একটু পরে সূর্য উঠবে। আকাশ ভরসা হতে শুরু করেছে। দিল্লির এই জায়গাটা গাছগাছালিতে ঢাকা। বিশেষ করে তার এই বাড়িটা। অনেক পাখি। আসে বাড়িটাতে। তারা ডাকতে শুরু করেছে। পাখিডাকা ভোর।
তার মাথাটা ধরা ধরা। রাতে ঘুম ভালো হয়নি। পাকিস্তানের ঘটনা নিয়ে তিনি বেশ চিন্তিত।
সকালের নাশতাটা তিনি পরিবারের সবাইকে নিয়ে করেন। রাজীব আছে, তাঁর ইতালিয়ান স্ত্রী সোনিয়া আছে, তাদের দুধের শিশু রাহুল আছে। সঞ্জয় আছে। সোনিয়া তো শাড়ি পরে রীতিমতো ভারতীয় বনে গেছে।
স্নান সেরে সুন্দর শাড়ি পরে নাশতার টেবিলে এলেন সোনিয়া। পরিচারিকা রাহুলকে নিয়ে কাছে এল। সোনিয়া আশা করছেন, ইন্দিরা মা-জি রাহুলকে এখন কিছুক্ষণ কোলে রাখবেন। কিন্তু ইন্দিরা মন দিয়ে খবরের কাগজ পড়ছেন। কাগজে পূর্ব পাকিস্তানের খবর বড় বড় করে ছাপা হয়েছে।
ইন্দিরা গান্ধী পূর্ব বাংলা নিয়ে সত্যি চিন্তিত। কতগুলো বাস্তব সমস্যা আছে। এক হলো পশ্চিম বাংলায় নকশালরা খুবই যন্ত্রণা করছে। চীন তাদের সমর্থন দিচ্ছে। এখন পূর্ব বাংলা স্বাধীনতার সংগ্রামে চলে গেলে দুই বাংলা না। চীনা বিপ্লবীদের চারণক্ষেত্র হয়ে যায়। বাংলা চিরকালই বিদ্রোহের জায়গা। বিপ্লবের সূতিকাগার। দুই হলো, পাকিস্তান জাতিসংঘের সদস্য। এখন পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনা নিয়ে ভারত কিছু করতে গেলেই সেটা অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ বলে গণ্য হবে। পাকিস্তান অবশ্য মিজো গেরিলাদের সাহায্য করে। ট্রেনিং দেয়। অস্ত্র দেয়। সেই রকমভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামীদের সীমিত আকারে ট্রেনিং অস্ত্র দেওয়া যেতে পারে। বিএসএফের মাধ্যমে করা হবে তা। আপাতত সেটাই নির্দেশ। এর। চেয়ে বেশি কিছু কি করা যেতে পারে? আরেকটা সমস্যা আছে। কাশ্মীর। আজকে তারা যদি পাকিস্তান থেকে পূর্ব বাংলাকে আলাদা হতে সাহায্য করেন, তাহলে কাশ্মীরকে আজাদ করতে কি পাকিস্তান চাইতে পারে না? সমস্যা হচ্ছে, দেশের ভেতরে বাংলাদেশকে সাহায্য করার প্রচণ্ড চাপ। বিরোধী দলগুলো বাংলাদেশের সমর্থনে জনমত সংগঠিত করছে। সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে ইন্দিরা একচেটিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছেন। বিরোধীদের পায়ের নিচের মাটি নরম। তারা সেটাকে শক্ত করার জন্য বাংলাদেশ ইস্যুকে ব্যবহার করতে চাইছে। তাই ৩১ মার্চ ইন্দিরা গান্ধী লোকসভায় একটা সর্বসম্মত প্রস্তাব পাস হতে দিয়েছেন; তাতে বলা হয়েছে : এই আইনসভা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, পূর্ব বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের এই ঐতিহাসিক উত্থান বিজয়ে রূপ নেবে। এই আইনসভা তাদের আশ্বস্ত করতে চায় যে তাদের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের প্রতি ভারতের জনগণের হৃদয় থেকে উৎসারিত সহানুভূতি ও সমর্থন রয়েছে।
রাজীব এসেছেন। সঞ্জয় এসেছেন। টেবিলে ব্রেকফাস্ট দেওয়া হচ্ছে। উর্দি পরা আরদালি পরিবেশন করছে। ইংলিশ ব্রেকফাস্ট।
ইন্দিরা গান্ধীর সেদিকে মন নেই। আজকে আওয়ামী লীগের নেতা আসবেন। তাঁর নাম তাজউদ্দীন। তাঁর সম্পর্কে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো প্রতিবেদন দিয়েছে। তিনি সেটা পড়তে আরম্ভ করলেন।
তাজউদ্দীন আহমদকে নিয়ে গাড়ি ১ নম্বর সফদরজঙ্গ সড়কের বাড়ির
জানালেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে না এনে তাঁকে বাসভবনে আনার সিদ্ধান্তও ভেবেচিন্তে নেওয়া। বাড়ি হলো অনানুষ্ঠানিক জায়গা। অফিস হলো অফিশিয়াল। স্বাধীনতাসংগ্রামীদের একজন প্রতিনিধিকে তিনি এখনই অফিশিয়ালি অভ্যর্থনা করতে পারেন না।
তাজউদ্দীন বৈঠকখানায় বসামাত্র ইন্দিরা গান্ধী জিজ্ঞেস করলেন, শেখ মুজিব কেমন আছেন?
সোফায় বসে আছেন রুস্তমজি, পি এন হাকসার, প্রতিরক্ষামন্ত্রী মি. জগজীবনরাম আর র-এর শংকরণ আয়ার (কর্নেল মেনন)।
তাজউদ্দীন বললেন, তার সঙ্গে আমার সর্বশেষ দেখা হয়েছে ২৫ মার্চ রাতে। আমাদের সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে তিনি বাড়ি থেকে চলে আসতে বললেন। তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। এরপর তো শুরু হয়ে গেল পাকিস্তানি মিলিটারির নৃশংস আক্রমণ। হাজার হাজার মানুষকে বিনা বিচারে গুলি করে মারল। পুলিশ, ইপিআর, বিশ্ববিদ্যালয়, বস্তি, বাড়িঘরে কামান দাগাল, আগুন দিল, মানুষ মেরে রক্তগঙ্গা বইয়ে দিল। ২৭ মার্চ কারফিউ উইথড্র হলে আমি বর্ডারের দিকে রওনা হলাম। তার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ করতে পারিনি।
আমরা তার নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত।
আমরাও খুব চিন্তিত। তবে তিনি আমাদের সরকার গঠন করতে বলেছেন। আওয়ামী লীগের একটা হাইকমান্ড আছে। শেখ মুজিবুর রহমান সাহেবসহ মোট ৫ জন। আমাদের এই ৫ জন মিলেই আমাদের বাংলাদেশ সরকার। আমাদের বাঙালি সৈনিক, পুলিশ, আনসার, ইপিআর, ছাত্র-জনতা প্রতিরোধযুদ্ধ করছে। দেশের বহু এলাকা এখনো আমাদের দখলে। তবে আমাদের হাতে অস্ত্র আর গোলাবারুদ নেই। ভারত যদি আমাদের স্বীকৃতি দেয় এবং অস্ত্র, গোলাবারুদ দেয়, তাহলে আমরা অল্প কদিনের মধ্যেই পাকিস্তানি মিলিটারিকে পরাজিত করব এবং দেশ শত্রুমুক্ত করতে পারব।
ইন্দিরা গান্ধী বলেন, আপনাদের বিজয়ের জন্য আমরা সম্ভবপর সবকিছু করব। আপনারা সরকার গঠনের ব্যাপারটা ঠিক কী করবেন, ঠিক করে কালকে আবার আসুন।
.
সেদিন রাতের খাবারের সময়ও ইন্দিরা গান্ধী অন্যমনস্ক রইলেন।
