রেনু বললেন, ওয়াজেদও তো শুকায়া গেছ। কী বলব? আমাদেরই থাকার ঠিক নাই। এই বাড়ি এক রাত, ওই ঘর এক রাত। বিছানা নাই, বালিশ নাই, চাদর বিছায়া ঘুম। জামাল আর আবদুল তো ছাদেও ঘুমাত।
হাসিনা বললেন, আমরা তো তবু আছি। আব্বা… রেনু বললেন, তোর আব্বা তো আজকেই প্রথম জেলে যাচ্ছে না।
ওয়াজেদ বললেন, এবারের পরিস্থিতি আর আগের পরিস্থিতি তো এক নয়। এবার তো যুদ্ধ।
রেনু বললেন, আগরতলা মামলার সময়ও তো ফাঁসিই হয়ে যেত। তবু জানা গেছল কোথায় আছে। এবার তো কোনো খবর নাই…আল্লাহকে শুধু ডাকি, আল্লাহকে বিচার দেই…ওয়াজেদ তুমি হাত-পা ধুয়ে নাও, আমি খাবার দিচ্ছি। এইভাবেই হাতে নিয়ে খেতে হবে…
ওয়াজেদ বাথরুমে গেলেন। হাসিনা উঠে মাকে জড়িয়ে ধরলেন। মা, আমি তোমাকে মিস করেছি মা। তোমাদের ছেড়ে বিদেশে ছিলাম। কিন্তু…
রেনু বললেন, নিজে মা হওয়ার আগে মেয়েরা নিজের মাকে পাশে পেতে চায় মা। আমি জানি…, তিনি হাসিনার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। তারপর বললেন, যাই, ওয়াজেদের প্লেটে খাবার বেড়ে দেই…
খাটটা হাসু আপাকে দেওয়া হলো। দুলাভাই মাঝেমধ্যে এই বাসায়। থাকেন, মাঝেমধ্যে আগের আশ্রয়ে যান।
জামাল ভাই বাড়ি থেকে বের হওয়া শুরু করেছেন। কারফিউ এখন। দিনের বেলা আর দেওয়া হয় না। জামাল ভাইয়ের পেছনে পেছনে তার পোষা কুকুর দুটো টমি আর টিকলি এসে হাজির হলো এই বাসায়। বাইরে কুকুরের ডাক শুনে রেহানা বেরোলেন বারান্দায়, উঁকি দিয়ে দেখলেন গেটের বাইরে টমি আর টিকলি। তিনি জামালকে ডাকতে লাগলেন, জামাল ভাই, জামাল ভাই। দেখে যাও, কারা এসেছে!
জামাল, ১৭ বছরের কিশোর, ছুটে বেরিয়ে এলেন। টমি টিকলি…কীভাবে বাসা চিনলি… জামাল বাইরে গিয়ে টমি-টিকলির মাথায় হাত বোলাতে লাগলেন।
ছুটে এল সেলিম ওরফে আবদুল। জামালের সমবয়সী। টমিকে গেটের ভেতরে এনে আদর করতে লাগলেন জামাল। আবদুলকে বললেন, আবদুল, টোস্ট বিস্কিট আন। আর দ্যাখ তো, একটু গোশতটোশত পাস কি না! রোজি এলেন। বললেন, জামাল ভাই, তোমার টমি কিন্তু আমাদের কলাবাগানের বাসায় গিয়ে দুপুরে খেয়ে আসত!
জামাল বললেন, অবাক কাণ্ড। আমি তো ৩২ নম্বরের বাড়ির সামনে যাই নাই। টমি আমার গন্ধ পেল কীভাবে? আমি তো রিকশায় এসেছি ৩৩ নম্বর থেকে। ওখান থেকে আমার গন্ধ পেয়ে পেছনে পেছনে চলে এসেছে!
কিন্তু এই বাড়িতে কুকুর রাখার জায়গা কই! ৩২ নম্বরে তো জায়গা ছিল। এটা একেবারে রাস্তাঘেঁষা বাড়ি। ঘর থেকে বের হলেই বাউন্ডারি হাফওয়াল। গেট পেরোলে রাস্তা।
রেনু বললেন, আবদুল, যা, টমি-টিকলিকে বস্তায় ভরে আবার ৩২ নম্বরের কাছে গিয়ে ছেড়ে দিয়ে আয়!
রেহানা সেই কথা মনে করে এখন মন খারাপ করছেন। খুব মন খারাপ। কিন্তু কান্না চলবে না। তিনি হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির পানি হাতে নিলেন। হাতটা ভিজে উঠলে ভেজা হাত দিয়ে মুখ মুছলেন। আব্বা কোথায় তারা জানেন না। কামাল ভাই বাড়ি যাবেন বলে বেরিয়ে গেছেন, কোথায় গেছেন, কেমন আছেন, কোনো খবর নেই। ৩২ নম্বরে ২৫ মার্চের রাতে হাজি মোরশেদ চাচাকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে অজ্ঞান করে তুলে নিয়ে গেল, লোকটা বেঁচে আছে কি মারা গেছে, কে বলতে পারে। রাস্তায় রাস্তায় লাশ পড়ে থাকে। মেয়েদের ধরে নিয়ে যাওয়ার করুণ কাহিনি সব শোনা যায়। এর মধ্যে এই কুকুর দুটোকে বস্তায় ভরে নিয়ে যাওয়া হলো বলে কোনো ১৪ বছরের মেয়ে কাঁদতে পারে! না, আমার চোখের নিচে অশ্রু নয়, এ হলো বৃষ্টির পানি! রেহানা বিড়বিড় করলেন।
এর মধ্যে একদিন মিছিল বেরোল। নারায়ে তকবির আল্লাহু আকবর। শান্তি মিছিল। জেনারেল রাও ফরমান আলী, পাকিস্তানের বেসামরিক প্রশাসনের দায়িত্ব যার ওপর, তিনি শান্তি কমিটি করে দিয়েছেন। জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম, মুসলিম লীগের লোকেরা শান্তি কমিটির নেতা। শান্তি মিছিল হচ্ছে। অথচ রোজ মানুষ মারছে পাকিস্তানিরা। এপ্রিলের শুরুতে জিঞ্জিরায় রক্তগঙ্গা তারা বইয়ে দিয়েছে। সেসব খবর কিছু কিছু করে পাওয়া যায়।
রেহানা দাঁড়িয়ে আছেন রাস্তার বিপরীত দিকের জানালায়। রাস্তার দিকে যাওয়া তাঁর বারণ। কামাল ভাই বলে গেছেন, মরে যাবি, তবু পাকিস্তানিদের হাতে ধরা দিবি না। মেয়েদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে, অত্যাচার করছে–এই খবর। চাপা থাকছে না।
একদিন সকাল সকাল ঘুম ভেঙে গেছে রেহানার।
রাসেল এসে তার পাশে দাঁড়াল। দেনাপু, চলো, আব্বার বাড়ি যাই।
আব্বার বাড়ি মানে জেলখানা। আব্বাকে ধরে নিয়ে গেছে। কিন্তু কোথায় রেখেছে, তারা কিছুই জানেন না। শুধু আবদুর রহমান রমার কাছ থেকে এতটুকুন জানা গেছে, আব্বা বেঁচে ছিলেন। তাঁকে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট স্কুলের ভেতরে রেখেছিল।
এসো, বাইরে কাক ডাকছে। কাক দেখি।
তাকে নিয়ে বাড়ির সামনের দিকটাতে এলেন রেহানা।
খবরের কাগজের হকার কাগজ হাতে হাঁটছে। সে হাঁকছে : শেখ মুজিবের খবর। শেখ মুজিবের খবর।
সব ভুলে ছুটে গেলেন ১৪ বছরের রেহানা। হকারের কাছ থেকে কাগজটা কেড়ে নিয়ে বাড়ির ভেতরে এসে মাকে বলতে লাগলেন, মা, মা, পয়সা দাও। আব্বার খবর।
মা পয়সা বের করে দিলেন। রেহানা হকারকে দাম দিয়ে দ্রুত গেট বন্ধ করে দিলেন।
