তিনি এসে নিজের পরিচয় দিলেন। বললেন, ঢাকায় সেনা আক্রমণের খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গে তিনি একজন পাকিস্তানি ব্যাটালিয়ান কমান্ডিং অফিসারসহ আরও দুজন অফিসারকে গ্রেপ্তার করেন। তাদের বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
মেজর খালেদ মোশাররফ তাঁদের জিপে করে নিয়ে গেলেন তেলিয়াপাড়া চা-বাগানের গেস্টহাউসে। গাছগাছালির নিচে এই জায়গাটাকে তিনি হেডকোয়ার্টার বানিয়েছেন, যাতে বিমান হামলা না হতে পারে।
রাতের বেলা, চা-বাগানের ঝিঁঝিডাকা বারান্দায় বসে, চা পান করতে করতে এই তিনজন শুনলেন খালেদ মোশাররফের কাহিনি।
খালেদ বললেন, কুমিল্লায় সব বাঙালি অফিসার সৈনিকদের পাকিস্তানিরা গুলি করে মেরে ফেলেছে।
বললেন, আমরা কিন্তু পাকিস্তানের চোখে বিদ্রোহী, অভ্যুত্থানকারী। কাজেই আমাদের ফেরার আর কোনো পথ নেই। একমাত্র উপায় হলো, যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করা। কিন্তু শুধু সৈনিকেরা যুদ্ধ করলে কোনো লাভ হবে না। রাজনৈতিক সরকার দরকার। আপনার কাইন্ডলি আগরতলা যান। সেখানে নির্বাচিত রাজনীতিবিদদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারা যেন একটা বাংলাদেশ সরকার গঠন করেন। আরেকটা কথা। সেই সরকার যেন আমাদের মিলিটারিদের তাদের সরকারে আবার রিক্রুট করে। তাহলে আমরা একটা বৈধ সেনাবাহিনীর লোক হিসেবে গণ্য হব। আমাদের বিদ্রোহ তখন বিদ্রোহ থাকবে না, হবে যুদ্ধ। আমরা জেনেভা কনভেনশনের গ্যারান্টি পাব। তা না হলে ঢাকায় আমাদের পরিবার-পরিজন আছে, কারোরই নিরাপত্তা থাকবে না। দ্বিতীয় আমাদের যে অস্ত্রশস্ত্র গোলাবারুদ আছে, তা দিয়ে বেশি দিন আমরা পাকিস্তানি মিলিটারিকে ঠেকিয়ে রাখতে পারব না। আমাদের যেন আর্ম অ্যান্ড অ্যামুনিশেন ঠিকভাবে দেওয়া হয়।
রেহমান সোবহান একটা কাগজে পুরোটা নোট নিলেন।
আগরতলায় পৌঁছালেন তারা। সেখানে তাদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ সভাপতি এম আর সিদ্দিকীর। তাঁকে ধরেছেন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী। দিল্লি চলুন। শরণার্থীতে আগরতলা ছেয়ে যাচ্ছে। দিল্লিকে বোঝাতে হবে পূর্ব বাংলার আসল চিত্র। এম আর সিদ্দিকী বলছেন, আমি তো এর আগে দিল্লি যাইনি। আর আমি চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের সভাপতিমাত্র, আমি কী করে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করব? দুই অর্থনীতিবিদকে পেয়ে তিনি পায়ের তলায় মাটি পেলেন। তিনি বললেন, আপনারা আমার সঙ্গে চলুন দিল্লি।
নিজেদের দরিদ্র বেশ ছেড়ে তারা ধার করা পাঞ্জাবি-পায়জামা পরে দাড়ি কামিয়ে স্নান করে বিমানে উঠে পড়লেন। ভারত সরকারের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অশোক মিত্রের মাধ্যমে তারা গেলেন ভারতের। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ডান হাত, মুখ্য সচিব পি এন হাকসারের বাড়িতে। হাকসার সম্পর্কে রেহমান সোবহান আগে থেকেই ধারণা রাখেন। তাঁকে সমীহই করেন। তিনি কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ, বামপন্থী। সোভিয়েতঘেঁষা। ১৯৩০-এর দশকে লন্ডনে তিনি ভারতের স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করেছিলেন। তাঁর পড়াশোনা, বিদ্যা, বুদ্ধি, বিচক্ষণতার কথা প্রবাদের মতো ছড়িয়ে আছে, যা রেহমান সোবহানের ভালোমতোই জানা। ড্রয়িংরুমের নরম গদিওয়ালা বিশাল সোফায় বসে আসামিজ চা খেতে খেতে হাকসার বললেন, কী হলো বলুন তো!
আনিসুর রহমান প্রথমে মুখ খুললেন, ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি মিলিটারি ইউনিভার্সিটিতে আমাদের কোয়ার্টারে এল। দরজায় নক করে মেরে ফেলল প্রফেসর জি সি দেবকে। মেরে ফেলল প্রফেসর মনিরুজ্জামানকে। আমরা দুই রাত মেঝেতে লুকিয়ে থাকলাম। তারা কামান দাগাল ইকবাল হলে। জগন্নাথ হল থেকে বের করে নিয়ে গেল ছাত্র-শিক্ষকদের। মাঠে নিয়ে গিয়ে লাইন করে গুলি করে মারল।
রেহমান সোবহান বলতে শুরু করলেন গোটা কাহিনির প্রেক্ষাপট, নির্বাচন হলো। আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল। আলোচনা শুরু হলো। ইয়াহিয়া খান এলেন। অ্যাসেম্বলি অধিবেশন বাতিল করা হলো। আওয়ামী লীগ পূর্ব বাংলার অ্যাডমিনিস্ট্রেশন নিজের হাতে তুলে নিল। পুরো বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষ শেখ মুজিবের কথায় চলল।
তারপর রাতের অন্ধকারে প্রেসিডেন্ট পালিয়ে গেলেন। লোকালয়ে ঢুকে কামান, ট্যাংক দিয়ে আক্রমণ চালানো হলো নিরস্ত্র মানুষের ওপর। পুলিশ, ইপিআর ঘাঁটিতে গিয়ে কামান দেগে ঘুমন্ত পুলিশ, ইপিআরদের হত্যা করা হলো। বস্তিতে বস্তিতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হলো। হাকসার বলতে লাগলেন, কী বলছেন এসব?
হাকসার বলতে লাগলেন, কী বলছেন এসব?
রেহমান সোবহান বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলেন, পাশের দেশ পূর্ব বাংলায় কী হচ্ছে, এরা কত কম জানেন!
হাকসার জিজ্ঞেস করলেন, শেখ সাহেবের পরে আওয়ামী লীগের নেতা কে? হু ইজ নাম্বার টু ইন আওয়ামী লীগ?
রেহমান সোবহান বললেন, শেখ সাহেবের ডান হাত হলেন তাজউদ্দীন। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।
কী নাম বললেন?
তাজউদ্দীন।
হাকসার নামটা নোট করে নিলেন।
আর কে আছে?
সৈয়দ নজরুল ইসলাম। সহসভাপতি, আওয়ামী লীগ। পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কামারুজ্জামান। ক্যাপ্টেন মনসুর আলী। আর খন্দকার মোশতাক। এঁদেরকে বলা হয় আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। তবে যদি একটা নাম চান, আমি বলব তাজউদ্দীন। আনিসুর রহমান বললেন।
