দিল্লিতেই, বিএসএফের বাড়িতে, রেডিওর রেকর্ডার এল। তাজউদ্দীনের ভাষণ রেকর্ড করা হবে।
তাজউদ্দীন দুদিন ধরে বক্তৃতাটা তৈরি করেছেন। রেহমান সোবহান, আমীর, আনিসুর রহমানকে বারবার পড়িয়েছেন। রেহমান সোবহানের মনে হলো, ফাইনালি স্পিচটা এক্সিলেন্ট হয়েছে।
তাজউদ্দীন আহমদ রেকর্ডারের সামনে বসেছেন। তার সামনে বসে আছেন আকাশবাণীর একজন নারী কর্মী। তাজউদ্দীন এক গেলাস পানি খেয়ে নিলেন।
রেহমান সোবহান, আমীর, আনিস তাঁকে চোখের ইশারায় উৎসাহিত করছেন।
তাজউদ্দীন বললেন, আমি চিরটাকাল ড্রাফট করেছি। মাইক্রোফোনের সামনে গেছেন মুজিব ভাই। মুজিব ভাই থাকলে…
রেহমান সোবহান বললেন, আমি আপনার জনসভাতেও গেছি। আপনার এলাকায় আপনার ভাষণ শুনেছি। ইউ আর আ ভেরি গুড অরাটর। দেখে লিখিত ভাষণ পড়বেন। আরম্ভ করুন।
তাজউদ্দীন আরেক গেলাস পানি খেলেন। তাঁর মনে পড়ল, সত্তরের নির্বাচনের আগে মুজিব ভাই টেলিভিশন রেডিওতে ভাষণ দিয়েছিলেন।
তিনি বললেন, স্বাধীন বাংলাদেশের বীর ভাইবোনেরা।
স্বাধীন। বাংলাদেশ। বীর। বলার সঙ্গে সঙ্গে তার শরীর রোমাঞ্চিত হলো, চিবুক শক্ত হচ্ছে। বুক ফুলে উঠছে। তিনি কোত্থেকে এই পৃথিবীর সমান সাহস আর বিশ্বাস নিজের বুকের মধ্যে যেন ধারণ করে উঠতে পারলেন–
সাড়ে সাত কোটি মুক্তিপাগল গণমানুষের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর সরকারের পক্ষ থেকে আমি আপনাদের আমার সংগ্রামী অভিনন্দন জানাচ্ছি।
বঙ্গবন্ধুর নাম নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কণ্ঠস্বর বিপুল সমুদ্রের কল্লোলকে যেন ধারণ করে উঠল।
তিনি বলতে লাগলেন, ২৫ মার্চ ইয়াহিয়া খানের রক্তলোলুপ সাঁজোয়া বাহিনী নিরস্ত্র মানুষের ওপর লেলিয়ে দেওয়া হলে আমাদের প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। সিলেট ও কুমিল্লা অঞ্চলে বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর খালেদ মোশাররফ, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী অঞ্চলে মেজর জিয়াউর রহমান, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল অঞ্চলে মেজর সফিউল্লাহ যুদ্ধ পরিচালনা করছেন। এবং তারা স্থানীয় কিছু শত্রুশিবির নিপাত করে শিগগিরই একযোগে ঢাকা আক্রমণ করার জন্য বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। কুষ্টিয়া, যশোর জেলার যুদ্ধ পরিচালনা করছেন মেজর ওসমান। উত্তরবঙ্গ মুক্তিবাহিনী পরিচালনা করছেন মেজর আহমদ, মেজর নজরুল সৈয়দপুরে, মেজর নওয়াজেশ রংপুরে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
তিনি আরও বললেন, একদিকে যেমন হাজার হাজার মানুষ মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিচ্ছে, তেমনি শত্রুর আত্মসমর্পণের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলেছে। আর একই সঙ্গে আমাদের নিয়ন্ত্রণে আসছে শত্রুর কেড়ে নেওয়া হাতিয়ার। এই প্রাথমিক বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গে মেজর জিয়াউর রহমান একটি বেতারকেন্দ্র গড়ে তোলেন এবং সেখান থেকে আপনারা শুনতে পান। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম কণ্ঠস্বর। এখানেই প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠনের কথা ঘোষণা করা হয়।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে বাংলাদেশ সরকারের প্রধান কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। পূর্বাঞ্চলের জন্য সিলেট-কুমিল্লা এলাকায় আরেকটা কার্যালয় করা হয়েছে।
তাজউদ্দীন শেষ করলেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রথম বেতার ভাষণ এই দিয়ে যারা আজ রক্ত দিয়ে উর্বর করছে বাংলাদেশের মাটি, যেখানে উৎকর্ষিত হচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশের নতুন মানুষ, তাদের রক্ত আর ঘামে ভেজা মাটি থেকে গড়ে উঠুক নতুন গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা; গণমানুষের। কল্যাণে সাম্য আর সুবিচারের ভিত্তিপ্রস্তরে লেখা থোক জয় বাংলা, জয় স্বাধীন বাংলাদেশ।
২৬
ব্যাঙ্গমা বলল, তাজউদ্দীন আহমদ যখন দিল্লিতে সরকার গঠন করা লইয়া। ব্যস্ত, তখন সিলেটের তেলিয়াপাড়া চা-বাগানে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসাররা একসঙ্গে বসলেন।
ব্যাঙ্গমি বলল, ৪ এপ্রিল এই বৈঠকে কর্নেল ওসমানী, লে. কর্নেল রব, লে. কর্নেল নুরুজ্জামান, মেজর সফিউল্লাহ, মেজর খালেদ মোশাররফ, নাসিম, মঈনুল হোসেন চৌধুরী, নুরুল ইসলাম শিশু–এই রকম অফিসাররা জয়েন করছিলেন। এই সময় তারা সিদ্ধান্ত নিলেন, ওসমানী সাহেব প্রধান সেনাপতি হইবেন।
আলোচনা হইল, সামরিক বিদ্রোহ সামরিক বিদ্রোহই থাইকা যাইব। যদি সরকার গঠন করা হয় অসামরিক লোক দিয়া। রাজনৈতিক সরকার গঠিত হইলেই এই বিদ্রোহ স্বাধীনতাযুদ্ধ হিসাবে স্বীকৃতি পাইব।
খালেদ মোশাররফের কাছ থাইকা একই বার্তা লইয়া রেহমান সোবহান সাহেবও তাজউদ্দীন সাহেবের কাছে পৌঁছায়া দিছিলেন।
ব্যাঙ্গমি বলল, মেজর জিয়া আসে ৫ এপ্রিলে। মেজর সফিউল্লাহর ব্যাটালিয়ন থাইকা সৈন্য লওনের লাইগা। সফিউল্লাহ আর খালেদ এক। কোম্পানি কইরা সৈন্য দিছিলেন জিয়ার ৮ নম্বর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টরে।
২৭
ঢাকায় আমেরিকান কনসাল জেনারেল আর্চার কে ব্লাড ওয়াশিংটন সরকারের অবস্থান মেনে নিতে পারছেন না।
পাকিস্তানি সৈন্যরা পূর্ব পাকিস্তানে নরক প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্যাংক, কামান নিয়ে ঢুকে ছাত্রাবাসে আক্রমণ করা হয়েছে, পুলিশ, ইপিআর, হেডকোয়ার্টার বোমা-গোলায় ধ্বস্ত, জনপদে জনপদে আগুন দিয়ে পলায়নরত মানুষদের করা হয়েছে গুলি।
রাস্তায় রাস্তায় পড়ে আছে মানুষের লাশ।
