ওসমানীর সঙ্গে কথা বললেন তাজউদ্দীন।
ওসমানী জানালেন, মেজরদের সঙ্গে তিনি বসেছিলেন। কীভাবে যুদ্ধ। পরিচালনা করা যাবে, তার পরিকল্পনা তিনি পেশ করলেন। দুই ডিভিশন সৈন্য দাঁড় করাবেন। তারপর ঢাকা অভিযানে যাবেন।
তাজউদ্দীন বললেন, আপাতত সেটা করা যাবে না। কারণ এটা জনযুদ্ধ। জনগণকে তার যুদ্ধ করতে দিতে হবে। মুক্তিবাহিনী গড়ে তুলুন। ট্রেনিং দিন। দেশের ভেতরে গেরিলা পাঠান। গেরিলাযুদ্ধ করে শত্রুদের ছিন্নভিন্ন করে ফেলুন। ভারতের গেরিলাযুদ্ধ বিশেষজ্ঞ জেনারেল নগেন্দ্র সিংয়ের সঙ্গে তাজউদ্দীন বসিয়ে দিলেন ওসমানীকে। সঙ্গে রইলেন আমীর।
এরপর এমপিদের সঙ্গে বৈঠক। প্রথমেই কথা পাড়লেন মোশতাক।আমার শরীর ভালো না। টি হোসেন ডাক্তার সাহেবকে জিজ্ঞেস করেন। আমি ক্লিনিকে ভর্তি ছিলাম। রেডিওতে শুনলাম সরকার হয়ে গেছে। তখন চলে আসতে বাধ্য হলাম।
.
ব্যাঙ্গমা ও ব্যাঙ্গমি বলাবলি করবে :
খন্দকার মোশতাক ২৫ মার্চের পর ঢাকার ধানমন্ডি ৫ নম্বর সড়কের সিটি নার্সিং হোমে একটা ক্লিনিকে ভর্তি হয়েছিলেন। সেটা ছিল ডা. টি হোসেনের ক্লিনিক। চিকিৎসা নিচ্ছিলেন তিনি। ১০ এপ্রিল তাজউদ্দীনের ভাষণ প্রচারিত হওয়ার পর ভারতের খবরে বলা হতে থাকে মন্ত্রিপরিষদের নাম। তাতে খন্দকার মোশতাকের নাম মন্ত্রী হিসেবে উচ্চারিত হওয়ায় তিনি প্রমাদ গোনেন। টি হোসেন তাঁকে গাড়িতে তুলে নিয়ে আগরতলার উদ্দেশে রওনা দেন।
.
মোশতাক বললেন, আমি মন্ত্রী হতে পারব না। শরীর ভালো না। বয়স হয়েছে। শেষ বয়সে এসে আমার এই আর এই ধকল সইবে না। তোমরা আমাকে টিকিট করে দাও। আমি মক্কা শরিফ চলে যাব।
আমীর ধরলেন ডা. টি হোসেনকে। আপনি মোশতাক ভাইকে রাজি করান।
টি হোসেন বললেন, মোশতাক সাহেব, এখন মন খারাপ করার সময় নয়। সরকার হয়েছে। এ তো ভালো কথা।
অনেকক্ষণ ঝিম মেরে থেকে মোশতাক বললেন, আমাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করলে তাহলে আমি রাজি।
তাজউদ্দীন বললেন, ঠিক আছে। উনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীই হবেন।
মনসুর আলী আছেন। মোশতাক আছেন। তাজউদ্দীন আছেন। আছেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল। পুরা ক্যাবিনেট আছে, কামারুজ্জামান ছাড়া। কামারুজ্জামান কলকাতায়। ক্যাপ্টেন মনসুর আলী হিলি দিয়ে ভারতে ঢোকেন, কামারুজ্জামান তার দুই দিন আগে একই পথে কলকাতা গেছেন। তার সঙ্গে কথা হয়েছে আগেই। কলকাতার সভায় তাজউদ্দীন আহমদের নেওয়া উদ্যোগকে সমর্থন করে ক্যাপ্টেন মনসুর আলী বক্তৃতা দিলে মনসুর আলীর কথাকেই কামারুজ্জামান নিজের কথা বলে সমর্থন দিয়েছেন।
চট্টগ্রাম থেকে আসা জহুর আহমেদ চৌধুরী মোনাজাত ধরলেন। আধা ঘণ্টার সেই মোনাজাতের ভাষা বড়ই মর্মস্পর্শী। হে আল্লাহ, আমাদের বাবা মা, ভাইবোন, স্ত্রী-পুত্র-পরিজন দেশ-মাটি সব ছেড়ে আমরা এখানে এসেছি। আমরা জানি না আমাদের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কেমন আছেন। হে আল্লাহ, আমরা যেন স্বাধীন দেশে আবার একসঙ্গে ফিরতে পারি। সেই তৌফিক আমাদের দিন।
উপস্থিত সবাই দরদর করে চোখের পানি ফেলতে লাগলেন।
৩১
মওলানা ভাসানী নৌকায় উঠলেন। মাঝি তিনজন। একজন মাঝি, দুজন মাল্লা। একজন কিশোর বয়সী। তার সামনের দাঁত দুটো বেরিয়ে থাকে। মনে হয়, সব সময় হাসছে। আরেকজন প্রবীণ। তবে তার চেহারা দেখলে বোঝা যায় না বয়স কত। পিঠ ধনুকের মতো বাঁকা। তৃতীয়জন মাঝবয়সী, তার চোখ বাদামি রঙের। গায়ের রং তিনজনেরই রোদে পোড়া। ওরা রোদে বসে নৌকা চালায়, হাল ধরে, দাঁড় টানে আবার নৌকা থেকে নেমে গুন টানে। তিনজনের পরনে লুঙ্গি। প্রবীণ মাঝির ঘাড়ে গামছা। গামছার আদি রং বোঝার কোনো উপায় নেই। নৌকাখানি মাঝারি আকারের। হাল আছে, পাল আছে। দাঁড় আছে, লগি আছে। বড় ছই আছে। নৌকার মধ্যে রান্নার ব্যবস্থা আছে। ঘুমানোর জায়গা আছে।
মওলানা ভাসানীর গায়ে একটা গেঞ্জি। পরনে পাঞ্জাবি। মুখে উদ্বেগের চিহ্ন, চোখে আগুন এবং অশ্রু।
১৯৭১ সালের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের একটা দিন। চৈত্রের বিকেলে রোদের রংটা সেদিন ছিল হলুদ, হলুদ আলো ধানকাটা হয়ে যাওয়া বিস্তীর্ণ মাঠে একটা বিশাল আলোয়ানের মতো পড়ে আছে। খালের পাশে কাশবন। কোনো খেতে কেবল পাট লাগানো হয়েছে। ছোট ছোট পাটগাছ। ধঞ্চের বড় বড় গাছও আছে। কোনো কোনো খেতে আউশ ধানের ছোট্ট চারা। তিনি নৌকায় উঠেছেন। মাঝি নৌকা ভাসিয়ে দিল। জোরে জোরে বইঠা বাইতে লাগল, লগি ঠেলতে লাগল। একটু পরে বাতাস অনুকূল হওয়ায় পাল তুলে দিল।
মওলানা ভাসানী একটু আগে ছিলেন বিন্যাফৈরে। এটা তার সন্তোষের বাড়ি থেকে মাইল দুয়েক দূরে। পাকিস্তানি সৈন্যরা ২৫ মার্চের পর টাঙ্গাইল এলাকায় প্রচণ্ড প্রতিরোধের মুখে পড়ে। দেশের বহু জেলা-মহকুমার মতো টাঙ্গাইল ছিল সংগ্রাম পরিষদের দখলে। হাজার হাজার মানুষ দা-কুড়াল, লগি-বইঠা, কাস্তে-শাবল, কোদাল-বাঁক, সড়কি-বল্লম, দেশি বন্দুক, এয়ারগান, বাড়িতে বানানো হাতবোমা, স্কুলের রসায়নাগারে বানানো বাল্বের মধ্যে অ্যাসিড রাখা বোমা, বাংলাদেশের পতাকা ইত্যাদি নিয়ে দখল করে রাখে। সার্কিট হাউসে পাকিস্তানি সৈন্য ছিল, সেই একটা জায়গায় উড়ছিল পাকিস্তানের পতাকা। বাকি সব ঘরে, দোকানে, অফিসে উড়ছে বাংলাদেশের লাল-সবুজ-হলুদ পতাকা। মার্চের শুরু থেকেই ছাত্রলীগের নির্দেশে জয় বাংলা বাহিনী গঠন করে আনসারদের কাছ থেকে অস্ত্র এনে ট্রেনিং দেওয়া হয়েছিল। ২৫ মার্চের পর আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, আনোয়ার-উল আলম শহীদ, কাদের সিদ্দিকী এবং আওয়ামী লীগ যুব লীগ সংগ্রাম পরিষদ সাকিট হাউসের মিলিটারি পোস্টে আক্রমণ করে। পরে জানা যায়, ভেতরের সৈন্যরা বাঙালি, তাদের মাইকযোগে জনতার সঙ্গে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হলে তারা সেই আহ্বানে সাড়া দেয় এবং বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্যের শপথ নেয়। মেজর সফিউল্লাহর নেতৃত্বে বিদ্রোহী ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা ময়মনসিংহ থেকে পিছিয়ে এসে টাঙ্গাইলের জয় বাংলা বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয়।
