এ অবস্থায় সবার আগে ঠান্ডা মাথায় কথা বলতে উঠে দাঁড়ালেন ক্যাপ্টেন মনসুর আলী। তিনি বললেন, আমরা একটা যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে আছি। আমরা অন্য একটা দেশে এসেছি। আমাদের একজনই নেতা। তিনি বঙ্গবন্ধু। তাঁকে পাকিস্তানি সৈন্যরা ধরে নিয়ে গেছে। তিনি কোথায় আছেন, কেমন আছেন আমরা জানি না। তিনিই আমাদের সর্বাধিনায়ক। তিনিই। প্রেসিডেন্ট। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী কে হলো না হলো তা নিয়ে নিজেরা বিবাদ করলে আমরা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করব। লক্ষ শহীদের অবমাননা করব। এর চেয়ে যা হয়েছে, তা আমরা মেনে নিই। দেশ শত্রুমুক্ত করি। বঙ্গবন্ধুকে ফিরিয়ে আনি। কামারুজ্জামান তাঁকে সমর্থন দিলেন। যুব নেতারাও নরম হলেন। তাঁরা রাজি হলেন তাজউদ্দীনের সঙ্গে বেরিয়ে পড়বেন সীমান্তে সীমান্তে।
.
শিলিগুড়ির বাংলোয় তখন সন্ধ্যা। অনেক গাছপালাঘেরা বাংলোটা একটা টিলার ওপরে। শেখ ফজলুল হক মণি আর তাজউদ্দীন একটা ঘরে। ঘরের দেয়ালের দুই দিকে দুইটা গোল বাল্ব হলুদ আলো দিচ্ছে। মাথার ওপরে একটা ফ্যান ঘুরছে।
মণি বললেন, মামা, আপনার রেডিওর বক্তৃতাটা থামান।
তাজউদ্দীন বললেন, বক্তৃতার কপি আমার কাছে আছে। তুমি দেখে দিতে পার।
মণি বললেন, আপনার ভাষণ ভালো হবে। এতে আমার কোনো সন্দেহ নাই। আপনি তো ড্রাফট কম করেন নাই। মামার বহু বিবৃতি আপনার লেখা। সমস্যা হলো, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সভা না ডেকে, বিশেষ করে সৈয়দ নজরুল ইসলাম মামার মত না নিয়ে আপনি তো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আপনার পরিচয় প্রকাশ করতে পারেন না। নজরুল মামা তো ডেপুটি লিডার। বঙ্গবন্ধু লিডার।
তাজউদ্দীন লাল হয়ে গেলেন। হলুদ আলোয় তাঁর রক্তিম গণ্ডদ্বয় খয়েরি দেখা গেল।
তিনি বললেন, আচ্ছা, আমি বলছি গোলোক মজুমদারকে। ভাষণ থামাতে।
গোলোক মজুমদার এরই মধ্যে টেপ নিয়ে চলে গেছেন।
আমীর তাঁকে ফোন করলেন। টেপ কোথায়?
যেখানে যাওয়ার সেখানে গেছে।
এটা থামাতে হবে।
কেন।
সবার সঙ্গে কথা না বলে তো তাজউদ্দীন ভাই নিজেকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিতে পারেন না।
শোনেন। আপনার দেশের মানুষ আপনাদের সরকার গঠনের সংবাদের জন্য কান পেতে আছে। মুক্তিযোদ্ধা মিলিটারিরা সরকার গঠন ছাড়া আস্থা পাচ্ছে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরাজিকে আপনারা জানিয়েছেন। তাজউদ্দীনই সেকেন্ড ইন কমান্ড। এখন আপনাদের রাজনৈতিক দলাদলি তো আমি সৈনিক বুঝব না। আমি আমার সরকারের কথামতো চলব। আমি ভাষণ প্রচার করে দেব। তাতে আপনাদের দলাদলি নিজে নিজেই থেমে যাবে।
আচ্ছা, আমি আমার অনুরোধ আপনাকে রাখলাম। আপনি এবার বুঝুন কী করতে হবে।
আমীর এলেন মণি-তাজউদ্দীনের কাছে। বললেন, টেপ চলে গেছে। গোলোক মজুমদার ফেরানোর চেষ্টা করবেন। দেখা যাক।
রাতের খাবার ভালো। তিস্তা নদীর বড় মাছ। ভাত, ডাল। সবজি। তারা খেতে বসলেন। তাজউদ্দীন এরই মধ্যে ঠিক করেছেন, দেশ স্বাধীন করবেন বলে পরাশ্রিত থেকে তিনি বিলাসী জীবন যাপন করবেন না। তিনি কৃচ্ছ সাধনা করবেন। তিনি স্বল্পাহারী হবেন।
খেতে বসেছেন তিনজন। মণি, আমীর, তাজউদ্দীন। মনসুর আলীর জ্বর। তিনি শুয়ে পড়েছেন। তোফায়েল আহমেদেরও জ্বর। তিনি চলে গেছেন কলকাতা।
খাওয়া ভালোই চলছে।
এমন সময় শিলিগুড়ি বেতার থেকে ঘোষণা এল : এবার গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বেতার ভাষণ প্রচার করা হবে। কণ্ঠস্বর আমীর-উল ইসলামের। দিল্লির গেস্টহাউসে বেতারকর্মীরা আমীরের কাছ থেকে এ ঘোষণাটাও রেকর্ড করে নিয়েছিল।
রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে তাজউদ্দীনের ভাষণ বাজছে। কেউ কোনো কথা বলছেন না।
পরের দিন তাজউদ্দীনরা আবার সেই ডাকোটা প্লেনে। প্লেন থামল একটা ছোট্ট বিমানঘাঁটিতে। সেখান থেকে তাঁরা গাড়িতে এলেন তুড়া পাহাড়ে। গাড়ি থেকে নামলেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম, আবদুল মান্নান বেরিয়ে এলেন। বারান্দায়। পরস্পরকে জড়িয়ে ধরলেন তাঁরা। সে এক অপূর্ব দৃশ্য।
সৈয়দ নজরুল জানালেন ২৫ মার্চের পর তিনি কীভাবে পালিয়ে চলে আসেন ময়মনসিংহ। তাঁকে নারীর ছদ্মবেশ নিতে হয়েছিল। তিনি পরচুলা পরেছিলেন। সালোয়ার-কামিজ পরেছিলেন। তারপর একটা বোরকা পরে উঠেছিলেন গাড়িতে। ঢাকা থেকে প্রথমে যান ময়মনসিংহ। সেখান থেকে হাঁটাপথে গারো পাহাড় পেরিয়ে এসে পৌঁছেছেন এখানে।
সৈয়দ নজরুল ইসলামকে সব খুলে বললেন তাজউদ্দীন। জানালেন, সরকার হবে রাষ্ট্রপতিশাসিত। সব ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে আপনিই ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি। সৈয়দ নজরুল ইসলাম মানুষ হিসেবে সজ্জন, রাজনীতিবিদ হিসেবে ঝানু। তিনি বললেন, মুজিব ভাই আমেরিকান কনসাল জেনারেলের সামনে বলেছেন, আমার অবর্তমানে সৈয়দ নজরুলই আওয়ামী লীগের সেকেন্ডম্যান। কাজেই ঘটনা ঠিক আছে। আমার পর বঙ্গবন্ধুর সেক্রেটারি তো তাজউদ্দীনই। কোনো অসুবিধা নাই। লেটস মুভ ফরোয়ার্ড।
তাঁরা গেলেন আগরতলা। একই প্লেনে। প্লেন থেকে নেমে সোজা একটা। সরকারি গেস্টহাউসে। সেখানে একটা বড় সভাকক্ষে আওয়ামী লীগ নেতারা অপেক্ষা করছিলেন। চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লা এলাকার নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ছিলেন। কর্নেল ওসমানী, এম আর সিদ্দিকী আছেন। আর আছেন খন্দকার মোশতাক আহমদ।
