এসেছেন। লোকজন ঘিরে ধরল তার আগমনের পথ। সবাইকে ফুঁ দিয়ে পানিপড়া দিয়ে দোয়া করে আসতে আসতে ভাসানী রাত কাবার করে দিলেন।
পরের দিন মওলানা ভাসানী সাইফুল মোরাদ বিশেষ কার্গো বিমানে চড়ে কলকাতা দমদম এয়ারপোর্ট। সেখান থেকে গোয়েন্দা প্রহরায় সোজা কোহিনুর প্যালেস। পার্ক সার্কাসের পার্ক স্ট্রিটে।
পাঁচতলার একটা ফ্ল্যাটে দুটো রুম। বড়টাতে রইলেন ভাসানী আর মোরাদ। ছোটটায় সাইফুল। মোরাদের নৌকা থেকে নেমে যাওয়ার কথা ছিল। তিনি নামতে পারেননি। তবে তিনি ভাসানীর কাঁথাটা ফেলে দিয়ে এসেছেন। সঙ্গে এনেছেন তাঁর রংচটা স্যুটকেসটা। সাইফুলকে মোরাদ বললেন, এইটা হুজুরের বিয়ার যৌতুক। এইটার সাথে স্মৃতি জড়িত। ফেলা ঠিক হবে না।
৩২
আম্মা আম্মা, দ্যাখো আকাশে কত বড় চাঁদ উঠেছে? ও মা! চাঁদটা না তালপিঠার মতো! কত বড়! আম্মা মনে হচ্ছে, চাঁদটাকে খেয়ে ফেলি! ১২ বছরের রিপি বলল।
চৈতালি পূর্ণিমা। শাল-গজারি, তাল-নারকেল-সুপুরি, আম-জাম-কাঁঠাল বাঁশঝাড়ঘেরা বাড়িটার উঠানে চাঁদের আলো পড়ে উঠানটাকেই মনে হচ্ছে। একটা কচ্ছপের পিঠ। নাম না-জানা ফুলের গন্ধ আসছে।
রিমি আর রিপি একটা ফেলে রাখা গাছের গুঁড়ির ওপরে বসে আপনমনে খেলছিল। ও পাশে একটা টুলে বসে আছেন ওদের মা লিলি, তার কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে মিমি। আরেকটা টুলে বসে আছেন রিপিদের কাকিমা। মফিজ কাকার স্ত্রী। তার কোলে ছোট্ট সোহেল।
রিমি-রিপিদের সঙ্গে খেলায় যোগ দিয়েছে সমবয়সী চাচাতো বোন ইপি আর দিপি।
ওরা একটু আগে ছিল খড়ের গাদার আড়ালে। উঠোনের পশ্চিম দিকে খড়ের গাদা। দক্ষিণ দিকে ধান শুকানোর বড় খুলি। খড়ের গাদার পাশে বাঁশঝাড়ের নিচে গোয়ালঘর। গোয়ালঘর ঘেঁষে গরুর চাড়ি, বাঁশের বেড়া আর মাটি দিয়ে মাচান করে বাধা। চাড়িতে মাড় দেওয়া হয়, পানি দেওয়া হয়, খইল দেওয়া হয়। ওইটা গরুদের ডাইনিং টেবিল, রিপি বলেছিল।
এখন উঠানে রাখা গজারিগাছের গুঁড়িতে বসে হঠাই রিপির চোখ গেল চাঁদের দিকে।
১০ বছরের রিমি ছুটে গেল সোহেল আর মিমির কাছে। সে ছড়া বলতে লাগল, আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা, চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা।
সে একবার টিপ দিচ্ছে মিমির কপালে, একবার সোহেলের কপালে। মিমি ছড়া শুনে নিজেই চাঁদকে ডাকতে লাগল, আয় আয়…
তাজউদ্দীনের গ্রামের বাড়ি দরদরিয়ায় এখন তারা। ২৫ মার্চের পর কী করে রিমি, রিপি আর আম্মু, সোহেল, মিমি একখানে হলো, আর অবশেষে এই গ্রামের বাড়িটায় আসতে পারল, সে কথা রিমি, রিপি কিংবা তাদের মা জোহরা ওরফে লিলি কোনো দিনও আর ভুলতে পারবেন না।
