সোনিয়া বললেন, মা-জি, খুব বড় কোনো সমস্যা?
ইন্দিরা হাসলেন। হাসি তার মুখে কমই দেখা যায়। ছোটবেলা থেকেই অসুখে ভুগেছেন। লন্ডন থেকে চিকিৎসার জন্য বারবার তাঁকে সুইজারল্যান্ড যেতে হতো। অক্সফোর্ডের পরীক্ষায় তিনি পাস করতে পারতেন না। সব সাবজেক্টে ভালো করতেন। ল্যাটিন পরীক্ষায় ফেইল। সব সাবজেক্টে পাস না করলে সে ছাত্র পাস করে না। ফিরোজ গান্ধীর সঙ্গে মেলামেশার দিন কটাতেই তাকে হাসিখুশি দেখা যেত। তাঁর কৈশোরেই, ১৩-১৪ বছর বয়সে ফিরোজের সঙ্গে তার দেখা হয়। ২৬ বছর বয়সে, আজ থেকে ৩০ বছর আগে ফিরোজ তাকে প্রপোজ করে। সেটা ছিল প্যারিসে মমার্তের সিঁড়িতে। ফিরোজ পারসি। ফ্যামিলির প্রবীণেরা আপত্তি করেছিলেন। বলেছিলেন, ও তোমাকে খাওয়াতে পারবে কি? আহা। ফিরোজও অল্প বয়সে চলে গেলেন। ছেলেরা তাঁকে মিস করে। ইন্দিরা ছোটবেলায় পুতুল নিয়ে খেলতেন। তবে সেই পুতুলেরা বিদ্রোহ করত। জেলে যেত। স্লোগান দিত। ইন্দিরা কিন্তু অনেক ছেলেমেয়ে চেয়েছিলেন। ১০টা-১২টা। ফিরোজই চায়নি। ইন্দিরা বলেন, তাঁর জীবনের সবচেয়ে সুখের মুহূর্ত হলো রাজীবের জন্মের মুহূর্তটি। ১৯৪৪ সালে রাজীব জন্ম নেয়। তখন ইন্দিরার বয়স ২৭। এখন, ১৯৭১ সালে, ইন্দিরার বয়স ৫৪।
সোনিয়ার প্রশ্নের উত্তরে বললেন, সমস্যা ভাবলেই সমস্যা। যা তোমাকে মেরে ফেলছে না, তা তোমাকে স্ট্রং করবে। যেকোনো দুর্যোগই একটা সুযোগ। কোনো অসুবিধা নেই। আমাকে আমার নাতিকে দাও। ওকে কি একটু স্যুপ খাওয়াব?
বলে তিনি হাত বাড়িয়ে রাহুলকে কোলে নিলেন। রাজীব এসে গেলেন। সঞ্জয়ও এলেন। সঞ্জয় কী একটা সবার জন্য গাড়ি প্রকল্প করছে। মারুতি গাড়ি কোম্পানির সঙ্গে কী একটা প্রকল্প করে এমডি হয়েছে। না জানি কোন ঝামেলায় সে জড়িয়ে পড়ে।
তিনি ভারতীয় নারীদের মতো অতিরিক্ত গল্পগুজব পছন্দ করেন না। মিটিংয়ের শুরুতে জিজ্ঞেস করেন না কে কেমন আছে, শরীর-স্বাস্থ্য ভালো, কাল ক্রিকেট খেলা কেমন জমেছিল। তিনি সরাসরি কাজের কথায় আসেন।
তিনি বললেন, এসো, আমরা ডিনার সেরে নিই।
.
তাজউদ্দীন দিল্লির বিএসএফের গেস্টহাউসের নিরাপদ গৃহে ফিরে এলেন। আনিসুর রহমান, রেহমান সোবহান, আমীর-উল ইসলামের সঙ্গে পরামর্শ করলেন। কাগজ-কলম নিয়ে বসে গেলেন সরকার গঠন করতে।
প্রেসিডেন্ট : শেখ মুজিবুর রহমান।
ভাইস প্রেসিডেন্ট : সৈয়দ নজরুল ইসলাম।
প্রধানমন্ত্রী : তাজউদ্দীন আহমদ।
মন্ত্রী : ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, খন্দকার মোশতাক আহমদ।
জাতীয় পতাকা : এটা নিয়ে ভাবতে হলো না। ছাত্ররা আগেই জাতীয় পতাকা বানিয়ে ফেলেছে, মুজিব ভাই সেটা উত্তোলন করেছেন, সেই পতাকা গাড়িতে লাগিয়ে ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বৈঠক করতে গেছেন। সবুজের মধ্যে লাল বৃত্ত, বৃত্তের মধ্যে সোনালি পূর্ব বাংলার মানচিত্র। পতাকার নকশা ভারতীয়দের আশ্বস্ত করল। কারণ তাতে পশ্চিম বাংলাকে যে নেওয়া হয়নি, তা স্পষ্ট।
জাতীয় সংগীত : এটাও বঙ্গবন্ধু আগে থেকেই বাছাই করে রেখেছেন। তাঁর খুবই প্রিয় গান। সব অনুষ্ঠানে এটা গাইতে বলতেন। ৭ মার্চের জনসভাতেও এটা গাওয়া হয়েছে। আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি…
পরের দিন তাজউদ্দীন আহমদ আবারও গেলেন সফদরজঙ্গের ইন্দিরা গান্ধীর বাসভবনে। ইন্দিরা প্রথম যে কথাটা বললেন, শেখ সাহেবকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে। তিনি মিলিটারি কাস্টডিতে আছেন।
তাজউদ্দীন আহমদের চোখে পানি চলে এল। মুজিব ভাইকে ধরে নিয়ে গেছে?
তাজউদ্দীন বললেন, তাঁর মুক্তির জন্য চাপ সৃষ্টি করতেও আপনার সাহায্য দরকার হবে।
বেশ খানিকক্ষণ আলাপ হলো। নিজের স্বভাবের বাইরে গিয়ে ইন্দিরা গান্ধী জিজ্ঞেস করলেন, আপনার ফ্যামিলিতে কে আছে।
তাজউদ্দীন বললেন, আমার স্ত্রী আছে, চারটা ছেলেমেয়ে আছে। তিনটা মেয়ে। ছোটটা ছেলে। সবাই ছোট।
ইন্দিরা বললেন, তারা কোথায়?
আমি জানি না। আমি তাদের বলে এসেছি, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে। সবার যা হবে, তোমাদেরও তা হবে।
ইন্দিরা বললেন, আপনাদের ডেডিকেশনে আমরা ইমপ্রেসড। তবে সাংগঠনিকভাবে অনেক কাজ বাকি। আমরা আপনাদের সব রকমের সাহায্য করব।
আমরা সরকার গঠন করছি। শপথ নেব বাংলার মুক্তাঞ্চলে। রেডিওতে ভাষণ দেব। এরপর ভারত আমাদের স্বীকৃতি দেবে, এটা আমাদের প্রত্যাশা।
আমরা সব করব। তবে একটার পর একটা। ঠিক যখন যা করার তা-ই করা হবে। আপনারা একদম এটা নিয়ে দুর্ভাবনা করবেন না। ঐক্য ধরে রাখুন, সব দলমতকে সঙ্গে নিন। শুধু বাইরের কোনো শক্তি যেন আপনাদের সংগ্রামকে হাইজ্যাক করতে না পারে, সেদিকেও লক্ষ রাখবেন।
তাজউদ্দীন আশ্বস্ত হলেন। ইন্দিরা গান্ধী তাঁর মন খুলেছেন।
.
তাজউদ্দীন বিএসএফের দিল্লির বাড়িতে বসে আমীর-উল ইসলাম, রেহমান সোবহান, আনিসুর রহমানদের বললেন, কাইন্ডলি একটা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র মুসাবিদা করুন।
আর আমি একটা রেডিও ভাষণ দেব। সেই ভাষণটাও তৈরি করে ফেলতে হবে।
আমীর-উল ইসলাম যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণা সামনে নিলেন। রেহমান সোবহান প্রজাতন্ত্রের আগে একটা গণ বসাতে অনুরোধ করলেন। বাংলাদেশের নাম রাখা হলো : গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ।
