জনপদের পর জনপদে পড়ে আছে পোড়া ছাই।
ঢাকার আমেরিকান কনস্যুলেটে কর্মরত আমেরিকান কর্তাদের বাড়িতে বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে ভীতসন্ত্রস্ত বাঙালি কর্মচারীদের পরিবার।
আর আমেরিকান সরকার পক্ষ নিচ্ছে ইয়াহিয়া খানের। আমেরিকান অস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে নিরীহ মানুষ হত্যায়। নির্বাচিত গণহত্যায়।
তার অনুলিপি যাচ্ছে ইসলামাবাদে, দিল্লিতে, কলকাতায়, আমেরিকান কূটনৈতিক মিশনগুলোতে। কিন্তু নিক্সন ও কিসিঞ্জারের এক কথা–আমরা আছি আমাদের বন্ধু ইয়াহিয়ার পাশে। তিনি খুব ভালো মানুষ।
ক্ষোভে-দুঃখে নিজের হাত কামড়াচ্ছেন ঢাকার আমেরিকানরা। এর মধ্যে ইউএসএআইডির মিশন পরিচালকও আছেন।
তারা সমবেত হলেন এবং বললেন, মানবতার ওপর এই আঘাত আমরা চুপচাপ মেনে নিতে পারি না। আমাদের কি বিবেক বলে কিছু নেই?
তারা, ২০ জন আমেরিকান, তাঁদের মধ্যে আছেন ইউএসআইএসের প্রধান, আছেন এইডের প্রধান, আর্চার কে ব্লাডের ডেপুটি, আছেন অর্থনীতি কনস্যুলার ও প্রশাসনের প্রধানেরা, একসঙ্গে বসে একটা বিবৃতি তৈরি করলেন।
নিক্সন সরকার ভিয়েতনাম বিপর্যয়ের পর একটা নতুন নিয়ম চালু করেছে। আমেরিকান সরকার যদি কোনো ভুল নীতি গ্রহণ করে, কোনো সরকারি কর্মকর্তার যদি মনে হয় এটা ভুল, তাহলে সে তার আপত্তি জানাতে পারবে। ডিসেন্ট চ্যানেল বা ভিন্নমত প্রকাশের একটা চ্যানেল খোলা হয়েছে। এই ২০ অফিসার ঠিক করলেন, তারা ভিন্নমত প্রকাশ করবেন। পূর্ব পাকিস্তানের ব্যাপারে আমেরিকান সরকার বড় ভুল করছে, অন্যায় করছে, তারা তার প্রতিবাদ না করে থাকতেই পারেন না।
তারা একটা বিবৃতি মুসাবিদা করলেন।
২০ জন মার্কিন কর্মকর্তা স্বাক্ষরিত ওই টেলিগ্রাম ডিসেন্ট ফ্রম ইউএস পলিসি টুওয়ার্ড ইস্ট পাকিস্তান : জয়েন্ট স্টেট/এইড/ইউএসআইএস মেসেজ।
তাঁরা বললেন, আমেরিকার সরকার গণতন্ত্রকে দলিত-মথিত করার ঘটনাকে নিন্দা জানাতে ব্যর্থ হয়েছে।
তাঁরা বললেন, তাঁদের সরকার ব্যর্থ হয়েছে নৃশংসতার নিন্দা করতে।
তাঁরা বললেন, তাঁদের সরকার গণহত্যাকে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনা বলে গণ্য করছে। এবং নিপীড়নকারীদের সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। এটা চরম দেউলেপনা। এখানকার বেসরকারি আমেরিকানরা আমেরিকান সরকারের ওপর চরম বিরক্ত। আমরা আমাদের ভিন্নমত প্রকাশ করছি।
আর্চার ব্লাড সেই বিবৃতিকে সমর্থন করে নিজের কথাও লিখলেন।
এবং এ কথাও লিখলেন যে, বাঙালিদের এই লড়াইয়ের ফল হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। পরাজিতদের পক্ষ নেওয়া হবে চরম বোকামি।
আর্চার ব্লাড জানেন, এটার প্রতিক্রিয়া তার চাকরিজীবনের জন্য ভালো হবে না। কিন্তু একটা সময় আসে, যখন মানুষকে জীবিকার চেয়ে বিবেকের দিকেই বেশি তাকাতে হয়।
তিনি টেলিগ্রামটা পাঠিয়ে দিলেন ওয়াশিংটনে, পাকিস্তানের আমেরিকান দূতাবাসে এবং দিল্লিতে।
সচেতনভাবে এটাকে কম গোপনীয় হিসেবে দেখানো হয়। নিক্সন আর হেনরি কিসিঞ্জার খুব খেপে গেলেন। এটা এখন সংবাদমাধ্যমে চলে যাবে, আর চলে যাবে কেনেডিদের কাছে, এই ছিল তাঁর রাগের কারণ।
তারা আর্চার ব্লাডকে পাগল বলে গালিগালাজ করতে লাগলেন।
কিন্তু এই টেলিগ্রামও নিক্সন ও কিসিঞ্জারকে তাঁদের ইয়াহিয়াপ্রীতি থেকে নড়াতে পারল না।
প্রেম কি তাতে কমে? বরং আরও বেড়েই গেল।
২৮
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল হামিদ খান ডেকে পাঠিয়েছেন লে. জে. এ কে নিয়াজিকে।
তোমাকে ইস্টার্ন কমান্ডের দায়িত্ব নিতে হবে।
স্যার।
টিক্কা খান তো পারছে না। তুমি গিয়ে দায়িত্ব নাও। টিক্কা খানকে গভর্নর করে দেব।
স্যার।
তোমার কোনো প্রশ্ন আছে?
জি না স্যার। আপনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন। এটা মান্য করাই সৈনিক হিসেবে আমার কাজ, স্যার।
নিয়াজি নিজেকে বলতেন টাইগার নিয়াজি। জেনারেল হামিদের কথায় তিনি নির্দ্বিধায় রাজি হয়ে গেলেন। অথচ এর আগে দুজন জেনারেলকে এই হুকুম দিয়েছেন হামিদ, দুজনেই নানা অজুহাত দেখিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে যাওয়ার আদেশ অমান্য করেছেন।
নিয়াজি ঢাকা গেলেন। টিক্কা খান প্রদেশের সেনাপ্রধানের বাড়ি ছাড়তে চান না। গুল হাসানকে দিয়ে তিনি টিক্কা খানকে রাজি করালেন গভর্নর হাউসে উঠতে।
মেজর জেনারেল মিঠঠা ছিলেন টিক্কার সহযোগী। তিনি হেডকোয়ার্টার্সে চিঠি লিখেছিলেন :
এ অপারেশন এখন রূপ নিয়েছে একটি গৃহযুদ্ধে। দূরে যাওয়া যায় না, রেলগাড়িও ব্যবহার করা সম্ভব নয়। কোনো ফেরি অথবা নৌকা পাওয়া যাচ্ছে না। সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে চলাচলই এখন প্রধান বাধা। এ অবস্থা আরও কিছুদিন চলবে। সশস্ত্র বাহিনীকে নিজেদের বাহনেই চলতে পারতে হবে। আমি প্রস্তাব করছি : ১. চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য নেভির পোর্ট অপারেটিং ব্যাটালিয়ন ২. আর্মি, নেভি বা ইঞ্জিনিয়ার রিভার ট্রান্সপোর্ট ব্যাটালিয়ন। তিন. নেভির কার্গো ও ট্যাংকার ফ্লোটিলা। রসদ ও সৈন্য চলাচলের জন্য আরও হেলিকপ্টার অপরিহার্য।
এর কিছুই তারা পায়নি।
নিয়াজির মনে হলো, পুরো পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তানি সৈন্যদের জন্য একটা মৃত্যুফাঁদ। তারা ক্যান্টনমেন্টে বন্দী অবস্থায় থাকে। অনেকে মিলে পূর্ণ প্রস্তুতি ছাড়া বাইরে যেতে পারে না। বাইরে বেরোনো মানেই মৃত্যু। পুরোটা দেশ বেদখল হয়ে আছে, ক্যান্টনমেন্টগুলো ছাড়া। আর সীমান্ত বলতে তো কিছুই নেই।
