নিয়াজি তার দায়িত্ব বুঝে নিলেন। এই ছোটখাটো কালো বাঙালিকে দমন করতে কেন বেগ পেতে হচ্ছে, এই নিয়ে তার মনে অনেক ক্ষোভ। তাঁর কোমরে একটা পিস্তল গোঁজা। অপারেশন রুমে সবাই সমবেত হয়েছে। টিক্কা খানও আছেন।
নিয়াজি ঢুকেই বললেন, মেয় এই হারামজাদি কৌম কি নাসাল বদল দুঙ্গা। ইয়ে মুঝে কিয়া সমঝতে হায়! (আমি এই বেজন্মা জাতির চেহারা বদলে দেব। ওরা আমাকে কী ভেবেছে!) আমি আমার সৈন্যদের ছেড়ে দেব এদের নারীদের ওপরে। তারা সন্তান উৎপাদন করবে। পরের প্রজন্ম নতুন চেহারার নতুন জাতি হিসেবে গড়ে উঠবে।
এর পরের দিন মেজর জেনারেল খাদিম রাজার সঙ্গে নিয়াজি যুদ্ধক্ষেত্রের অবস্থান নিয়ে আলাপ করতে লাগলেন। খাদিম তাঁকে বিশদ বর্ণনা দিচ্ছেন, এই সময় নিয়াজি বলে উঠলেন, ইয়ার, লড়াই কি ফিকর নাহি করো, ওঁ তো হাম কার লেঙ্গে। আভি তো মুঝে বেঙ্গলি গার্লফ্রেন্ডস কা ফোন নম্বর দো। বন্ধু, যুদ্ধ নিয়ে চিন্তা কোরো না, সে আমি সামলাব, তুমি তোমার বাঙালি। বান্ধবীদের ফোন নম্বর দাও।
খাদিম রাজা তার পরের দিন ঢাকা ছেড়ে পাকিস্তানে চলে গেলেন।
আকাশে উড়তে উড়তে তিনি শেষবারের মতো জলমগ্ন পূর্ব পাকিস্তানের দিকে তাকালেন। পূর্ব পাকিস্তান। তোমাকে নিয়াজির হাতে রেখে এলাম। লাহোরের গুলবাগে একটা পতিতালয় আছে। নাম সিনোরিটা হোম। সেখানে যৌনকর্মীরা থাকে। সেটা চালান মিসেস সায়িদা বুখারি। জেনারেল নিয়াজির বান্ধবী তিনি। নিয়াজি লাহোরের জিওসি ও কোর কমান্ডার থাকার সময় যে টাকাপয়সা খেতেন, যে উৎকোচ গ্রহণ করতেন, সায়িদা তা গ্রহণ করতেন। নিয়াজির পক্ষ থেকে।
নিয়াজি ঢাকায় এসে পানের চোরাচালান শুরু করলেন। ঢাকা থেকে পান যেত সায়িদার কাছে।
নিয়াজি ঢাকার সেনানিবাসে তাঁর বাড়িটিতে নিয়মিত আসর বসান বাইজি নাচের। বাইজিরা আসে। জেনারেলরা আসেন। আসর জমে ওঠে মধ্যরাতে। এই যৌনকর্মীরা নিয়াজির তিন তারকাখচিত পতাকাওয়ালা গাড়িতে আসা যাওয়া করে।
যখন বলা হলো, পাকিস্তানি সৈন্যরা ঠিকমতো খেতে পাচ্ছে না, লঙ্গরখানায় ঠিকভাবে খাবার যাচ্ছে না, নিয়াজি বললেন, এ কী কথা, পূর্ব পাকিস্তানের মাঠে কি কোনো গরু চরছে না, গোয়ালে কোনো গরু-ছাগল নেই, মানুষের গোলায় কি ধান-গম নেই?
যখন এই অভিযোগ উঠল যে পাকিস্তানি সৈন্যরা ব্যাপকভাবে ধর্ষণ করছে। অধিকৃত বাংলায়, তখন নিয়াজি বললেন, একজন সৈন্য থাকবে পূর্ব পাকিস্তানে, লড়াই করবে, মারা যাবে এবং সেক্স করতে যাবে ঝিলম–এটা তো আপনি আশা করতে পারেন না।
পাকিস্তানে হামুদুর রহমান কমিশনে লে. কর্নেল আজিজ খান এক বছর পরেই এই সাক্ষ্য দিয়ে বলবেন, যখন কমান্ডার নিজেই একজন ধর্ষক, তখন তাঁর অধীন সৈন্যরা কী করবেন, তা বলে দেবার অপেক্ষা রাখে না।
২৯
মগবাজারের বাড়িতে নিচতলায় জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন রেহানা। বাইরে ঝিরঝিরিয়ে বৃষ্টি হচ্ছে। বাঁ দিকে একটা মাধবীলতার ঝাড়। বৃষ্টির ফোঁটায় গাছের পাতাগুলো একবার ডানে একবার বাঁয়ে মাথা নাড়ছে। একটা কুকুর ওই ও বাড়ির সানশেড ঘেঁষে শুয়ে বৃষ্টির ছাট থেকে গা বাঁচানোর চেষ্টা করল। একবার চারপায়ে দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভেঙে গা-মাথা-লেজ নেড়ে গায়ের পানি ঝাড়ল।
বদরুন্নেছা ফুফুদের বাড়ি এটা। এই বাড়িতে থাকার একট সুবিধা হলো, ভাড়া লাগবে না। ঘরে আসবাবপত্র নেই, মেঝেতে চাদর বিছিয়ে তারা ঘুমান।
বাড়ির পেছনে বদরুন ফুফুর মামা থাকেন। খুব ফরসা, খুব লম্বা একজন মানুষ। দেখলে মনে হবে জিন। তো জিন দাদা একদিন এই বাড়িতে উঁকি দিয়ে দেখলেন, বাড়িতে কোনো ফার্নিচার নেই। তিনি দুটো চেয়ার, একটা টেবিল, একটা খাট পাঠিয়ে দিলেন।
ভালোই বাড়িটা। বড়সড়ই আছে। তবে অসুবিধা একটাই। ১ নম্বর আউটার সার্কুলার রোডের এই বাড়ি একেবারেই সদর রাস্তার ওপরে। রাস্তা দিয়ে মিলিটারি গাড়ি যায়। দেখামাত্র বুকটা ধপাস করে ওঠে।
.
হাসু আপাও এখন এই বাড়িতে।
একদিন বাইরে গাড়ি দাঁড়ানোর শব্দ। কে এল, দেখ তো আবদুল।
রেহানাই দৌড়ে গেলেন গেটের দিকে।
চেঁচিয়ে বললেন, মা মা, আপা এসেছে। দুলাভাই এসেছে।
রেহানা গেট খুলে বাইরে গিয়ে গাড়ির দরজা খুললেন। আপা বের হলেন। আপার হাত ধরে রেহানা তাকে ঘরে নিয়ে এলেন। দুলাভাই এলেন। পেছনে পেছনে। আবদুল গিয়ে জিনিসপাতি নামাতে লাগল। জিনিসপাতিও তো বেশি কিছু নয়। ৩২ নম্বর থেকে বেরোনোর সময় বেশি কিছু তো তারা সঙ্গে নিয়ে বেরোতে পারেননি।
শাশুড়িকে কদমবুসি করলেন ওয়াজেদ মিয়া।
রেনু বললেন, আসো বাবা, বসো। বসতে যে দিব সোফা তো নাই। দুইটা চেয়ার আছে, দুইজন বসো।
হাসিনার দিকে তাকিয়ে বললেন, হাসুর মুখটা ছোট হয়ে গেছে। এইভাবে কি আর হয়? এই সময় দরকার রেস্ট। দরকার একটু ভালো খাওয়াদাওয়া। মনটা রাখতে হয় ভালো। আর এর মধ্যে আল্লার গজব নেমে এসেছে। কোথায় ছিলি, কেমন ছিলি! আমার কী যে চিন্তা হতো!
হাসিনা বললেন, মা, আমি তোমাদের চিন্তাই করতাম। রাসেল সোনার চিন্তা করতাম। আব্বাকে নিয়ে তো চিন্তার শেষ নাই-ই। রাসেল, কাছে। আসো। শার্ট খেয়ো না। আসো। তোমার জন্য চকলেট এনেছি তো!
ওয়াজেদ মিয়া বসলেন একটা চেয়ারে। হাসিনা আরেকটা চেয়ারে।
