রেহমান সোবহানও মাথা নাড়লেন, শেখ সাহেবের পরে সবচেয়ে যোগ্য, মেধাবী, পরিশ্রমী আর ডেডিকেটেড তাজউদ্দীন। শেখ সাহেব তার ওপরে ভরসা করতেন।
ওকে। কালকে আপনাদের সকালে এক জায়গায় যেতে হবে। রেডি থাকবেন।
পরের দিন সকালবেলা একটা গাড়ি এল, এলেন একজন ভারতীয় কর্মকর্তা। আপনাদের একটা বাড়িতে নিয়ে যাব। চলুন।
তারা চড়লেন গাড়িতে। অ্যাম্বাসেডর গাড়ি মেড ইন ইন্ডিয়া, একটু ঝরঝরে ধরনের হলেও শক্তপোক্ত, ভেতরে জায়গাও বেশ। যে বাড়িটিতে তারা গেলেন সেখানে ঢুকে রেহমান সোবহান আর আনিসুর রহমানের মুখটা প্রশান্তির হাসিতে ভরে উঠল। তাঁদের সামনে বসে আছেন তাজউদ্দীন আহমদ।
তাজউদ্দীন আহমদকে তারা জড়িয়ে ধরলেন। তাঁরা বললেন, তাজউদ্দীন ভাই, আপনি এসে গেছেন। আমাদের আর কোনো চিন্তা নেই। কিন্তু আপনার সঙ্গে উনি কে?
আমি আমীর। ব্যারিস্টার আমীর!
রেহমান সোবহান বললেন, তোমার পাইরেট মার্কা দাড়ি-গোঁফ কই গেল?
পালিয়ে আসার জন্য হেঁটে ফেলতে হয়েছে। আমীর জানালেন।
.
রেহমান সোবহান আর আনিসুর রহমান জানতেন না, তাজউদ্দীনের সঙ্গে তাদের এই দেখাটা ইগলের চোখ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছেন ভারতের কর্মকর্তারা। তাজউদ্দীনই এই লোক কি না, আর তিনি আসলেই শেখ সাহেবের ডান হাত কি না, তারা যাচাই করছেন। তাঁরা এ-ও জানেন না, আগরতলা হয়ে দিল্লি আসা আওয়ামী লীগ নেতা এম আর সিদ্দিকী, অ্যাডভোকেট সিরাজুল হকের কাছ থেকেও তাজউদ্দীন সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়।
তাঁরা সবাই তাজউদ্দীন সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন আর তা ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন।
দিনের বাকি সময়টা তাজউদ্দীন, আমীর, রেহমান সোবহান, আনিসুর রহমান একসঙ্গে কাটালেন।
.
ব্যাঙ্গমা বলল, তাজউদ্দীন আর আমীর ক্যামনে আইল দিল্লি সেইটার একটু বিবরণ দেও।
ব্যাঙ্গমি বলল, কথাটার কী মানে? তারা আইছে বিমানে।
ব্যাঙ্গমা বলল, তারপরও কোন বিমান, কেমন তার ব্যবস্থা, কয় তারিখে উড়াল দিলেন, কও না গো।
.
তাজউদ্দীন আর আমীর দিল্লি এসেছেন ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটা কার্গো বিমানে চড়ে। ১ এপ্রিল ১৯৭১-এ। তাদের সঙ্গে একই বিমানে এসেছেন। বিএসএফের গোলোক মজুমদার। বিমানে ওঠার আগেই দুজনকে দেওয়া হয়েছে একটা স্যুটকেস, একটা ব্যাগ। সে দুটোয় আছে কাপড়চোপড়, খাতা কলম, তোয়ালে, সাবান। রাত ১০টায় তাদের কলকাতা দমদম বিমানবন্দরে আনা হয় গোপনে। মালবাহী বিমানে উঠতে হয়েছে মইয়ে করে। বসার জন্য দেওয়া হয়েছে মালবহনকারী বিশাল গহ্বরে দড়ির বানানো আসন। তাতে বসতে হবে ক্যানভাসের বেল্ট পরে। তাদের আসনের পরে বেশ কিছু মালপত্র। তারপর পেছনের পুরোটা খোলা। ভীষণ গরম। পুরোনো রুশ বিমান আকাশে উঠল পুরো পৃথিবীকে জানান দিয়ে যে আমি উঠছি। কানে তালা লাগার উপক্রম এর শব্দে। তাজউদ্দীন আর পারলেন না। বিমানের মেঝেতে পিঠ দিয়ে শুয়ে পড়লেন। দেখাদেখি আমীর-উল ইসলামও তাঁর পাশে শয্যা নিলেন। সারা রাত ধরে বিমান চলল। ভোরে তাঁরা পৌঁছলেন দিল্লির সামরিক বিমানঘাঁটিতে। সেখান থেকে তাদের আনা হলো বিএসএফের একটা অতিথিশালায়।
তাজউদ্দীন বললেন, মিসেস গান্ধীর সঙ্গে আমাদের বৈঠক হবে। আমি সেখানে নিজেকে কী বলে পরিচয় দেব?
ব্যারিস্টার আমীর বললেন, আপনি বলবেন, শেখ সাহেব ২৫ মার্চ রাতে আপনাকে নির্দেশ দিয়েছেন ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করে স্বাধীনতাসংগ্রাম এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। শেখ সাহেবের অনুপস্থিতিতে আপনিই তাঁকেই প্রতিনিধিত্ব করছেন।
কিন্তু আমি আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় নেতা নই। সৈয়দ নজরুল সাহেব আছেন। তিনি আমাদের পার্লামেন্টারি পার্টির ডেপুটি লিডার। হেনা ভাই অল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। আমি তো কেবল আঞ্চলিক সাধারণ সম্পাদক। সিনিয়রিটির দিক থেকে মোশতাক সাহেব, মনসুর আলী সাহেব আমার চেয়ে এগিয়ে। নজরুল সাহেব, মনসুর আলী। সাহেব, মোশতাক–তারা আওয়ামী লীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট। তাঁরা মুজিব ভাইয়েরও ঘনিষ্ঠ।
আমীর বললেন, আপনি অবশ্যই নিজেকে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেবেন। প্রেসিডেন্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি যদি অনুপস্থিত থাকেন, তাহলে ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট। তাহলে আর সমস্যা হবে না।
আনিসুর রহমানও একমত হলেন। তাঁরা ৬ দফার ভিত্তিতে সংবিধান। প্রণয়নের সময় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে গোপনে অনেক কাজ করেছেন। তারা জানেন বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দীনের ওপরে কতটা নির্ভর করতেন। তাজউদ্দীনকে তিনি কতটা স্নেহ করতেন, কতটা বিশ্বাস করতেন।
এটাই ঠিক হলো। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকে তাজউদ্দীন নিজেকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেবেন। বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্ট।
তাজউদ্দীন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, মুজিব ভাই যে কোথায় আছেন, কেমন আছেন! আজকে মুজিব ভাই থাকলে কি আমাকে এই কঠিন পরীক্ষায় পড়তে হতো?
২৫
ইন্দিরা গান্ধীর ঘুম ভেঙেছে ভোরবেলা। তিনি তাড়াতাড়িই বিছানা ছেড়েছেন। রোজ যেমন ছাড়েন। চোখমুখ ধুয়ে তিনি এক গেলাস পানি পান করলেন। খালি পেটে পানি পান করা তাঁর শান্তিনিকেতনের দিনগুলো থেকে অভ্যাস। দিল্লির প্রধানমন্ত্রীর সাদা বাংলোর বারান্দায় তিনি এসে একটা চেয়ারে বসলেন।
