ব্যাঙ্গমি বলে, ২৫ মার্চ রাত থাইকা তারা কয়টা বাড়িতে গেলেন? ১. ডা. সামাদের বাড়ি. ২. মোরশেদের বাড়ি. ৩. ক্যাপ্টেন রহমানের বাড়ি ৪. মগবাজারের ইঞ্জিনিয়ার আলী সাহেবের বাড়ি। ৫. বলধা গার্ডেনে খোকার শ্বশুরবাড়ি ৬. খিলগাঁও পলির শ্বশুরবাড়ি ৭. চৌধুরীপাড়ার ভাড়া বাড়ি ৮. মগবাজারের ১ নম্বর সার্কুলার রোডের বাড়ি।
ব্যাঙ্গমা বলে, এইটাই শেষ নয়।
ব্যাঙ্গমি বলে, হ। এইটাই শেষ নয়। সেই গল্পে আমরা পরে আসতাছি…
২১
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটগাছ ছেড়ে ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমি কোথাও যাবে না। এই ছিল তাদের প্রতিজ্ঞা। কিন্তু সেই প্রতিজ্ঞা তারা ধরে রাখতে পারে না।
তারা দেখতে পায়, পাকিস্তানি মিলিটারি ট্রাকে করে ধরে এনেছে কাঠুরে, ইলেকট্রিক করাত, আর তারা কেটে ফেলছে বটগাছটাকে।
ব্যাঙ্গমা বলে, দ্যাখো, মানুষের জিঘাংসার আগুন কত ভয়াবহ হতে পারে! পাকিস্তানি মিলিটারিরা শুধু মানুষ মারছে, তা-ই না, তারা পুড়ায়া দিতেছে বস্তি, তারা গুঁড়ায়া দিতেছে মন্দির আর শহীদ মিনার। জগন্নাথ হলের মাঠে লাইন কইরা মানুষ মাইরা তাগো জিঘাংসা চরিতার্থ হয় নাই, চট্টগ্রামে, রংপুরে, কুমিল্লায়, যশোরে ক্যান্টনমেন্টে ঘুমন্ত বাঙালি সৈন্য আর তাগো স্ত্রী পুত্র-কন্যা-পরিজনদের গুলি কইরা বেয়নেট চার্জ কইরা মাইরা তাগো রক্তের তৃষ্ণা মেটে নাই, তারা এবার হত্যা করতে এসেছে একটা বটগাছকে।
৪ এপ্রিল ১৯৭১।
ব্যাঙ্গমা আর ব্যাঙ্গমি আকাশে ওড়ে আর তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাকিস্তানি মিলিটারিদের আনা শ্রমিকেরা করাত চালাচ্ছে তাদের আশ্রয় বটগাছটার ওপরে। বটগাছ থেকে কাঠের গুঁড়ো নয়, যেন হলুদ রক্ত বেরোচ্ছে। গলগল করে। বটগাছের পাতারা আর্তনাদ করে উঠছে, গাছে আশ্রয় নেওয়া পরগাছারা অশ্রুপাত করছে, গাছের ডালে বাসা বানিয়েছিল যে পাখি আর পতঙ্গ তারা চিৎকার করছে, কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার তো কোনো দ্বিতীয় উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে না এই পৃথিবীতে। পুরো গাছটাকে ধরাশায়ী করে টুকরো টুকরো কেটে তারপর রাগ কিছুটা কমে হয়তো দায়িত্ব পাওয়া মেজরের আর সৈন্যদের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটগাছ বলতে আর কিছু রইল না, এখন কোথায় তোরা আন্দোলন করবি, বেইমান বেজন্মা বাঙালির বাচ্চারা!
ব্যাঙ্গমা বলে, এখন আমরা কই যামু?
ব্যাঙ্গমি বলে, চলো তাইলে আমরা রমনা পার্কের পাকুড়গাছটায় গিয়া বসি।
ব্যাঙ্গমা আর ব্যাঙ্গমি উড়ে গিয়ে বসল রমনার অশ্বথশাখায়।
২২
এই মাটি ছাইড়া আমি কোথাও যামু না। কারে বলে দ্যাশ? এই মাটিই আমার দ্যাশ। কুমিল্লার বাড়িতে লাগানো সুপুরিগাছের গোড়ার মাটিতে খুরপি চালাতে চালাতে তিনি আপনমনে বিড়বিড় করছিলেন। নিজ হাতে কতগুলো নারকেল আর সুপুরির চারা লাগিয়েছেন কিছুদিন আগে। এগুলো এখনো মাটিতে শিকড় ছড়িয়ে শক্তপোক্ত হয়নি। এই গাছগুলোকে বাঁচাতে পরিচর্যা দরকার। কিন্তু সেই যে চারপাশে এত আম, জাম, কাঁঠাল, কদম, হিজলগাছ আকাশের দিকে মুখ করে তাকিয়ে আছে, মাটির গভীরে শিকড় ছড়িয়েছে, এদেরকে যদি জিজ্ঞেস করি, তোমাদের দেশ কী, ও গাছ ভাইয়েরা, ওরা কী বলবে? যাবে তোমরা নিজের দেশে? একটাই দেশ ছিল, এখন ভাগ হয়ে গেছে। এইটা আর তোমাদের দেশ না? ও বকুলগাছ দিদি, ও অশ্বত্থ দাদা, যাইবা আমগো সাথে, ওই পারে?
১৯৪৭ সালে একষট্টি বছরের বৃদ্ধ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হাসেন। তাঁর সাদা চুল। যেন বকুলগাছ নয়, তার হাসি বকুল ঝরায়। এই মাটি ছাইড়া আমি কোথাও যামু না। এই মাটিই আমার দ্যাশ। এই আমার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাটি, এই আমার কুমিল্লার মাটি। এই আমার পূর্ব বাংলার মাটি। রমেশ পানির ঝাঁঝরি এনে তাঁর পাশে দাঁড়ালে তিনি গাছের গোড়ায় পানি ঢালেন, তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গাছের পাতাতেও পানি ঢালেন। গাছের পাতারা জলের সোহাগ পেয়ে ঝকমকিয়ে ওঠে, ধীরেন্দ্রনাথ সেই হাসিটুকু যেন দেখতে পান।
রমেশ লোকটা তার পুরোনো ভূত্য, ঘাড়ে গামছা, পরনে ধুতি, কুচকুচে কালো গায়ের রং, চামড়া ফাটা, তার বয়স পঁয়তাল্লিশও হতে পারে, পঁয়ত্রিশও হতে পারে, সে তার বাবুর এই স্বভাব জানে, গাছের সঙ্গে, মাটির সঙ্গে কথা কন তিনি। ধীরেন্দ্রনাথ বলেন, রমেশ, এই যে ছোট সুপারিগাছের চারা, নারকেলগাছের চারা, এইগুলান তুইলা লইয়া গিয়া কলকাতায় মাটিতে লাগাইলে বাঁচব না?
বাঁচতেও পারে বাবু।
কিন্তু বড়গুলানরে লইয়া যাওন যাইব? ওই বটগাছটারে যদি তুইলা লইয়া যাই?
রমেশ হাসে। তাঁর দাঁত কালো, পান-তামাক নানা কিছু খেয়ে দাঁতের বারোটা বাজিয়েছে সে।
বড়গাছ কি আর তোলন যাইব বাবু! কাইটা-চিইরা তক্তা লইয়া যান।
তাইলে আমরা বড় মানুষগুলান, কই যামু? এইহানে থাকুম নাহি কলকাতা যামু?
রমেশ আবার দাঁত বের করে। বড় কালো ওর দাঁতগুলো।
শোনো, করাচি গেছিলাম না? মুহম্মদ আলী জিন্নাহর ভাষণটা শুইনা, কইলজাটা ঠান্ডা হইছে। আসলে তো হেও কংগ্রেসই করত। শিক্ষিত লোক। সেকুলার আছে।
জিন্নাহ কী কইছে? রমেশ নারকেলগাছের চারার ওপরে পানি ঢালতে ঢালতে শুধায়।
ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের মনে পড়ে জিন্নাহর প্রথম বক্তৃতাটা। করাচিতে গণপরিষদ সম্মেলনে তিনি প্রথম দিয়েছিলেন এই ভাষণটা। যা-ই হোক না কেন, পাকিস্তান কখনোই এমন ধর্মরাষ্ট্রের পরিণত হবে না, যা কিনা ধর্মযাজকেরা পারলৌকিক মিশন নিয়ে শাসন করে থাকে। আমাদের আছে অনেক অমুসলিম-হিন্দু, খ্রিষ্টান, পারসি, কিন্তু তারা সবাই পাকিস্তানি। তারা অন্যদের মতো সমান অধিকার ভোগ করবে এবং পাকিস্তান বিষয়ে তারা পূর্ণ অধিকার নিয়ে ভূমিকা পালন করবে। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমরা শুরু করছি এমন একটা কালে, যখন কোনো বৈষম্য নেই, কোনো সম্প্রদায়ের তুলনায় আরেকটা সম্প্রদায়কে আলাদা করা হয় না, বর্ণের কারণে, গোত্রের কারণে কারও প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা হয় না। আমরা শুরু করতে যাচ্ছি এই মৌলনীতি অবলম্বন করে যে আমরা সবাই একটা রাষ্ট্রের নাগরিক এবং সম অধিকারসম্পন্ন নাগরিক।
