এই কথা শুনে আসার পরে ধীরেন্দ্রনাথ কি এই কুমিল্লা ছেড়ে, এই পূর্ব বাংলা ছেড়ে কলকাতা যেতে পারেন?
আমি এই মাটির পোলা, আমি এই আমগাছের মতো, এই বটগাছের মতো, আমারে তোমরা আর কোথাও লইতে পারবা না। আমি এই মাটির সাথে হামাগুড়ি দিয়া মাটি ধইরা আঁকড়াইয়া থাকুম।
রমেশ আবার তার কালো দাঁত বের করে।
মাটির কথাই ধীরেন্দ্রনাথকে বলতে হয়। কংগ্রেসি ছিলেন তিনি। গান্ধীবাদী ছিলেন। জেল খেটেছেন স্বদেশি করতে গিয়ে। স্বদেশ হিসেবে পেয়েছেন পাকিস্তানকে। মাটির গন্ধ তার গা থেকে যায় না। পাস করা উকিল। ওকালতিই তার ব্যবসা। কিন্তু কথা বলতেন মাটির টানমাখা বুলিতে।
মাটি অথবা মা-টি। দুটোই তো মা। ভাষা, সে-ও তো মা-ই। মায়ের ভাষা–আমরা বলি না?
তো, ১৯৪৮ সালের বসন্তকালে, ফাল্গুন মাসে, কুমিল্লায় কি ঢাকায় যখন। পলাশ ফুটেছে, কোকিল ডাকছে, দক্ষিণা সমীরণ বইছে, তখন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, কংগ্রেস থেকে নির্বাচিত গণপরিষদ সদস্য, তাঁর মাটির কথা, কিংবা মা-টির কথা পেড়ে বসলেন পার্লামেন্টে। জিন্নাহ তখন সভাপতিত্ব করছিলেন গণপরিষদে। পার্লামেন্টে একটা বিধির প্রস্তাব করা হয়েছে। বিধিটা কী?
গণপরিষদে সরকারি ভাষা হিসেবে ইংরেজির সঙ্গে উর্দুও বিবেচিত হবে। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত নোটিশ দিলেন। একটা ছোট্ট, খুবই ছোট্ট সংশোধনী আছে তার। ফ্লোর পেলেন দুদিন পর।
তিনি উঠে দাঁড়ালেন। পায়ের নিচে তাঁর করাচির গণপরিষদ ভবনের পাথুরে মেঝে, কিন্তু কেথেকে যেন তিনি পাচ্ছেন তাঁর কুমিল্লার মাটির গন্ধ, তার মনে হলো, তিনি বৃক্ষ হয়ে উঠছেন, এবার তার শিকড় তার পায়ের নিচে চাড়া দিচ্ছে, জানান দিচ্ছে তার পায়ের নিচে মাটি আছে, তার রক্তের মধ্যে মা আছে, ভাষা আছে–তিনি বললেন, মিস্টার প্রেসিডেন্ট, স্যার, আমার সংশোধনী : ২৯ নম্বর বিধির ১ নম্বর উপবিধির ২ নম্বর লাইনে ইংরেজি শব্দের পর অথবা বাংলা শব্দ দুটি যুক্ত করা হোক।
বাংলার বসন্তকালের সমস্ত শিমুল আর পলাশ আর আম আর জামগাছের মুকুলগন্ধমাখা ডালপালা-পাতার ফাঁক থেকে এক কোটি কোকিল কুহু কুহু বলে ডেকে উঠল।
ধীরেন্দ্রনাথ বললেন, আমি এই সংশোধনীটা ক্ষুদ্র প্রাদেশিকতার মানসিকতা থেকে উত্থাপন করিনি। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যা ছ কোটি নব্বই লাখ। এর মধ্যে চার কোটি চল্লিশ লাখ কথা বলে বাংলায়। তাহলে স্যার দেশের রাষ্ট্রভাষা কোনটি হওয়া বাঞ্ছনীয়।…স্যার, এই জন্য আমি সারা দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর মনোভাবের পক্ষে সোচ্চার হয়েছি। বাংলাকে একটা প্রাদেশিক ভাষা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এই বাংলা ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
পূর্ববঙ্গের সাধারণ সদস্য প্রেমহরি বর্মণ তাকে সমর্থন করলেন।
প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর বক্তব্য হলো, এটা আসলে কোনো নিরীহ সংশোধনী নয়, এটা হলো পাকিস্তানের মুসলমানদের মধ্যে যে ইস্পাতকঠিন ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা বিনষ্ট করা। পাকিস্তান একটা মুসলিম রাষ্ট্র। এ জন্য মুসলিম জাতির ভাষা উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা করতে হবে।
উঠে দাঁড়ালেন ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত। তিনিও পূর্ববঙ্গের সদস্য। বললেন, প্রধানমন্ত্রী এমন কিছু মন্তব্য বেছে বেছে করেছেন, যা তিনি না করলেও পারতেন।
পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন বললেন, আমি নিশ্চিত, পাকিস্তানের বিপুল জনগোষ্ঠী উর্দুকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে।
পূর্ববঙ্গের শ্রীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বললেন, পাকিস্তান একটা মুসলিম রাষ্ট্র, এই কথাটা পরিষদের নেতার মুখে শুনে দুঃখ পেয়েছি খুব। এত দিন পর্যন্ত আমার ধারণা ছিল, পাকিস্তান গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র, এই রাষ্ট্রে মুসলিম আর অমুসলিমদের সমান অধিকার।
ভোটে উঠল সংশোধনীটা। পরিষদের সভাপতি মোহামদ আলী জিন্নাহ। তিনি কণ্ঠভোটে দিলেন প্রস্তাবটা। মোট সদস্য ৭৯ জন। ৪৪ জন পূর্ব বাংলার।
কিন্তু কণ্ঠভোটে ধীরেন্দ্রনাথের প্রস্তাব নাকচ হয়ে গেল।
এক কোটি কোকিল তীব্রস্বরে ডেকে উঠল পূর্ব বাংলায়। এক লাখ শিমুল মাথা ঝাঁকাল। এক লাখ পলাশ পাপড়িতে আগুন জ্বালাল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল আর পুরান ঢাকার নানা স্কুল থেকে ছেলেমেয়েরা বেরিয়ে পড়তে লাগল স্লোগান দিতে দিতে–পাখির ঠোঁটে ঠোঁটে বার্তা রটে গেল, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। সেই ১৯৪৮-এর ফাল্গুনেই। ১১ মার্চ হরতাল। পিকেটিং করতে হবে। ১৪৪ ধারা ভাঙতে হবে। ছাত্রনেতা শেখ মুজিবের জলদগম্ভীর কণ্ঠ বেজে উঠলে অলি আহাদ সমর্থন দিলেন। তোয়াহা, শওকত, শামসুল হক, অধ্যাপক আবুল কাশেম, নাইমুদ্দিন, আবদুর রহমান চৌধুরী, কামরুদ্দীন, তাজউদ্দীন, সৈয়দ নজরুল-হরতালের দিনে কে কোন জায়গায় পিকেটিং করবেন, দায়িত্ব ভাগাভাগি হয়ে গেল।
মাটির টানটা ধীরেন্দ্রনাথের কথাবার্তায় ছিল সর্বক্ষণই। ৪৮ সালেই ময়মনসিংহ শহরে এক জনসভায় ভাষণ দিতে গিয়ে আগের বক্তা মালেক সাহেবের দেশে আরেকটা তুলাধুনার ব্যবস্থা হওয়া উচিত এই বক্তব্যের পরে তিনি বললেন, এই তো মাত্র দেশে বহুত তুলাধুনা হইয়া গেল, কিন্তু তার রেশ তো এখনো শেষ হইল না। কাজেই এমন ব্যবস্থা করতে হইবে, যাতে হিন্দু মুসলমান, আমরা বরাবর যে রকম মিইলা-মিইশা কাজ কইরা যাইতাছি, ইংরেজের বিরুদ্ধে মিইলা-মিইশা সংগ্রাম কইরা তারারে তাড়াইছি, এইভাবে মিইলা-মিইশাই আমরা আগাইয়া যাইব, এই সম্প্রীতি কিছুতেই নষ্ট হইতে দেওন যাইব না।
