ব্যাঙ্গমা বলল, দিনের বেলা একটা সময় তারে হাঁটার সুযোগ দেওয়া হইত। সেই জায়গাটাও আছিল উঁচা দেওয়াল দিয়া ঘেরা। চল্লিশ ফুট বাই দশ ফুট একটা জায়গায় তিনি হাঁটতেন।
ব্যাঙ্গমি বলল, বাথরুম আছিল নোংরা।
পুরা জায়গার বাতাস থিকাথিকা হইয়া আছিল শুকনা মলমূত্রের গন্ধ। দিয়া।
তার সেলের চারপাশে থাকত সৈন্যদের সশস্ত্র পাহারা।
কেউ তার সাথে কথা কইত না। তিনিও কারও লগে কথা কইতেন না। খাওয়াদাওয়া আছিল খুবই খারাপ।
২৪
ব্যাঙ্গমা বলল, ইতিহাসের মধ্যে কতকগুলান সুইট কো-ইনসিডেনস ঘটে।
ব্যাঙ্গমি বলল, এই যেমন এখন ঘটল।
ব্যাঙ্গমা বলল, হ। এই যেমন এখন ঘটল। অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান এবং আনিসুর রহমান আর্মির তাড়া খাইয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া হইয়া আগরতলা গেলেন। সেইখান থাইকা প্লেনে তুইলা আগরতলার মুখ্যমন্ত্রী তাগো লইয়া আইলেন দিল্লি। আর ব্যারিস্টার আমীর আর তাজউদ্দীন চুয়াডাঙ্গা দিয়া বর্ডার পার হইয়া কলকাতা দিয়া আইসা হাজির হইলেন দিল্লি। তাগো লইয়া গেলেন বিএসএফ প্রধান রুস্তমজি। এই চারজনের দেখা হইয়া গেল।
ব্যাঙ্গমা আর ব্যাঙ্গমি বলাবলি করে :
তাজউদ্দীন আহমদ কী করে সীমান্ত অতিক্রম করলেন, সেটা আমরা মোটামুটি জানি। রেহমান সোবহান আর আনিসুর রহমানের বর্ডার পার হওয়ার গল্পটা স্মরণ করা যেতে পারে।
.
২৭ মার্চ ১৯৭১ ঢাকায় কারফিউ স্থগিত করা হলে রেহমান সোবহানের গুলশানের বাড়ি গিয়ে হাজির হন মোজাফফর ন্যাপের পক্ষ থেকে সত্তরের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নৌকা মার্কার কাছে পরাজয় বরণ করা ৩৬ বছর বয়সী সাংবাদিক, লেখক কাম রাজনীতিবিদ মঈদুল হাসান। রেহমান সোবহানের ফোরাম পত্রিকায় তিনি ৩১ জানুয়ারি ১৯৭০ লেখেন দ্য স্ট্র্যাটেজি ফর ইকোনমি শীর্ষক প্রবন্ধ। ফোরাম পত্রিকার সম্পাদক রেহমান সোবহান বেঁচে আছেন কি না, থাকলে তাকে বাঁচানোর কোনো উদ্যোগ নেওয়া যায় কি না, এই হলো মঈদুল হাসানের আগমনের উদ্দেশ্য। রেহমান সোবহান বাইরে ছিলেন, তিনি না আসা পর্যন্ত মঈদুল অপেক্ষা করেন।
তিনি এলে মঈদুল তাকে বললেন, তোমাকে এখনই বাড়ি ছাড়তে হবে!
রেহমান সোবহান, দুই অর্থনীতি তত্ত্বের প্রবক্তা, বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী, স্বাধীন বাংলাদেশের তাত্ত্বিক রূপরেখা নির্মাণে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ও পরামর্শে যিনি তাজউদ্দীনের সঙ্গে কাজ করে চলেছেন, যার বাবা মুর্শিদাবাদের বাঙালি, মা লক্ষ্ণৌর। ড. রেহমান সোবহান কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করে এসেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, মায়ের সূত্রে তিনি খাজা পরিবারের আত্মীয়, খাজা নাজিমউদ্দিন তাঁর নানির ভাই। রেহমান সোবহান বললেন, আমাকে কেন বাড়ি ছাড়তে হবে?
কারণ, পাকিস্তানি আর্মি নির্বিচার মানুষ খুন করছে। আবার তালিকা ধরে খুঁজে খুঁজেও মানুষ মারছে। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জি সি দেব, মনিরুজ্জামানসহ অনেক অধ্যাপককে মেরেছে। শোনা যাচ্ছে, রাজ্জাক স্যারকেও মেরে ফেলেছে। তোমাকে মারবে না কেন? তুমি তো শেখ সাহেবের ঘনিষ্ঠজন।
আমাকে মারবে না কারণ, আমি রাজনীতি করি না।
জি সি দেব স্যারও রাজনীতি করতেন না।
আমার ধারণা তারা ধানমন্ডি এলাকায় আওয়ামী লীগারদের খুঁজবে। গুলশান এলাকায় আসবে না।
আমি তর্ক করব না। আমি শুধু একটা কথা বলব, তুমি যদি বাঁচতে চাও, তুমি আমার সঙ্গে এখনই গাড়িতে ওঠো। একমুহূর্তও দেরি করা চলবে না।
রেহমান সোবহান তার স্ত্রী সালমার সঙ্গে কথা বলে নিজের কিছু জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে মঈদুলের গাড়িতে উঠলেন।
মঈদুল তাকে নিয়ে গেলেন সিধু মিয়ার গুলশানের বাড়িতে।
.
এইখানে আবার ব্যাঙ্গমা কথা বলে উঠল, সিধু মিয়া হইলেন মোখলেসুর রহমান সিধু। রংপুর থাইকা আসা মানুষটা ন্যাপ নেতা মশিউর রহমান যাদু মিয়ার ভাই, তথ্যের খাতিরে এইটাও উল্লেখ করতে হয়। তিনি আছিলেন সফল ব্যবসায়ী, আর প্রগতিশীল সংস্কৃতিসংগঠক। ছায়ানটের তিনি অন্যতম। উদ্যোক্তা।
.
ব্যাঙ্গমি বলে, এইটাও কইয়া ফেলা ভালো যে ফ্যাশন-উদ্যোক্তা মডেল হিসেবে যিনি স্বাধীনতার পরে নব্বইয়ের দশকে দেশে-বিদেশে বিখ্যাত হইবেন, সেই বিবি রাসেলের তিনি বাবা।
.
সিধুর স্ত্রী রোজ। এই এক আশ্চর্য মানবী। একাত্তর সালের এই ঘোর দুঃসময়ে তাদের বাড়িতে পলায়নপর মানুষেরা আশ্রয় নিয়ে কেবল ঘর ভরে তুলেছিল তা নয়, রোজ নিজে গাড়ি চালিয়ে শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তীর মতো মানুষদের বর্ডার পার করিয়ে দিয়ে এসেছিলেন।
সিধু মিয়া বললেন, আমাদের বাসা আপনার জন্য নিরাপদ না। আপনারা এক কাজ করুন, নদী পার হয়ে রোজের বাপের বাড়ি বেরাইদে চলে যান। আমি সঙ্গে লোক দিয়ে দিচ্ছি।
রোজ ড. রেহমানকে খাইয়েদাইয়ে রওনা করিয়ে দিলেন।
পথে নেমে রেহমান সোবহান দেখতে পেলেন, পুরা পথই জনস্রোত। শত শত মানুষ হেঁটে, রিকশায় যে যেভাবে পারছে শহর ছাড়ছে। তিনি জনস্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দিলেন।
মানুষের মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে রেহমান পেয়ে গেলেন আরেক অর্থনীতিবিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আনিসুর রহমানকে।
তিনি কথা বলে উঠলেন, ড. আনিস!
সোবহান।
আপনিও ঢাকা ছাড়ছেন?
সোবহান জানেন না আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টারে কী হয়েছে? কোনোরকমে বেঁচে গেছি স্যার। জাস্ট একটা তালার জোরে।
