৩ এপ্রিল পাকিস্তানি সৈন্যরা টাঙ্গাইল শহরে ঢুকে পড়ে। সেনাবাহিনীর ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টে কিছুদিন চাকরি করে চাকরি ছেড়ে দেওয়া কাদের সিদ্দিকীর স্বতঃস্ফুর্ত নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী মাটিয়াচরায় পাকিস্তানি বাহিনীকে বাধা দিয়েছিল, ১৬ জন সাথি সেখানে শহীদ হয়। পাকিস্তানিদের বহু সৈন্য হতাহত হলেও তারা পিছু হটেনি।
পাখি মারার মতো অবিরাম গুলি ছুঁড়তে থাকে তারা, বাড়িঘরে আগুন দেয়। তারপর তারা এগোতে থাকে সন্তোষের দিকে। মওলানা ভাসানীকে আটক করতে হবে।
মওলানা ভাসানী তখন বিন্যাফৈরের বাড়িতে বসে রেডিও শুনছিলেন। দুজন অবাঙালি মোহাজের, যাদের আদিবাড়ি ভারতের মোজাফফরবাদ, তাদের তিনি জনরোষ থেকে বাঁচিয়ে নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন। রাশেদ খান মেনন আর হায়দার আকবর খান রনোরা শিবপুর নরসিংদীতে একটা প্রতিরোধকেন্দ্র গড়ে তুলে পাকিস্তানি বাহিনীকে প্রতিরোধ করার প্রয়াসের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার বাড়ি ওখানে, তিনিই নেতা। রনো আর মেননকে বলা হলো, যাও, টাঙ্গাইলে গিয়ে ভাসানীর সঙ্গে দেখা করো। তারা সন্তোষে গেলেন, মওলানা সেখানে নেই, কাজেই তারা বিন্যাফৈরে গেলেন। মওলানা তাঁদের নির্দেশ দিলেন, কাগজ-কলম লও, জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্টের কাছে টেলিগ্রাম লেখো। এর মধ্যেই দেখা গেল, সন্তোষের বাড়িতে আগুন জ্বলছে, আকাশ লাল করে সেই শিখা দাউ দাউ করে একেকবার অনেক ওপরে উঠছে আর কালো ধোঁয়ায় দিগন্ত ছেয়ে ফেলছে। মেনন আর রননা উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, হুজুর, সরে যাবেন না?
ভাসানী বললেন, সইরা গেলে তো ইন্ডিয়া যাইতে হয়। নেহরু আমার বন্ধু আছিল। তার মাইয়া ইন্দিরা আমারে যত্ন কইরাই রাখব, কিন্তু সুভাষচন্দ্র বসু তো বিদেশে গিয়া কিছু করতে পারে নাই।
আর শোনো, তিনি তাঁর পাশের কয়েকজন মুরিদকে ডেকে বললেন, এই দুই মোহাজেররে আমি তোমগো জিম্মায় রাইখা গেলাম। অগো য্যান কোনো ক্ষতি না হয়।
সন্তোষ গ্রামেই শুধু ৬ জন বৃদ্ধ, ১৪টি গরু ঘরপোড়ানো আগুনে মারা গেছে। মওলানা ভাসানীর সেক্রেটারি ইরফানুল হক জানালেন, আপনার ইসলামী ইউনিভার্সিটির আটটা শণ আর টিনের ঘর, আর বিল্ডিংগুলা সব পুড়ায়া দিছে।
শুনে মওলানা বললেন, সিন্দুকে আওরঙ্গজেবের হাতের লেখা একটা কোরান শরিফ আছিল, সেইটাও পুইড়া গেল। মেনন, রনো দ্যাখো তো, আমার সন্তোষের আগুন অহনও দেখা যায় নাকি!
মেনন ও রনো ঘরের বাইরে এসে পায়ের আঙুলে দাঁড়িয়ে দূরের ধোয়া আগুন দেখছিলেন। হঠাৎ পেছনে তাকিয়ে দেখতে পেলেন, মওলানা লুঙ্গিটা। এক হাতে উঁচু করে ধরে ধানখেত, পাটখেত ধরে হেঁটে গিয়ে ধঞ্চেখেতের আড়ালে হারিয়ে গেলেন।
নৌকা নিয়ে যমুনা বেয়ে ভাসানী গেলেন সিরাজগঞ্জের ঘাটে।
বাড়িতে ট্রেসার বুলেট বর্ষণ করে আগুন লাগিয়ে দেয়। গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তল্লাশি করতে থাকে, কাফের মওলানা কিধার হ্যায়। প্রতিটা বাড়িতে তারা উন্মত্তের মতো আগুন দেয়।
ভাসানীর দারাপুত্র-পরিবার আরও শত শত পরিবারের সঙ্গে নদীর বালুচরে গিয়ে আশ্রয় নেয়। সারা রাত খোলা আকাশের নিচে কাপড় বিছিয়ে
পড়ে থাকে তারা।
মওলানা ভাসানী সিরাজগঞ্জের ঘাটে নৌকা ভিড়িয়ে খবর পাঠালেন। ন্যাপের (মোজাফফর) সিরাজগঞ্জের সভাপতি সাইফুলকে। আর মোরাদ নামের একজন যুবকর্মীকে।
সাইফুল গেলেন যমুনার ঘাটে। সাইকেলে চড়ে।
ভাসানী বললেন, সাইফুল আইছ। আমি ভারতে যাইতাছি। তুমিও আমার সাথে চলো। লও উইঠা পড়ো।
সাইফুল বললেন, আমি করি অন্য দল। আমার নেতা মোজাফফর সাহেব। আমরা ইলেকশনে অংশ লইছি। আপনে করেন অন্য দল। দুইটাই ন্যাপ হতে পারে, আপনার লাইন আমার লাইন তো আলাদা। কেমনে নৌকায় উঠি?
মওলানা ভাসানী বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। পেছনে বড় ছই। ছইয়ে একটা হাত রেখে বললেন, খামোশ। এইটা তুমি কী কইলা? অন্য দল! অহন একটাই দল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা। এই কথাটা কি মানলা?
জি এই কথা তো মানিই। আমি তো লড়াই-সংগ্রামের মধ্যেই আছি। পুরা সিরাজগঞ্জ বলক দেওয়া ভাতের মতো ফুটতেছে। আমরা ন্যাপ কর্মীরা থানা লুট করে অস্ত্র আনছিলাম। আওয়ামী লীগ সব কেড়ে নিয়ে গেছে। তাতে কী! আমরা পাইপ কেটে অস্ত্র বানাইছি। আমার তো দল আছে। এখন মিটিং থেকে আপনার ডাকে আসলাম।
ভাসানী নদীর পানির দিকে একবার তাকালেন। একবার তাকালেন আকাশের দিকে। বললেন, আরও বড় কাজ আছে সাইফুল। প্রথমে দ্যাশটারে স্বাধীন করন লাগব। এর জইন্য লাখ লাখ গেরিলা লাগব। বিদেশি সমর্থন লাগব। দেশে দেশে চিঠি লেখন লাগব। দ্যাশ স্বাধীন হইলে আবার লড়াই করন লাগব সমাজতন্ত্রের লাইগা। সমাজতন্ত্র তো কেউ তোমারে চামুচে তুইলা মুখে পুরায় দিব না। আসো। নৌকায় ওঠো।
আপনি কী বলেন। আমার একটু প্রিপারেশন লাগবে না? আচ্ছা আমি বলে-কয়ে বিদায় নিয়ে আসি।
ঘণ্টাখানেক পরে সাইফুল একটা ছোট্ট ব্যাগ নিয়ে এলেন। নৌকায় উঠলেন। ছইয়ের ওই পারে মোরাদ।
উজানে ভাসাও মাঝি–আল্লাহর নামে রওনা দেও। ভাসানি নির্দেশ দিলেন। মাঝি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রেখেছিল নৌকা। বুক বরাবর খুঁটি ধরে টেনে তুলল নৌকার বুক থেকে। তারপর দড়ি ছাড়িয়ে বিসমিল্লাহ বলে যাত্রারম্ভ করল।
