মানে?
জানেনই তো আমাদের কোয়ার্টারে দুটা করে দরজা সামনের দিকে। একটা দরজায় তালা ঝুলিয়ে দিয়ে আরেকটা দরজায় ছিটকিনি দিয়ে রেখেছিলাম। ২৫ তারিখ রাতে তারা বিল্ডিংয়ে আসে। নিচের তলার বাসিন্দা জি সি দেব, ওপরের তলার অধ্যাপক মনিরুজ্জামানকে গুলি করে মেরে ফেলে।
কোন মনিরুজ্জামান?
স্ট্যাটিস্টিকসের। সম্ভবত তারা নাম গুলিয়ে ফেলেছে। তারা বাংলার মনিরুজ্জামানকে খুঁজতে এসে স্ট্যাটিস্টিকসের নিরীহ মনিরুজ্জামানকে মেরে ফেলেছে।
রাজ্জাক সাহেব কি বেঁচে আছেন?
হ্যাঁ। তার ফ্ল্যাটে সৈনিকেরা নক করে। তিনি দরজা খুলতে দেরি করেন। অধৈর্য সৈন্যরা বাড়িতে কেউ নেই ভেবে চলে যায়।
আর আপনারা কীভাবে বাঁচলেন?
আমার বাড়িতে তালা দেখে তারা আর নক করেনি। আমরা সারা রাত মেঝেতে শুয়ে ছিলাম। ২৫ মার্চ-২৬ মার্চ এইভাবেই কেটেছে। কারণ, মিলিটারি আবার এসে লাশগুলো টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গেছে।
রোজের বাবা মতিন সাহেবের বেরাইদের বাড়িতে গিয়ে উঠলেন রেহমান সোবহান ও আনিসুর রহমান। সেখানে ভিড়। ঢাকা থেকে পালিয়ে আসা মানুষেরা সিধু ভাইয়ের শ্বশুরবাড়িতে অনেকেই আশ্রয় নিয়েছেন।
এর মধ্যে পাওয়া গেল টেলিভিশনের প্রযোজক মুস্তাফা মনোয়ারকে।
এখন প্রশ্ন, তাঁরা কি ঢাকা ফিরে যাবেন নাকি অন্য কোথাও গিয়ে লুকিয়ে থাকবেন। তখনই খবর এল, রেহমান সোবহানের বাড়ি মিলিটারি ঘিরে রেখেছে। এরপর আর ঢাকা ফেরার প্রশ্নই আসে না। সাব্যস্ত হলো, তাঁরা আগরতলা যাবেন।
৩০ মার্চ তারা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উদ্দেশে রওনা হলেন। রেহমান সোবহানকে। বলা হলো লুঙ্গি পরতে হবে। রেহমান সোবহান জীবনে কোনো দিন লুঙ্গি পরেননি। এই সমস্যার সমাধানে রোজ তাকে একটা বেল্ট এনে দিলেন। রেহমান সোবহান ওপরে খদ্দরের একটা কুর্তা, নিচে চকচকে নতুন লুঙ্গি, কোমরে বেল্ট পরে যাত্রারম্ভ করলেন। তিনি বেরোনোর আগে আয়নায় নিজেকে দেখে আনিসুর রহমানকে বললেন, আনিস, আমাকে কেমন দেখাচ্ছে।
আনিস সেই দুঃখের মধ্যেও হাসি সংবরণ করতে পারলেন না।
রেহমান বললেন, আমি আপনার হাসির কারণ জানি। আমাকে পুরান ঢাকার কসাই সরদারদের মতো দেখা যাচ্ছে।
সিধু ভাই নিজে তাঁদের সঙ্গে হাঁটতে লাগলেন। রেহমান, আনিস, মুস্তাফা মনোয়ারের সঙ্গে পথপ্রদর্শক হিসেবে রইলেন দুজন, কলেজছাত্র রহমত উল্লাহ, আর স্কুলশিক্ষক আ. রশিদ।
ব্যাঙ্গমা বলবে, এই রহমত উল্লাহ ১৯৮৬ সাল থাইকা চারবারের এমপি রহমত আলী।
তাঁরা নৌকায় নদী পার হলেন, তারপর বাসে চড়ে চললেন নরসিংদী। বাসেও পলায়নপর মানুষ সব। নরসিংদী থেকে তারা উঠলেন লঞ্চে। যাবেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া। কিন্তু লঞ্চেই রেহমান সোবহানের অদ্ভুত পোশাক, অতি ফরসা লম্বা দেহাকৃতি যাত্রীদের সন্দেহের উদ্রেক করে। এদিকে আনিসুর রহমানের পরামর্শে তারা নাম বদলে ফেলেছেন, আনিস হয়েছেন আবদুর রশীদ, আর রেহমান সোবহানের নতুন নামকরণ করা হয়েছে দীন মোহাম্মদ। দীন মোহাম্মদ নিজের নাম মনে রাখতে পারছেন না। তার ওপর তিনি কথা বলতে পারেন ইংরেজিতে, ছোটবেলায় পড়েছেন দার্জিলিংয়ের বোর্ডিং স্কুলে, আর তার মা উর্দুওয়ালা। তিনি কথা বলতে পারেন উর্দুতেও। মুখ খুললেই তিনি ধরা পড়ে যাবেন যে তিনি বাংলাভাষী নন। আবার নিজেদের পরিচয়ও তারা ঠিকমতো দিতে পারছেন না এই জন্য যে লঞ্চে পাকিস্তানি চর থাকতে পারে।
উত্তেজিত জনতা তাকে একটা ঘাটে নামিয়ে নিল। সঙ্গে আনিসুর রহমান এবং মুস্তাফা মনোয়ারও আছেন। কথাবার্তায় সন্দেহজনক এই লোকগুলো নিশ্চয়ই পাকিস্তানি চর, কাজেই এদের মুখ খোলাতে হবে এবং সে ক্ষেত্রে মাইরের ওপরে ওষুধ নাই। আনিসুর রহমানের ওপরে পড়ল কয়েক ঘা, রেহমান সোবহানের মুখে একটাই আঘাত পড়েছিল, তা-ই তার জন্য যথেষ্ট ছিল, কারণ এরপর তিন দিন তিনি ভাত চিবুতে পারেননি। ঘা খেয়েই আনিসুর রহমান মুখ খুললেন, আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। শুধু মুখ খুললেন না, তিনি গলাও খুললেন। রবীন্দ্রসংগীত জানেন ভালো, তিনি গলা ছেড়ে রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হলেন যে তিনি বাঙালি। মুস্তাফা মনোয়ার বললেন, এদের আমি ভালো করে চিনি, তোমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো ছাত্রকে ডেকে আনো, তাহলে জানবে যে এঁরা শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকই নন, শেখ সাহেবের অতিঘনিষ্ঠ সহকর্মী। এই সময় অক্সফোর্ড প্রেসের একজন পিয়ন রেহমান সোবহান স্যারকে চিনতে পারল। এরই মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্র ঘটনার বিবরণ শুনে দৌড়ে চলে এসেছে, কারণ তারা বুঝতে পেরেছে, বাংলা বলতে না পারা লম্বা-ফরসা মানুষটি আর কেউ নন, তাদের প্রিয় শিক্ষক রেহমান সোবহান। তারা এসে বলল, ভাই, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ লোক, আওয়ামী লীগের নেতা এঁরা দুজন। আপনারা এঁদের কাছে মাফ চান। তখন তাদের জনতা ঘাড়ে তুলল, ফুলের মালা পরাল এবং ঘাড়ে করেই নিয়ে গেল স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে। কিন্তু এলাকায় খবর ছড়িয়ে পড়ল যে বঙ্গবন্ধু এই বাড়িতে এসেছেন। শত শত মানুষ শেখ মুজিবের নামের মোহে বাড়িতে ছুটে এসে আরেক দৃশ্য রচনা করে ফেলল।
এরপর দুই ছাত্রকে সঙ্গে নিয়ে তিনজন নৌকায় করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌঁছালেন। তাঁদের নিয়ে যাওয়া হলো তিতাস গ্যাসের গেস্টহাউসে। সেখানে রেহমান সোবহান, আনিস, মুস্তাফা মনোয়ার দেখতে পেলেন হলিউডের এক হিরোকে। হাফহাতা চেক শার্ট, খাকি প্যান্ট, কোমরে পিস্তল, বছর ত্রিশের এক যুবক। তাঁর পরিচয় জানা গেল। মেজর খালেদ মোশাররফ।
