জনাব। আমরা আপনার ব্যাগটি সঙ্গে নিচ্ছি। আপনাকে আরেক জায়গায়। রাখতে নিয়ে যাওয়া হবে।
সৈনিকেরাই তার ছোট্ট জেলখানার থলেটি সঙ্গে নিল। সামনে-পেছনে সৈন্য পরিবেষ্টিত অবস্থায় তিনি ফ্ল্যাগ হাউসের লম্বা বারান্দা হেঁটে পার হলেন। প্রথম তিন রাত প্রায় নিঘুম কাটানোর পর ফ্ল্যাগ হাউসের তিন দিন তিন রাত তুলনামূলকভাবে ছিল অনেকটাই স্বস্তিদায়ক। এখন এরা আবার তাঁকে কোথায় নিচ্ছে কে জানে? রাত আটটার মতো বাজে। বারান্দার বাতিগুলো জ্বলছে, আর তাতে পোকা ঘিরে আছে। শেখ মুজিব এগোচ্ছেন, একটার পর একটা লাইটের আলোয় তার চারদিকে অনেকগুলো ছায়া একবার ছোট হচ্ছে, একবার বড় হচ্ছে।
তিনি বারান্দার সিঁড়ির কাছে এসে দেখলেন তিনটি গাড়ি। সামনের দুটো লরি। তাতে সৈন্যরা এলএমজি বসিয়ে সদা প্রস্তুত। মাঝখানেরটা একটা সেডান গাড়ি। তাঁকে মাঝখানের কারেই ওঠানো হলো। গাড়ির কাঁচ পুরোটাই পর্দা দিয়ে ঢাকা। তার দুপাশে দুজন সৈনিক বসল। সামনে ড্রাইভার আর একজন সৈনিক। বেশিক্ষণ চলল না গাড়ি। দরজা খুলে গেল। তাঁকে বলা হলো, নামুন। তিনি নামলেন।
বুঝতে পারলেন তাকে এয়ারপোর্টে নেওয়া হয়েছে। সামনে একটা উড়োজাহাজ। পিআইএর মনোগ্রাম আঁকা আছে প্লেনের গায়ে। তিনি বিমানের সিঁড়িতে পা রাখলেন। তারপর তাকালেন আকাশের দিকে। কালো আকাশে অনেক তারা। একপশলা বাতাস এসে মুজিবের পাঞ্জাবির হাতা ওড়াতে লাগল। মুজিব প্লেনের ভেতরে গিয়ে ঢুকলেন। পুরো প্লেন ফাঁকা। তিনি ছাড়া আর কোনো যাত্রী নেই। তবে প্রহরী আছে কয়েকজন। তিনি একটা সিটে গিয়ে বসলেন। জানালা দিয়ে বিমানবন্দরের আলো দেখতে পেলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিমান নড়তে শুরু করল। তিনি বিমানের জানালা দিয়ে অপস্রিয়মাণ গাছগাছড়া, আলোকস্তম্ভ, দূরের টার্মিনাল ভবনের আলো দেখতে লাগলেন। বিমান দ্রুততর হলো। আকাশে উড়ে গেল। তিনি নিচে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলেন ঢাকার কী অবস্থা।
বিস্ময়করভাবে তাঁর স্ত্রী, পুত্র, কন্যা কিংবা বৃদ্ধ আব্বা-আম্মার কথা তাঁর মনে পড়ল না। তিনি একটা অদ্ভুত দৃশ্য কল্পনায় দেখতে পেলেন : রক্তের স্বাদ পাওয়া বাঘ জনপদে ঢুকে পড়েছে। একের পর মানুষের ওপরে থাবা বসাচ্ছে। তখন গ্রামবাসী জেগে উঠছে। যার যা কিছু আছে–লাঠিসোটা, বন্দুক, বল্লম, জাল, ঢাকঢোল, মশাল–নিয়ে হাজার হাজার মানুষ তাড়া করছে বাঘটাকেই।
প্লেন প্রথমে গেল কলম্বো। সেখানে ঘণ্টা দেড়েক দাঁড়িয়ে আবারও উড়াল। একঘেয়ে বিরক্তিকর ফ্লাইট। একসময় মুজিব ঘুমিয়ে পড়লেন। ঘণ্টা দেড়েক ঘুমানোর পর জাগলেন। এই সময় একজন ক্রু তাঁর কাছে এল এবং বলল, তিনি সকালের ব্রেকফাস্ট করবেন কি না। তিনি মাথা নাড়লেন। বিমানের নাশতার একটা রেডিমেড প্যাকেট গরম করে তাঁকে দিয়ে দেওয়া হলো। ভেতরে তিনি একটা রুটি, ডাল এবং ডিম দেখতে পেলেন। সেটা সামনে নিয়ে তিনি বসে রইলেন। চা বা কফি কিছু খাবেন? তিনি কফির কথা বললেন। এই সময় হঠাৎ করে তার মনে হলো তাঁর বাড়ির পোষা কবুতরগুলোর কথা। তিনি প্রায়ই কবুতরগুলোকে গম, খুদ ইত্যাদি খেতে দিতেন। ২৫ মার্চ রাতে যে হারে গুলির শব্দ আর আগুন তিনি দেখেছেন, তাতে বাড়ির মানুষ সব বেঁচে আছে কি না, আল্লাহ জানেন, আর কবুতরগুলোর কী পরিণতি হয়েছে, সে খবর কে রাখবে।
প্লেনটা অবতরণ করছে। ধীরে ধীরে আকাশ থেকে নিচের দিকে নামছে। বেশ খানিকটা ঝাঁকুনি খেয়ে আবার শান্তভাবেই বিমান নিচের দিকে নামতে লাগল। এরা তাঁকে পশ্চিম পাকিস্তানে আনছে, সন্দেহ নেই। কিন্তু পাকিস্তানের কোন এয়ারপোর্ট এটা? সমুদ্র দেখে তিনি অনুমান করতে পারলেন যে এটা করাচি। বিমান অবতরণ করে দৌড় ধরল। শেষে গাড়ির মতো চলে যথাস্থানে থামল। বেশ খানিকক্ষণ তিনি বসে রইলেন আসনে।
পরে দরজা খুলে গেল। সিঁড়ি বেয়ে নেমে তিনি সৈন্যভরা গাড়িতে উঠে টার্মিনালের ভিআইপি লাউঞ্জে গেলেন। বাইরে আকাশে তীব্র রোদ।
তাঁকে বসানো হলো সোফায়। তারপর এল ক্যামেরাম্যান। তাঁর ছবি তোলা হলো। তাঁকে কফি পান করতে দেওয়া হলো। এরপর আবারও একটা সামরিক বিমানে তোলা হলো তাকে। নেওয়া হলো রাওয়ালপিন্ডিতে। সেই প্লেন থেকে নামিয়ে একটা হেলিকপ্টারে তোলা হলো তাকে। এক ঘণ্টার মতো উড়ে হেলিকপ্টার সোজা গিয়ে নামল একটা কারাগারের ভেতরে।
শেখ মুজিবকে নেওয়া হলো একটা ছোট্ট ঘরে। সেই ঘরে একটামাত্র ছোট্ট গবাক্ষ। একটা নোংরা বিছানা। তিনি হতভম্ব হয়ে গেলেন। নিঃসঙ্গ কারাবাসের অভিজ্ঞতা তার আছে? তাই বলে এই রকম একটা বদ্ধ কেটলির মতো ঘরে! তিনি তাকিয়ে দেখলেন, ঘরে কোনো ফ্যানও নেই। আর ততক্ষণে প্রচণ্ড গরমে তাঁর সেদ্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড়। তাঁকে এই প্রকোষ্ঠের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হলো।
তিনি স্তম্ভিত হয়ে রইলেন। তারপর নোংরা বিছানাতেই বসলেন। গায়ের কোটটা খুললেন। একটু পর লোহার দরজা খোলা হলো।
.
ব্যাঙ্গমা বলল, বঙ্গবন্ধুরে লওয়া হয় পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালি জেলে।
ব্যাঙ্গমি বলল, নারীদের কারাগারের পাশে তার লাইগা একটা বিশেষ সেল তৈরি করা হয়।
ব্যাঙ্গমি বলল, একটা ছোট্ট ঘরে রাতের বেলা তালা বন্ধ কইরা রাখা হইত তারে।
