আকাশে একটু একটু করে মেঘ জমছে।
ভাসানী বললেন, সাইফুল, কার কাছ থাইকা বিদায় নিলা?
সাইফুল বললেন, মা আছে। স্ত্রী আছে।
ছেলেপুলে নাই।
নাই। তবে হবে। প্রেগন্যান্ট। কবে বিয়া করছিলা?
৬৯ সালে।
বউ কী কইল?
বউ কী বলবে। মা কান্নাকাটি করল। বউকে বললাম, আমি চললাম। যদি মেয়ে হয়, তোমার আঁচলে বেঁধে রেখো। আর ছেলে হলে আমার খোঁজে পাঠায়া দিয়ো। হাতে একটা কবচ বেঁধে দিয়ো। হালকা কথা বললাম আরকি। শুনে মা বললেন, সাইফুল সব সময়ই নিষ্ঠুর।
মা তোমারে নিষ্ঠুর কয় ক্যান?
আমি তো পলিটিকস করব বলে ছোটবেলায় বাড়ি ছাড়ছি। আব্বা রাগ করছিলেন। কুড়ি বছর আর বাড়ির সাথে যোগাযোগ রাখি নাই।
অ। দ্যাখো সাইফুল। আমগো পলিটিশিয়ানদের কী অবস্থা। তুমি বউ ছাইড়া চইলা আইলা। বউয়ের বাচ্চা হইব। আমিও বউ-বাচ্চা সব ফেলায়া চইলা আইলাম। মোরাদ তো আইছে একবস্ত্রে। ও অবশ্য আমগো আগায়া দিতে আইছে। অরে একটা ভালো নিরাপদ জায়গা দেইখা নামায়া দেওন লাগব।
প্রচণ্ড ঝড় শুরু হলো বেলা তিনটার দিকে। আকাশ ছেয়ে এল কালো মেঘে। দমকা বাতাস। নৌকা বুঝি ডুবেই যায়। পানি দুলছে। নৌকা দুলছে। তিনজন মাঝি হাতে লগি নিয়ে ঠেসে ধরে আছে। নৌকা একটা কাশবনের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাতে বাতাসের দাপুটে ঝাঁপটা কম লাগছে না। বরং কাশগাছগুলো এসে নৌকার ছইয়ে বাড়ি খাচ্ছে।
তিনজন সওয়ারি ভাসানী, সাইফুল, মোরাদ ছইয়ের মধ্যে বসে আছেন। চৈত্রের ঝড় থেমে গেল।
তারা আবার চলতে শুরু করলেন। বিকেলটা ঝকঝক করছে বৃষ্টির পর। নদীর জল যদিও এখনো বেশ কালো। দূরে রোদ পড়ে যমুনার জলে একটা রুপালি বুটিদার চাদর চোখ ঝলসে দিতে চাইছে।
দূরে দিগন্তে দেখা গেল ধোয়া। অনেক দূরে দূরে অনেকগুলো জায়গা থেকে ধোঁয়া উঠছে।
মোরাদ বললেন, সব ছারখার করে দিল।
ভাসানী বললেন, কী ছারখার করল?
মোরাদ বললেন, ওই দ্যাখেন। আগুন। পাকিস্তানি মিলিটারিরা আগুন। দিয়া সারা দেশ জ্বালায়া দিল।
সাইফুল বললেন, ওরা তো বলেইছে, মিট্টি মাংতা আদমি নেহি মাংতা।
ভাসানী ছইয়ের বাইরে এলেন। দাঁড়ালেন। তারপর মৃদু হেসে বললেন, ওইটা আসামের আগুন। জুম চাষ করব। আগুন লাগায়া জঙ্গল সাফ কইরা সেইখানে আবাদ করব।
নৌকা চলছে। রাতে নৌকা দাঁড় করানো হয়। খাওয়াদাওয়া সেরে সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। আবার ভোর থেকে নৌকা চলে।
নৌকা ঘাটে ভিড়লেই মুশকিল। একজন যদি দেখেন হুজুর ভাসানী নৌকায়, অমনি গ্রামে খবর হয়ে যায়। লোকজন দল বেঁধে চলে আসে। ভাসানী কথা বলতে শুরু করেন। কেউ কেউ ভাসানীকে কদমবুসি করতে চায়। কেউবা পানিপড়া চায়।
সাইফুল বলে দিয়েছেন, মাঝি, নৌকা ভিড়াবা না।
মাঝিরা একসময় জানাল যে নৌকায় চালডাল আছে। কিন্তু আগুন নেই। মালসাতে আগুন ছিল। বৃষ্টিতে ভিজে নিভে গেছে। তামাক খেতে পারছে না তারা। কাজেই নৌকা ভেড়াতেই হবে। জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতে হবে। দেশলাই লাগবে।
সাইফুল ভাবলেন, আরও কিছু শাকসবজি সংগ্রহ করতে পারলে ভালো।
হাঁড়িভাঙার চরে নৌকা থামল। সাইফুল নৌকা থেকে নেমে চরের ভেতরের নেমে দেশলাই খুঁজতে লাগলেন। দোকান পাওয়া গেল। কিছু কাঁচা তরিতরকারিও কিনলেন তিনি।
ফিরে এসে সাইফুল দেখলেন, নৌকা ঘিরে ভিড়।
সাইফুল বললেন, তাড়াতাড়ি নৌকা ছাড়ো মাঝি।
ভাসানী বললেন, আকাশের অবস্থা দ্যাখছ? মুখটা ব্যাজার কইরা রইছে। নৌকা ছাড়া কি ঠিক হইব।
সাইফুল বললেন, এই পাড়ে ফুলছড়ি, ওই পাড়ে বাহাদুরাবাদ, আর্মির ক্যাম্প। এই লোকগুলার মধ্যে একটা-দুইটা মুসলিম লীগার, জামাতি থাকবেই। গিয়া খবর দিবে। আপনি জানেন আপনি আর্মির কত বড় টার্গেট?
মোরাদ বললেন, ভাসানীরে পাইলেই গুলি, এইটাই অর্ডার। টিক্কা খান বইলা দিছে, লাশ চাই। মওলানার লাশ চাই।
সাইফুল বললেন, হুজুর। আপনি কোনো কথা বলতে পারবেন না। আর ছইয়ের ভিতর থেকে বের হতে পারবেন না।
ভাসানী উদাস হয়ে গেলেন।
তারপর বললেন, আচ্ছা। তোমরা যা ভালো মনে করো, করো।
একটুক্ষণ চুপ করে থেকে তিনি আবার কথা বলা শুরু করলেন, আমারে মৌনব্রত করতে বলো। মহাত্মা গান্ধী করতেন। সপ্তাহে এক দিন চুপ কইরা থাকতেন।… শুরু হলো গল্প। গান্ধী, দেশবন্ধু, সুভাষ বোস, মওলানা আজাদ…গল্পের অবিরল ধারা বয়েই চলেছে…আর বয়ে চলেছে যমুনা…
এর মধ্যে এক সন্ধ্যায় রেডিওতে শোনা গেল, তাজউদ্দীনের ভাষণ। তিনি বললেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আপনাদের রক্তিম শুভেচ্ছা।
সাইফুল বললেন, হুজুর, সরকার তো গঠন কইরা ফেলছে। আপনে তো লেট হইয়া গেলেন।
ভাসানী বললেন, চলো কলকাতা যাই। অনেক কিছু করনের আছে!
.
ব্যাঙ্গমা বলবে, এই যাত্রার বিবরণ এবং ১৯৭১ সালে ভারতে মওলানা ভাসানীর অবস্থান লইয়া সুন্দর একটা বই আছে, সাইফুল ইসলামের লেখা স্বাধীনতা ভাসানী ভারত।
ব্যাঙ্গমি বলবে, সেই বই থাইকাই আমরা ভাসানীর এই সব কাহিনি স্মরণ করছি।
ব্যাঙ্গমা বলবে, হ। আমগো এই স্মরণের মধ্যে বেশির ভাগটাই নানান বই থাইকা নেওয়া। এইটা য্যান মনে রাখা হয়।
.
ধল্লাই নদের নামাজের চরে মওলানা ভাসানীর নৌকা তীরে বেঁধে রাখা হয়েছে। চর ধরে হাঁটতে শুরু করলেই সীমান্ত। সাইফুল আর মোরাদ চলেছেন চরের পথ বেয়ে। আলপথ। বালুচর। গাছগাছড়া। বড় বড় কাশ। ভাসানী বলে দিয়েছেন, নাক বরাবর যাবা। গেলে পাবা সামাদের বাড়ি। সামাদ আমার মুরিদ। আমার কথা কওনের সাথে সাথে বাকিটা দেখবা সে-ই কইরা দিব।
